দারুল উলুম দেওবন্দ : প্রতিষ্ঠা ও সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট

দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

প্রকাশিত: ৮:৪৭ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২০

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ.-এর ইঙ্গিতে হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ.-এর নেতৃত্বে এবং যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গানে দীনের হাতে ১৮৬৬ ঈসায়ি সনের ৩০ মে, মোতাবেক ১৫-ই মুহররম ১২৮৩ হিজরি সনে ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ সাহারানপুর জেলায় দেওবন্দ নামক গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের দারুল উলুম দেওবন্দ।

দারুল উলুম দেওবন্দ। বর্তমান বিশ্বের এক নিখুঁত ইসলামী শিক্ষার সূতিকাগার প্রতিষ্ঠান। ইলমে হাদীস ও ইলমে তাফসিরের মাকবুল এবং অনন্য এক দরসগাহ। আউলিয়ায়ে কেরাম এবং মাশায়িখে হিন্দের একমাত্র রুহানি দিক্ষাগার। হিন্দের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্র সৈনিকদের একমাত্র অবস্থান কেন্দ্রই হলো ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’। যে বিদ্যাপীঠকে ‘আযহারে হিন্দ’ বলেও আখ্যা দেয়া হয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে বলা হয় উলামা ও ফুযালাদের ‘ইখলাস কা তাজমাহাল’।

এখানেই শেষ না… এটি এমন একটি বৃক্ষ, যেটাকে আল্লাহপ্রেমিকরা তারই ইশারা এবং ইলহামের মাধ্যমেই তার উপর পূর্ণ ভরসা রেখেই একনিষ্ঠতা ও লিল্লাহিয়্যাতকে পূজি করে প্রতিষ্ঠা করেছেন। যে প্রতিষ্ঠানের শাখা-প্রশাখা আজ সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিশ্বের রন্দ্রে রন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। এবং পুরো জাতীকে বিলিয়ে দিচ্ছে ইলমে ইসলামের সুবাস। আলোকিত করছে তার আলোয়।

দারুল উলুম দেওবন্দ এমন একটি চিন্তাচেতনার জ্ঞান সমুদ্র, যা নবুওয়াতের বক্ষ থেকে প্রবাহ হয়ে সাহাবাদের বক্ষ বেয়ে হিন্দুস্তান এসে আল্লামা শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবির বক্ষ ঘেসে মাওলানা কাসিম নানুতবি রাহ.; মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহ.; মাওলানা ইয়াকুব নানুতবি রাহ.’র মাধ্যমে দেওবন্দের পুস্পবাগানে এসে প্রলম্বিত হয়েছে। যার নদীমালা হিন্দের সীমা অতিক্রম করে আজ বিশ্বের মানচিত্রে বিস্তৃত হয়ে আছে। আর সমগ্র বিশ্বের ইলম পিপাসুরা তার অথবা তার থেকে সৃষ্ট পেয়ালা থেকে তাদের ইলমের পিপাসা নিবারণ করছে।

আমরা যদি পেছনে ফিরে যাই, দেখতে পারবো মুঘল শাসনামলের শেষ দিকে পুরো ভারতবর্ষে  যখন ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ ভারত বর্ষের ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে এ ফরমান জারি করে, ‘এখন থেকে বাদশাহ সালামতের রাজ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই হুকুমত চলবে।’ সেই দিন মুসনাদুল হিন্দ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. এর সুযোগ্য সন্তান হযরত শাহ আবদুল আজিজজ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এই ঘোষণা করেন যে- ‘ভারতবর্ষ এখন দারুল হরব (শত্রুকবলিত দেশ)। তাই প্রত্যেক ভারতবাসীর উপর ফরজ হলো- একে স্বাধীন করা।

তার এই সাহসী উচ্চারণ পুরো দিকদিগন্তে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের ন্যায়। ফলে দিশেহারা মুসলিম জাতি উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লব শুরু করেন। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয়- আলেম-উলামার উপর দমন-নিপীড়ন। হাজার হাজার আলেম-উলামাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। দিল্লির প্রতিটা অলিগলি আলেম ওলামার রক্তে রঞ্জিত হয়। এহেন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ইসলামের নামটুকু হয়তো আর বাকি থাকবে না। বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যত আরো খতরনাকই হবে। এমতাবস্থায় জাতীর এ ক্রান্তিলগ্নে একদল দীক্ষাপ্রাপ্ত সচেতন মুজাহিদ তৈরি করে তাদের মাধ্যমে আযাদি আন্দোলনের স্রোতধারাকে ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেয়া সহজতর বলে মনে হলো।

তাই দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনা, শলা-পরামর্শের পর সাময়িকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ রেখে সাম্রাজ্যবাদ ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় উজ্জীবিত, দীনি চেতনায় উৎসর্গ একদল জানবায মুজাহিদ তৈরির লক্ষ্যে এবং ইলমে নববীর সংরক্ষণ, ও ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ.-এর ইঙ্গিতে হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ.-এর নেতৃত্বে এবং যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গানে দীনের হাতে ১৮৬৬ ঈসায়ি সনের ৩০ মে, মোতাবেক ১৫-ই মুহররম ১২৮৩ হিজরি সনে ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ সাহারানপুর জেলায় দেওবন্দ নামক গ্রামে ঐতিহাসিক সাত্তা মসজিদ প্রাঙ্গনে একটি ডালিম গাছের ছায়ায়, ইলহামিভাবে কোনো প্রকার সরকারি সাহায্য ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের দারুল উলুম দেওবন্দ। (সূত্র: তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ; ইখলাস কা তাজমহল)

আলহামদুলিল্লাহ্‌ সে দারুল উলুম দেওবন্দের আদলেই উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আজ গড়ে ওঠেছে হাজার হাজার ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে যা ‘কওমী মাদরাসা’ নামে খ্যাত। এখান থেকে ইলমে দীনের অমৃত সুধা পানে পরিতৃপ্ত হচ্ছে কোটি কোটি মুসলমান। আলোকিত হচ্ছে পথহারা মানুষগুলো। এবং ইলমে নববির আলোসিক্ত এ কওমি মাদরসাগুলোই হচ্ছে মুসলমানদের দীন-ঈমান সংরক্ষণের সর্বশেষ দুর্গ।

দোআ করি, আল্লাহ এ দুর্গগুলোকে কিয়ামত অবধি প্রতিষ্ঠিত রাখুক। আমিন।

লেখক- অনুবাদক, সম্পাদক ও গ্রন্থাকার। গ্রাজুয়েট : দারুল উলুম দেওবন্দ। 

মন্তব্য করুন