পারিপার্শ্বিক ক্ষমতাবলয়ে ইসলামী রাজনীতির ব্যর্থতা : প্রেক্ষিত – আইএবি

প্রকাশিত: ১১:৪৭ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২০

বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য “মরিয়া” না । ক্ষমতা গ্রহণের জন্য তাদের চাওয়াটাও “সর্বোচ্চ মাত্রায়” নাই । এই না থাকার কারণ নিয়ে অনেক কথা বলার আছে।

ইসলামী দলগুলো রাজনীতি করার জন্যই রাজনীতি করে। কেউ বুঝে করে, কেউ না বুঝে করে, কেউ নিরুপায় হয়ে করে, কেউ একটা ঘোরের চোরাবালিতে আটকে যায় বলে করে। কেউ  শুধুমাত্র পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক, উত্তরাধিকারিক ট্রেডিশন ধরে রাখার জন্য রাজনীতি চালায়।

আরও পড়ুন – সিটি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ : দলের প্রতি ১২ টি প্রশ্ন

এদের যে গতি, একের প্রতি অন্যের যে মনোভাব, এবং দীর্ঘদিন থেকে চর্চিত যে কালচার এগুলো যদি অব্যাহত থাকে এবং ক্যারিশমেটিক কোন চেঞ্জ না আসে, আপনি ধরে নিতে পারেন দূর ভবিষ্যতেও কোন ইসলামী দল ক্ষমতায় আরোহন করছে না।

তাহলে ইসলামী রাজনীতি করার কি দরকার? এইটা কি পুরোপুরি অনর্থক?

উত্তর হলো- ‘না’!

ক্ষমতায় যাওয়াই রাজনীতির একমাত্র উদ্দেশ্য না। ক্ষমতার বাইরেও রাজনীতির অনেকগুলো ক্রিয়াকলাপ থাকে। ছোট ছোট লক্ষ থাকে। সরকারকে কোন টা করতে বা না করতে বাধ্য করার কিছু ব্যাপার  থাকে। দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর এমন পদক্ষেপ থেকে শাসকদের বিরত থাকতে চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন থাকে।

এছাড়া, মূল ক্ষমতার বাইরে পারিপার্শ্বিক ক্ষমতাবলয়ে আদর্শিক অনুপ্রবেশ ছোট মাঝারি দলের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এই জায়গাটাতে বাংলাদেশের বাম রাজনীতিকে আমি সফল বলবো। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ Mass media বা গণমাধ্যমের কথা যদি বলি, তার নিয়ন্ত্রক কারা?  অনেকাংশেই বামরা।

সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক, কলাকুশলী, পরিকল্পনাবিদ, জনবল, প্রশিক্ষিত তৃণমূল কর্মী প্রায়ই পুরো সংবাদপত্র শিল্পে একচ্ছত্র আধিপত্য বামদের ।

ভাষা – সাহিত্য , শিল্প – সংস্কৃতির কথা ধরুন। গবেষণা ও মুক্ত জ্ঞান চর্চার কথাই বলুন।  কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, নাটক – চলচ্চিত্র, টকশো এসব জায়গাতে মূলধারায় তারাই আসীন ।

এই জায়গাগুলোতে ইসলামপন্থীদের অবস্থান কোথায় ? 

শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামী রাজনীতিকদের চিন্তা ভাবনা নাই বললেই চলে।‌ আমি একবার ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান ভাইকে প্রশ্ন করেছিলাম, শাসন ও প্রশাসনের নির্বাহী দায়িত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরাই সমাসীন হয় । আপনাদের এই যে বিশাল জনগোষ্ঠী এদেরকে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করার লক্ষ্যে একটি অথবা কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন কার্যকরী পরিকল্পনা আপনাদের আছে কিনা? তিনি বলেছিলেন, ‘আছে’।‌

কিন্তু সেই থাকাটা আমরা কখনও লক্ষ্য করিনি।‌

এক্ষেত্রে মরহুম ফজলুল করিম রাহিমাহুল্লাহর একটা দূরদর্শী পরিকল্পনা ছিল। তিনি মুসলিম শিশুদের বুনিয়াদি ধর্ম শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রতিটি গ্রামে একটি করে নূরানী মক্তব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং কার্যকর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি আলিয়া ও কওমীর বিভক্তি রেখা টেনে দুটির সিলেবাস ও ব্যবস্থাপনা আলাদা রেখেও আদর্শিক এবং চিন্তাগত ভাবে একীভূত করার একটা মডেল তৈরি করেছিলেন। ৫০ বছর আগের বাংলাদেশে এই পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দূরদর্শী এবং ফলপ্রসূ ছিল। সে সময়ের জন্য এটা একটা ভিশনারি মিশন ছিল।‌

এখন সময় বদলেছে ।‌  আজকে ৬৪ হাজার গ্রামে ৬৪ হাজার মক্তব প্রতিষ্ঠার জন্য এত বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নাই। কওমী আলিয়া এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন এমনকি ব্যক্তি উদ্যোগে বুনিয়াদি এই ঘাটতি এখন অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। তারপরও কোরআন শিক্ষার জন্য মক্তবের প্রয়োজনিয়তা শেষ হয়নি। বিদ্যমানটাকে আরো কার্যকর করার পাশাপাশি শিক্ষার অন্য খাতগুলোতেও মনোনিবেশ করা উচিৎ।

এখন প্রয়োজন আরো অগ্রসর চিন্তার ।  কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের একাডেমিক প্রতিষ্ঠান ‘কোরআন শিক্ষা বোর্ড’ নিয়ে যত শ্রম ও পরিকল্পনা ব্যয় করেন, যত ফান্ডরাইজিং করেন , শিক্ষার অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষ করে মেডিকেল, টেকনোলজি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জন্য তাদের কোন বোর্ড বা কাউন্সিল এ পর্যন্ত গঠিত হয়নি।

আরও পড়ুন – চরমোনাই তরিকা : নারীরা উপেক্ষিত কেনো?

তারমানে মরহুম পীর সাহেব যে জায়গাটাতে রেখে গিয়েছেন এখনো তারা সেখানেই আটকে আছেন।‌ এর চেয়ে প্রগ্রেসিভ চিন্তা করা কি মানা? উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ শুরু করার সময় ফুরিয়ে গেছে আরও বহু আগেই। এক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে ইসলামী দলগুলো পিছিয়ে আছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত কিছু নেতা আছেন যারা একই সাথে জনপ্রিয় পাবলিক স্পিকার। তারা চাইলে মাঠ কালেকশন এর মাধ্যমে শত কোটি টাকার ফান্ড গঠন করে নিজস্ব মিডিয়া ফার্ম গড়ে তুলতে পারতেন । কিন্তু চাঁদা তুলে ওয়াজ / ইসলামী সম্মেলন আয়োজনে তারা যতটা গুরুত্ব দেন, একটা দৈনিক পত্রিকা , একটা রেডিও চ্যানেল , কিংবা একটা টেলিভিশন কে সেভাবে তারা গুরুত্ব দেন না।

বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো শরীয়ত বিরোধী কোন আইনের কথা জানতে পারলে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন । কিন্তু তারা কখনো এর স্থায়ী সমাধানে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক আইন হচ্ছে কিনা তা নজরদারির জন্য কোন “সাংবিধানিক আদালত” প্রতিষ্ঠার দাবি জানান না। অথচ বাংলাদেশের যারাই ক্ষমতায় আসে তাদের নির্বাচনী ম্যানুফেস্টোতে ঘোষণা দেয়া থাকে যে,  তারা কোরআন সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন পাস করবে না। এই ঘোষণা অনেক বড় কিছু। এটাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের মতো একটি উচ্চ পর্যায়ের ‘শরিয়া সুপারভাইজারী কোর্ট’  প্রতিষ্ঠার দাবি তারা জানাতে পারতো। ‘ফেডারেল শরীয়াহ্ কোর্ট অফ পাকিস্তান’ সরকারের প্রণীত আইন গুলো  নিরীক্ষা করে যদি তাতে শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক কিছু পায়,  তাহলে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের কাছে এ বিষয়ে আপিল করার ক্ষমতা রাখে।‌

এছাড়াও তারা সর্বোচ্চ আদালতে শরিয়া অ্যাপিলেট বেঞ্চ স্থাপনের কর্মসূচি নিতে পারত। যেখানে প্রচলিত আইনের পাশাপাশি কেউ চাইলে শরীয়ার আলোকে তাদের মামলা নিষ্পত্তির জন্য যেতে পারতেন। এতে ইসলামী আইনের প্রায়োগিক বিষয়টা মানুষের কাছে তুলে ধরা যেত।

এভাবে আইন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্যে, বিজ্ঞানে, শিল্পে, গবেষণায়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ইসলামপন্থী দলগুলোর মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল।

যে বিপ্লবের স্বপ্ন তারা জনগনকে দেখান সেই বিপ্লব হুট করে ক্ষমতায় গিয়ে রাতারাতি সবকিছু প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপার নয়। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ ধরে ধরে সেটার কাঠামো দাঁড় করাতে হয়। ইসলামী দলগুলোকে বুঝতে হবে, ‘বিপ্লব মানে ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা নয়; সৃষ্টির প্রসব বেদনা’। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কোন একদিন তারা ভেঙে চুরমার করে দিবেন এরপর তার ধ্বংসস্তুপের উপর ইসলামী খেলাফতের পতাকা উড্ডীন করবেন, এটা বাস্তবতা বিবর্জিত  দিবাস্বপ্ন বৈ আর কিছু না। দুঃখজনক হচ্ছে সংগঠনের সিলেবাসভুক্ত বই-পুস্তকে বক্তব্য-বিবৃতিতে এই ধারণাটাই কর্মী-সমর্থকদের প্রদান করা হয় ।

Revolution is not any accidental phenomenon; rather it’s an architectural palace which could be made through proper designing and by putting brick  after brick. বিপ্লব কোন দৈব ঘটনা নয় ; এটি একটি  নান্দনিক প্রাসাদ । একটি নির্মাণ । যাকে যথার্থ পরিকল্পনায় একটি একটি করে ইট গেঁথে তৈরি করতে হয় ।

ইসলামী দলগুলো হাজার হাজার ইস্যুতে হাজারবার মিছিল মিটিং করে শক্তি ক্ষয় না করে এসব পারিপার্শ্বিক ক্ষমতাবলয়ে নিজেদের আদর্শিক অনুপ্রবেশ ঘটাতে পারলে তারা তাদের রাজনীতির কিছু শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে সমর্থ হবে । সেই সাথে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিপ্লব নির্মাণের পথে স্থানিক প্রতিপত্তি সুসংহত করবে।

লেখক : জিয়া আল হায়দার।

সংশ্লিষ্ট লেখা :

করোনায় মসজিদ ভিত্তিক ত্রাণ কার্যক্রম : নামাজের ইমাম হোক সমাজের ইমাম 

ইসলামী আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন ও গাজী আতাউর রহমানের বিশ্লেষণ

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সর্বোচ্চ নেতৃত্বগুনে উন্নীত একটি দল

মতামত বিভাগের যে কোন লেখা পড়তে ক্লিক করুন

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সম্পর্কিত নিউজ পড়তে ক্লিক করুন

#এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন