ভালো ফলাফল নয় ভালো মানুষ হওয়া চাই!

প্রকাশিত: ১১:২৫ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২০

এসএসসি ২০২০ সালের ফলাফল গতকাল প্রকাশিত হয়েছে। অদৃশ্য করোনাভাইরাস মহামারিতে মানুষ যখন দিশেহারা তখন এই ফলাফল অনেকের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়েছে। আবার গাজীপুরে নৃশংসভাবে খুন হওয়া নূরার মতো অনেক পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

বিগত বছরগুলোতে যেমন স্কুলে শিক্ষার্থীদের আনন্দমাখা হাস্যোজ্বল ছবি দেখতে পেতাম, ভালো ফলাফলের জন্য হৈ হুল্লড় করে আনন্দঘন পরিবেশ চোখে পড়তো। এবছর তাদের ঘরে বসেই আনন্দ করতে হয়েছে। বাস্তবতা মেনে নিয়ে করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দী অবস্থায়ই শিক্ষার্থীদের বর্তমান সময় কাটছে। তাই মোবাইলের ক্ষুদে বার্তা আর ইন্টারনেটের মাধ্যমেই ঘরে বসেই ফলাফল দেখতে হয়েছে।

তবে যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন কিন্তু আমাদের ছেড়ে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন তাদের পরিবারে কোনো আনন্দ ছিলো না। সন্তান হারা মা-বাবা ফলাফল দেখে আরো বেশি শোকাতুর হয়েছেন। সন্তানের স্মৃতিগুলো বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে তাদের ।

‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’। আমাদের দেশে শিক্ষার হার দিন দিন বেড়েই চলছে। এটা আমাদের জন্য ভবিষৎ সু-খবর। এখন দেশের মানুষ শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে যথেষ্ঠ ওয়াকিবহাল অবগত। মফস্বল বা গ্রামেও এখন শিক্ষার আলো পৌছেঁ গেছে। কষ্ট করে হলেও মা-বাবা তাদের সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে যান।

শিক্ষার হার বাড়ার পাশাপাশি ফলাফল ভালো করার অসুস্থ প্রতিযোগিতাও প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে। দেশের সরকারি বা বেসরকারি স্কুলগুলোতে প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্য জোড়েসোড়ে বেড়ে চলছে। সরকার বিভিন্ন সময় এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলেও পুরাপুরিভাবে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বাসায় কয়েক ধাপে টিউশন শিক্ষক তো রয়েছেই। প্রত্যেক পরিবারের চাওয়া তাদের সন্তান সর্বোচ্চ ফলাফল করুক।

বর্তমানে ভালো রেজাল্ট বলতে মনে করা হয় জিপিএ-৫ পাওয়া। কিন্তু অনেকেই জিপিএ-৫ না পেয়ে অসন্তুষ্ট। আবার কিছু কিছু পরিবার তো সন্তানকে মানসিক নির্যাতন করে যায়; এজন্য যে, তার সন্তানকে জিপিএ-৫ পেতেই হবে।

জিপিএ-৫ কে আমরা ভালো রেজাল্ট মনেকরি। মেধাবীরা অবশ্যই সর্বোচ্চ ভালো ফলাফল করবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তবে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য থাকে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। শিক্ষকরা চায় তাদের ছাত্র-ছাত্রী প্রকৃত পক্ষে একজন ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে।

কিন্তু ভালো ফলাফল কখনো একজন ভালো মানুষের মানদন্ড হতে পারে না। ভালো মানুষ হতে ভালো কিছু গুনাগুণ থাকতে হয়। মেধাবি শিক্ষার্থীরাই সমাজ এগিয়ে নিতে পারে, সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। এর অন্যতম প্রমাণ ‘সড়ক পথে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছাত্রদের আন্দোলন’। মেধাকে ভালো কাজে প্রয়োগ করেই পরিবার ও সমাজের জন্য ভালো কিছু করা সম্ভব। যে শিক্ষা সমাজ ও পরিবারকে সম্মান এনে দিবে।

সমাজের বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাই অনেক শিক্ষার্থীরই রেজাল্ট জিপিএ-৫ নেই। জিপিএ-৫ না পেয়েও মানসম্মত কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছে। ভালো রেজাল্ট না করায় ছোটো-খাটো কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে ভালো কিছু করতে ততো বাঁধা হয়ে দাড়ায়নি কখনোই।

এটিও পড়ুন: করোনায় কেমন আছে বিশ্ববিদ্যালয় : শিক্ষার্থীদের চিন্তা বাসা ভাড়া

এমন অনেকে আছেন যারা মোটামুটি রেজাল্ট নিয়ে, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ, ভালো চাকরি করছেন, ভালো মানুষ হিসেবে সমাজে সমাদৃত হয়েছেন।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজে মেধার মূল্যায়ণ যতদিন প্লাস, মাইনাস (গ্রেড পয়েন্ট) দিয়ে যাচাই করা হবে, ততদিন শিক্ষার মান পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না।

তাই হতাশ না হয়ে, পরিবারের ছোটদেরকে অনুৎসাহিত না করে, নিন্দা না করে, তাদেরকে ভালো মানুষ হওয়ার তাগিদ দেই। তাদেরকে ভালো কাজে উৎসাহ দেই। যা দ্বারা সমাজ ও পরিবার উপকৃত হবে।

আমাদের দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে গেছে। এমন অবস্থায় একজন মেধাবী ও ভালো মানুষই পারে আমাদের দূষিত সমাজটাকে পাপমুক্ত করতে।

লেখক: মোঃ নাজমুল হাসান
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী
পাবলিক ভয়েসের বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের প্রধান

মন্তব্য করুন