করোনাকালের এই দুর্যোগে কারাবন্দীর প্রতি সদয় হোন

প্রকাশিত: ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ৬, ২০২০
কারাবন্দীদের প্রতি সদয় হোন। ছবি : পাবলিক ভয়েস

করোনাকালের এই দুর্যোগ মুহুর্তে দেশের জেলখানাগুলোতে বন্দি থাকা কারাবন্দীদের প্রতি আরও সদয় হওয়ার আহবান জানিয়েছেন সদ্য কারামুক্ত হয়ে ফিরে আসা বহুল প্রচারিত বই প্রকাশের প্রতিষ্ঠান গার্ডিয়ান পাবলিকেসন্সের স্বত্বাধিকারী নূর মোহাম্মদ।

এ বিষয়ে নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে তিনি এই আহবান জানান। পাঠকদের জন্য নূর মোহাম্মদের পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো –

… স্রেফ মৃত্যুকূপ। পুরো দুনিয়ায় যখন সোস্যাল ডিস্টান্সিং-এর আকুতি এবং রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের অধীনে বন্দী মানুষগুলো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার অপেক্ষা করছে।

এই সংকট মোকাবিলায় মুক্ত পৃথিবীর মানুষদের জন্য কত আয়োজন! অথচ হাতকড়া পরা, পরাধীন বন্দীদের নিয়ে সভ্য পৃথিবী যেন নির্বিকার! স্বাধীন মানুষ নিজ উদ্যাগে প্রটেকশন নিতে পারে, অন্তত চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু বন্দীরা?

কারাগারে বিটিভিতে আমরা সোস্যাল ডিস্টান্সিং-এর মোটিভেশন শুনতাম। খুব হাসতাম। সামাজিক দূরুত্ব মেনে (!) আমরা এক ওয়ার্ডে ৩০ জন ঘুমাতাম। ওয়ার্ড মানে কী জানেন? এই আপনারা বাসার যে আয়তনের রুমে ঘুমান, তার ডাবল আয়তনের ধরে নিন। একজনের নাক-মুখের কাছে আরেকজনের নাক-মুখ!

কী নিষ্ঠুর পরিহাস! করোনা পরিস্থিতিতে তামাম দুনিয়ায় যখন হাজার হাজার বন্দী মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, তখন বাংলাদেশে আদালত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে কি আদালত এভাবে বন্ধ থাকে? টানা ৬০ দিন আদালত বন্ধ ছিল! সরকারের নির্বাহী বিভাগ যখন পরিস্থিতির বাস্তবতায় ছুটি বাড়িয়ে দিত, তখন বিচার বিভাগও ছুটি বাড়িয়ে নিতো। মাঝখানে সরকার যখন সীমিত পরিসরে দোকানপাট ও অফিস খোলার সিদ্ধান্ত নিলো, তখন প্রধান বিচারপতি সীমিত পরিসরে আদালত খোলার সার্কুলার জারি করেছিল। কিন্তু কী হলো জানেন? আইনজীবীরা আদালত খোলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো। সীমিত পরিসরে আদালত চললে নাকি আইনজীবীদের জীবন বিপন্ন হবে! কী দারুণ কথা! অথচ, একজন আসামী তার জীবন ও স্বার্থের পক্ষে কথা বলার জন্য আইনজীবীদের নিযুক্ত করেন। আইনজীবীদের প্রতিবাদের মুখে সীমিত পরিসরে আদালত খোলার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

আল্লাহর কসম, সেদিন কারাগারের বন্দীরা আইনজীবীদের নাম ধরে ধরে অভিশাপ দিয়েছিল। অনেককে হু হু করে কাঁদতে দেখেছিলাম।

অবশেষে ভার্চুয়াল আদালত অধ্যাদেশ জারি হলো। আমি সরকার ও বিচার বিভাগকে অন্তর থেকে এই গ্রাউন্ডে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এটা একটা দারুণ উদ্যোগ। শুধু করোনা পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতের যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল কোর্ট অসহায় বিচারপ্রার্থীদের জন্য ট্যানেল শেষে আলোর বিন্দুরেখা হয়ে সামনে আসবে।

কী ভয়ংকর কথা! কিছু আইনজীবী এই ভার্চুয়াল কোর্টেরও বিরোধিতা করেছে। কেন জানেন? তারা নাকি ভার্চুয়াল ডিভাইসে হ্যাবিচুয়েট না, সিনিয়র আইনজীবীরা ভার্চুয়াল মাধ্যমে অভিজ্ঞ না! তাই ভার্চুয়াল আদালতও বন্ধ করার দাবি উঠেছিল! আমরা হাসতাম। আইনজীবীরা একদিকে আদালত বন্ধের দাবি তোলেন, আরেকদিকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর্থিক সাহায্য চেয়ে (খয়রাতির) আবেদন করে!

চিফ জাস্টিস মহোদয়কে ধন্যবাদ। এই অবিবেচক ও স্বার্থপর আইনজীবীদের মতামতকে উপেক্ষা করে তিনি তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছেন। ঈদের আগে ০৯ কর্মদিবসে প্রায় ২১ হাজার আসামী জামিনে মুক্তি পেয়েছে। মাইন্ড ইট ২১ হাজার!

আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করব, প্লিজ আপনি সবগুলো কোর্ট ভার্চুয়ালি খুলে দিন। আরও বেঞ্চ বাড়িয়ে দিন প্লিজ। নিম্ন আদালতের সব মাজিস্ট্রেট ও দায়রা আদালত ওপেন করুন প্লিজ। কারাগারে হাজার হাজার বনি আদম মুক্তির প্রহর গুণছে। আসামীদের জামিনের ব্যবস্থা করুন প্লিজ।

আপনারা একবার কল্পনা করুন তো বন্দীদের কথা। কারাগারে যদি একজন সংক্রমিত আসামীও প্রবেশ করে (প্রতিদিন নতুন আসামী ঢুকছে), তাহলে ২৪ ঘন্টার ভেতর বাকি সবাই সংক্রমিত হবে। কারাভ্যন্তরে সোস্যাল ডিস্টান্সিং-এর কোনো সুযোগই নেই।

করোনা সংক্রমণের পর থেকে আজতক আসামীদের সাথে স্বজনদের সাক্ষাৎ বন্ধ রাখা হয়েছে। পত্রিকা, রেডিও আর বিটিভির মাধ্যমে কারাবন্দীরা এই কদিন বাহিরের দুনিয়ার সাথে সংযুক্ত আছে। বন্দী হিসেবে আমরা অসহায় হয়ে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি উপলব্ধি করতাম। ভাবতাম, আমরা আর কোনোদিনই মুক্ত পৃথিবীতে ফিরতে পারব না। কারাভ্যন্তরে সংক্রমিত হয়ে সোজা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে পৌঁছে যাব। টানা ৭০ দিন স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ নেই! প্রিয়জনদের না দেখেই চিরবিদায়ের শংকা জাগতো।

যারা কখনো কারাগারে যাননি, তাদের কাছে আমার কথাগুলো হয়তো খুব সাদামাটা মনে হবে। কিন্তু, বন্দী মানুষদের দিক থেকে ভাবলে আপনার হৃদয়টা হাহাকার করে উঠতে বাধ্য। একজন মানুষ রাষ্ট্রের অধীনে বন্দী, তার নিজের কোনো স্বাধীন কর্মক্ষমতা নাই; অথচ এই পরিস্থিতে তাদের নিয়ে সবাই নির্বিকার!

কারাগারে অনেক মজলুম মানুষকে ফেলে এসেছি। বৃদ্ধ, যুবক, কিশোর। অনেক ভালোবাসার মানুষদের ফেলে স্বার্থপরের মতো চলে এসেছি। জানি না, তারা কীভাবে ধৈর্য্য ধরছেন। আমি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ করছি, ৯০ হাজার কারাবন্দীর প্রতি একটু সদয় হোন প্লিজ…

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন