নার্সিসিজম: শো অফ বনাম আত্মবিধ্বংসী সমাজ

প্রকাশিত: ১০:১৬ অপরাহ্ণ, জুন ৭, ২০২০

গ্রীক মিথ অনুযায়ী জলের দেবতা সিফিসাস ও দেবী লিরিউপির ছেলে ছিলেন নার্সিসাস। নার্সিসাস ছিল অত্যাধিক সুন্দর। যেকোনো দেবী বা পরী তার প্রেমে পড়তো অনায়াসে। সে ছিলো এমনই সুন্দর- তাকে কাছে পাওয়ার জন্য সবাই উদগ্রীব থাকতো। কিন্তু নার্সিসাস সবাইকে প্রেমের অভিনয় করে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতো।

নার্সিসাসের প্রতি চরম অনুরক্ত একজন পরী ইকো। ইকো মানে প্রতিধ্বনি। ইকো কথা বলতে পারতো না। অন্যের কথার প্রতিধ্বনি করতো। নার্সিসাস যেতো শিকারে। ইকোও প্রতিদিন অপেক্ষা করতো নার্সিসাসের জন্য। কবে নার্সিসাস সাড়া দিবে।

একদিন নার্সিসাস একোর পায়ের আওয়াজ শুনে ডাকলো। কিন্তু ইকো তো কথা বলতে পারে না। ইকো চরম আনন্দে নার্সিসাসের বুকে মাথা রাখলো। ইকো কথা বলতে পারে না দেখেই নার্সিসাস খুব রেগে গেলো। বললো, ‘সরো! আমি মরে যেতে রাজি আছি, তবুও তোমার হবো না!’

এই বলে সে ইকোকে মাটিতে ফেলে দিলো। ছোট ছোট গাছ গুলো ভেঙে গেলো ইকোর শরীরের চাপে। তার হৃদয় ভেঙে গেলো। লজ্জায় অপমানে সে দৌঁড়ে চলে গেলো পর্বতের দিকে। আক্ষেপ করতে করতে একসময় সে মরে গেলো।

পর্বতের পাথরের সাথে তার শরীরও লীন হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো তার কন্ঠস্বর, যা অন্যের উচ্চারিত শব্দকে অনুকরণ করে। নার্সিসাস এভাবে অসংখ্য পরীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতো।

ইকো এভাবে অপমানিত হয়ে মন থেকে চাইতো যে, ভালোবেসেও ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট কেমন তা নার্সিসাস একবার বুঝুক। এমন প্রত্যাখাতদের মধ্যে একজন একবার প্রতিশোধের দেবী নেমেসিসের কাছে প্রার্থনা করলো, ‘হে দেবী নেমেসিস, নার্সিসাস যদি কখনো প্রেমে পড়েও, সে যেন ভালোবাসা না পায়’। নেমেসিস প্রার্থনা শুনেছিলেন এবং নার্সিসাসের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেললেন।

একদিন অনেক রৌদ্রের সময় নার্সিসাস একটা জলাশয়ের ধারে এলো। সে যখনি জলের দিকে তাকালো, দেখলো এক অপূর্ব জলদেবতা জল থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারেনি যে ওই প্রতিবিম্ব তারই এবং সাথে সাথেই সে তার প্রতিবিম্বের প্রেমে পরে গেলো।

নার্সিসাস নিচু হয়ে প্রতিবিম্বকে চুমো খেতে গেলো। ওই প্রতিবিম্বও তাকে একইভাবে চুমো খেতে এলো। এটাকে পারস্পরিক সম্মতি মনে করে নার্সিসাস তার প্রতিবিম্বকে জল থেকে টেনে তোলার জন্য হাত বাড়ালো। জলে ঢেউ উঠতেই সেই অপূর্ব জলদেবতা চলে গেলো।

এভাবেই নার্সিসাস নিজের প্রেমে পড়ে একসময় মৃত্যুবরণ করলো। তার থেকে জন্ম হল নার্সিসাস ফুল। নিজের প্রতি অতিরিক্ত অহংবোধের জন্য নার্সিসাসের পতন হলো।

আমাদের জীবনেও আমাদের বিশেষ কোনো গুণ থাকলে আমরা নিজেদের ইউনিক ভাবতে শুরু করি। ইউনিক ভাবা দোষের না। কিন্তু সেই স্বতন্ত্রবোধ যখন আমাদের অপরকে ছোট করতে শেখায় তখন তা অহংকারে পরিণত হয়।

বর্তমানে আমাদের সমাজব্যাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নার্সিসিস্ট চর্চাকে গুরুত্ব দিয়ে চলছি। জীবনের মূল্যবান মূহুর্তোগুলো ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে শো অফ করায় ব্যাস্ত রাখছি অন্যকে আকৃষ্ট করার জন্য।

একজন মানুষ হিসেবে আল্লাহ আমাদের তার ইবাদতের জন্য পাঠিয়েছেন। প্রত্যেকের যোগ্যতা অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা সম্মান দিয়েছেন। আমরা বরং সৃষ্টিকর্তার দেয়া দামী সম্মানটুকু বাদ দিয়ে আরো বেশি কিছু পেতে চাই। সেখানেই বিড়ম্বনা।

বর্তমানে নার্সিসিজমের (আত্মপ্রেমের) প্রকাশ পাচ্ছে অহরহ। প্রত্যেকটা মানুষই নিজেকে অন্যদের চেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দিচ্ছে। নিচের স্বভাবগুলোর মধ্যে একজন নার্সিসিস্টকে শনাক্ত করা যায়।

১. তারা নাম উল্লেখ করে:

নার্সিসিস্টরা অন্য ব্যক্তির দোষ দেওয়া বা নিন্দা করা ছাড়া অন্যদের প্রসঙ্গে আলোচনা প্রায় করেই না। অথবা নেইম ড্রপিং করে, অর্থাৎ, তার থেকে উর্ধ্বতন বা ক্ষমতাপূর্ণ কারো নাম উল্লেখ করে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চায়। তারা ক্ষমতা বা সৌন্দর্য বা খ্যাতির সাথে নিজেদের যুক্ত করতে চায়। এবং তারা এটা করে শুধুমাত্র ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেই না, বিভিন্ন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান, ব্র্যান্ড, এক্সক্লুসিভ ইভেন্ট ইত্যাদি তারা প্রায়ই উল্লেখ করে থাকে।

২. তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটায় বা সেলফি এডিট করে:

২০১৪ সালে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ১০০০ লোকের ওপর একটি গবেষণা করে দেখা গেছে, যাদের মধ্যে নার্সিসিজম বেশি তারা তিনটি জিনিস করে। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটায়, নিজেদের সেলফি বেশি পোস্ট করে, ক্রপিং বা ফিল্টার ব্যবহার করে সেলফি বেশি এডিট করে।

নার্সিসিস্টদের চেনার ব্যাপারে এই জিনিসটি হয়ত নতুন না, তবে এই গবেষণার মাধ্যমে ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

৩. তারা নিজেদের ফুলিয়া-ফাপিয়ে বড় করে ও অন্যদেরকে নিচু মনে করে:

নার্সিসিস্টরা যদি মনে করে তাদের ট্যালেন্ট, দক্ষতা ও অসাধারণত্ব কেউ ভালোভাবে বুঝতে পারে নি বা স্বীকৃতি দেয় নি, তাহলে তারা রেগে যায়, খারাপ আচরণ করে। ফলে, এ রকম তিক্ত আচরণ করা নার্সিসিস্টের সংখ্যা অনেক। তারা মনে করে তারা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অসাধারণত্ব প্রদর্শন করে আসছে, কিন্তু তারা কেন সবার মনোযোগ পাচ্ছে না বা লিস্টের প্রথমে থাকছে না।

৪. তারা অন্যদের আদর্শে পরিণত হতে চায়, কিন্তু আপনি তাদের পছন্দ করলে তারা পাত্তা দেয় না:

আপনি যদি নার্সিসিস্টকে বলেন আপনি অনেক অসাধারণ তখন সে আপনাকে পাত্তা দিবে না। কিন্তু তাকে যদি বলেন যে সে খুবই বোরিং এবং গতানুগতিক তাহলে সে প্রচণ্ড রেগে যাবে। সে সমালোচনা নিতে পারে না এবং পরাজয় মানতেই পারে না। এতে তারা মারাত্মক শূন্য, অপমানিত বোধ করে ও রেগে যায়।

৫. তাদের সবসময় সেরাটা প্রয়োজন:

তারা সবসময় সবকিছুর সেরাটা নিতে চায় ও সেরাটা পেতে চায়। যেমন সেরা ডাক্তার, সেরা ল-ইয়ার, সেরা হেয়ারস্টাইলিস্ট, সেরা ট্রেইনার ইত্যাদির সুবিধা পেতে চায়। সবচেয়ে নামি কোম্পানিতে কাজ করতে চায়, সবচেয়ে দামি গাড়ি চালাতে চায়, দামি রেস্টুরেন্ট বা বারে যেতে চায়।

৬. সবার প্রথমে তারা মনোমুগ্ধকর ও আকর্ষণীয়:

নার্সিসিস্টরা জানে কীভাবে এই জিনিসটা নিজেদের মধ্যে আনতে হয়। প্রায়ই দেখা যায় একজন নার্সিসিস্ট খুবই মোহনীয়, দেখতে আকর্ষণীয় এবং তারা আত্মবিশ্বাস দ্বারা লোকজনের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম। হ্যাঁ, ঠিক ততক্ষণই সে আকর্ষণীয় যতক্ষণ আপনি তাকে পুরোপুরি না জানতে পারছেন। যখন জানতে পারবেন, তখন তো আকর্ষণ শেষ হয়ে যাবে।

৭. তারা অনেকগুলি সম্পর্ক তৈরি করে:

নার্সিসিস্ট যখন সম্পর্ক শুরু করে তখন সম্পর্কের অন্য পার্টনারের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি খুবই উঁচু ও আদর্শায়িত থাকে। কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে তার ধারণা ভুল। এটি মূলত তিনটি কারণে ঘটে। ১. সে যখন ব্যক্তির ইমেজের ভিতরের আসল ব্যক্তিটিকে বুঝতে পারে তখন সে হতাশ হয়। ২. খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ৩. যে আছে তার চেয়ে ভালো কাউকে দেখা যায়। এর ফলে নার্সিসিস্ট ব্যক্তির সাথে আমাদের সম্পর্ক থাকে না।

৮. তারা সবসময়ই পরবর্তী জিনিস খোঁজে:

২০০২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে কমিটমেন্টের সাথে নার্সিসিজমের সম্পর্ক নেতিবাচক। নার্সিসিস্ট ব্যক্তি সবসময়ই মনে করে সে আরো ভালো করতে পারবে বা আরো ভালো জিনিস খুঁজে পাবে, ফলে সে কোনো কিছুতে স্থায়ী থাকতে পারে না। গবেষকরা এই উপসর্গের নাম দিয়েছেন ‘অল্টারনেটিভনেস’।

৯. তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র আত্ম-ঘৃণা বা নিজেকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার বোধ নেই:

২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার একটি দল একটি গবেষণা করেছিল নার্সিসিস্টদের নিয়ে। গবেষণার শিরোনাম ছিলো ‘নার্সিসিস্ট কি নিজের আত্মগভীরে নিজেকে ঘৃণা করে’। এই গবেষণার কৌশল এমন ছিলো যে, নার্সিসিস্ট নিজেকে কীভাবে দেখে তা বের হয়ে আসে। প্রচলিত বিশ্বাস ছিলো যে, নার্সিসিস্টদের সেলফ-স্টিম কম বা তাদের নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে তারা এমন করে, কিন্তু এই গবেষণায় এর বিপরীত ব্যাপারটি প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, নার্সিসিস্ট নিজেকেই মনে করে সে নিজেই সব।

১০. তারা এটা পুরোপুরি স্বীকার করে:

২০১৪ সালে একটি গবেষণায় দেখা যায়, একটি সাধারণ প্রশ্ন করে নার্সিসিস্ট শনাক্ত করা যায়।

প্রশ্নটি হল, আপনি এই বাক্যটির সাথে কতটুকু একমত: ‘আমি একজন নার্সিসিস্ট’। ( মনে রাখবেন, ‘নার্সিসিস্ট’ এর মানে আত্ম-অহংকারী, আত্ম-কেন্দ্রিক ও নিষ্ফল)

এই গবেষণাটি খুবই কঠোর ভাবে করা হয়েছিলো। গবেষকরা ১১টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি টেস্ট করেন। দেখা গেছে তাদের উত্তর একদম নিখুঁত ছিলো। নার্সিসিস্টদের সহানুভূতি বা কমিটমেন্ট না থাকলেও, দেখা গেছে যে তাদের নিখুঁত অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে।

অতএব, একজন মানুষ হিসেবে আমাদের সময় খুবই কম। আমরা সময়টিকে সুস্থ, পারিবারিক বন্ধন ও বন্ধুসুলভ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। পারিবারিক আড্ডায় নিজের গ্যাজেটটি কিছুক্ষণের জন্য অফ রাখি।

মনে রাখবেন, আপনার পিতামাতা মুখে না বলতে পারলেও অন্তরে কষ্ট পায়। তাই সর্বদা ফোন চালিয়ে নিজেকে ক্লাসি ভেবে, শো অফ না করে আপনার প্রতি মানুষের দৃষ্টভঙ্গিকে বদলে দিন। তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ব্লগ অবলম্বনে।

লেখক: ফাইজুল ইসলাম ফাহিম
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন