রমজানের শেষ শুক্রবার: জুমাতুল বিদা নয়, আল কুদস দিবস

প্রকাশিত: ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ, মে ২২, ২০২০

রমজানের শেষ শুক্রবারকে “জুমাতুল বিদা” নামে অভিহিত করে অনেকেই এ দিবসটি ভিন্ন গুরুত্ব দিয়ে পালন করে থাকেন। রমজানের শেষ শুক্রবারের এদিন বাংলাদেশসহ ভারতের কিছু অঞ্চলে মুসলমানরা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে জুমার নামাজ আদায় করেন। মসজিদে মসজিদেও বাড়ে মুসুল্লিদের ভিড়। ভিন্ন রকম গুরুত্ব দিয়ে এ দিনটি পালন করে থাকেন অনেকেই।


কিন্তু ইসলামের পরিভাষায় “জুমাতুল বিদা” বলতে কিছু পাওয়া যায় না। রাসূল সা. বা সাহাবায়ে কেরামদের যুগে এ ধরণের কোনো প্রচলন নেই। রাসূল স. বা সাহাবায়ে কেরাম কেউ এদিনটি ভিন্ন গুরুত্ব দিয়ে পালন করেছেন এমন কোনো প্রমান পাওয়া যায় না। অনেকটা আঞ্চলিক প্রচলনের ভিত্তিতেই এ দিনের গুরুত্ব পেয়েছে বলে দাবি ইসলামী ব্যাক্তিত্বদের।

তবে আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কুরআন হাদিসের বাইরের কোনো বিষয়কে ইবাদাত হিসেবে পালন করাকে “বিদাআত” সাব্যস্থ করা হয়। তাই জুমাতুল বিদার প্রচলন একটি নতুন শরয়ী পরিভাষা তৈরির মতো ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

ইসলামে রমজান মাস এবং শুক্রবারকে ভিন্ন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রমজান মাস পবিত্র মাস মুমিনের আত্মসংযমের মাস হিসেবে আখ্যায়িত করে এ মাস মুসলমানদের জন্য সংযমের মাস হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। সেদিক থেকে রমজান শেষ হচ্ছে দেখে মুমিনের মনে কষ্ট ও আফসুস আসাটা দোষনীয় নয় কিন্তু কেবল আলাদা করে রমজানের শেষ জুমাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং এদিনের আলাদা ফযিলত আছে মনে করা ইসলামের পরিভাষার সাথে সমর্থনপূর্ণ হয় না।

তবে জুমার মাসের আলাদা ফজিলত রয়েছে ইসলামে। কিন্তু জুমাতুল বিদার কোনো কথা বলা নেই। যেমন হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের সঙ্গে একদিন শুক্রবারের ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায়রত অবস্থায় থাকে এবং আল্লাহতায়ালার কাছে কিছু চায়, আল্লাহতায়ালা অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসূলুল্লাহ সা. তার হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন। সূত্র : সহিহ বোখারি।

ইসলামি স্কলাররা ওই সময় সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘ইমামের মিম্বরে বসার সময় থেকে নামাজ শেষ করা পর্যন্ত সময়টিই সেই বিশেষ মুহূর্ত।’ সূত্র:  সহিহ মুসলিম

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. বর্ণনা করেন, শুক্রবার আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া কবুল হয়। বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ যাদুল মায়াদে বর্ণিত আছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। জুমার দিনের বিশেষ সেই মুহূর্ত সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনায় বলা হয়েছে, জুমার নামাজে সূরা ফাতিহার পর আমিন বলার সময়, আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়, মুয়াজ্জিন আজান দেওয়ার সময়, জুমার দিন সূর্য ঢলে পড়ার সময়, ইমাম খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে দাঁড়ানোর সময়। উভয় খুতবার মধ্যবর্তী সময় ও জুমার দিন ফজরের আজানের সময়। সুতরাং শুক্রবারের আলাদা গুরুত্বের কথা স্বীকৃত, কিন্তু জুমাতুল বিদার কোনো আলাদা ফজিলতের কথা কোথাও বলা হয়নি। এটাকে ইসলামি স্কলাররা সমর্থন করেন না। সুতরাং জুমাতুল বিদা বলে নতুন কিছু রসম-রেওয়াজ পালন করা থেকে সবার বিরত থাকা কর্তব্য।


অপরদিকে রমজান মাসের শেষ শুক্রবারকে ঐতিহাসিক আল-কুদস দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন ইরানের শিয়া সম্প্রদায়সহ বিশ্বের শিয়াদের ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী।


মুসলমানদের প্রথম কিবলা পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাসকে দখলমুক্ত করার আন্দোলনের প্রতীকী দিন হিসেবে এ দিনটিকে অভিহিত করেছেন তিনি।

বায়তুল মুকাদ্দাস বছরের পর বছর ধরে সন্ত্রাসবাদী ইসরাইলি ইহুদিদের দখলে রয়েছে। ফিলিস্তিনের মূল অধিবাসীদের অধিকাংশকে বিতাড়িত করে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইহুদিরা সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়াখ্যাত অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৬৭ সালে ইসরাইল বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে। এরপর থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসকে দখলমুক্ত করার জন্য সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে আল-কুদস দিবস পালিত হয়ে আসছে। পবিত্র রমজান মাসের শেষ জুমার দিনকে আল-কুদস দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

আল-কুদস দিবস বা আন্তর্জাতিক আল-কুদস দিবস ইমাম খোমেনী রহ. এর আহবানে ১৯৭৯ সালে ইরানে প্রথম শুরু হয়েছিল। এ দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে একাত্মতা প্রকাশ, জায়নবাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ এবং দখলদার সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইল কর্তৃক জেরুজালেম দখলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা। জেরুজালেম শহরের অপর নাম ‘কুদস’ বা ‘আল-কুদস’।

ইরানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইবরাহীম ইয়াজদি সর্বপ্রথম আল-কুদস দিবস র‌্যালি আয়োজনের ধারণা দেন। তারপর আয়াতুল্লাহ খোমেইনী ১৯৭৯ সালে ইরানে এর প্রবর্তন করেন। এরপর থেকে ইরানসহ আরও বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর আল-কুদস দিবসটি গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়।

মহানবী সা. মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদুন্নবী ও বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদের উদ্দেশ্যে সফরকে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ পবিত্র ঘর থেকেই তিনি মিরাজে গমন করেছিলেন। বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ এবং তার আশপাশের এলাকা বহু নবীর স্মৃতিবিজড়িত।

হজরত ইবরাহীম আ. কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর হজরত ইয়াকুব (আ.) জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর হজরত সুলায়মান আ. এই পবিত্র মসজিদের পুনঃনির্মাণ করেন। ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা. এ মসজিদ থেকে মেরাজ গমন (উর্ধগমন) করেন ও আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্য লাভ করেন। এ মসজিদ তাই মুসলমানদের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে থাকে কিন্তু মুসলমানদের এই পবিত্র ধর্মীয় স্থানকে দখলদার ইসরাইলিরা যুগের পর যুগ দখল করে রেখেছে।

তাই, রমজানের এই শেষ শুক্রবারই কেবল নয় বরং বিশ্ব মুসলমানদের সব সময়ই একত্রিত হয়ে “আল-কুদুস” রক্ষা ও মজলুম ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাড়ানো দরকার এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় আন্দোলন করা উচিত।

লেখা সংগ্রহ : ইনকিলাব, বার্তা২৪। সম্পাদনা : পাবলিক ভয়েস ডেস্ক।

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন