যাকাত আদায়ের এখনই সময়

প্রকাশিত: ১:১৯ অপরাহ্ণ, মে ২০, ২০২০

ইসলামী জীবন বিধানে যাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। অর্থনৈতিক ইবাদতের মধ্যে এটি অন্যতম। এটি ইসলামের তৃতীয় ভিত্তি বা রুকন। ঈমান ও নামাজের পরই এর অবস্থান। যেমন কুরআনে এসেছে- যারা অদৃশ্যে ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে ও তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দান করেছি তা হতে ব্যয় করে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ৩)

দান করা বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু যাকাত আদায় করা বাধ্যতামূলক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১১০)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর হক আদায় করো শস্য কাটার সময়।’ (সূরা আনআম, আয়াত : ১৪১)

যাকাত আদায়ের সময় :
পবিত্র রমজান সহানুভূতির মাস। এ মাস শুরু হতেই মানুষের অন্তর ও ঈমান-আমলের অনেক সুন্দর ও মনোরম পরিবর্তন হয়। এমনকি পারষ্পরিক নিরাপত্তা, সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ববোধের এক আশ্চর্য পরিবেশ গড়ে ওঠে। তাই এই মাসে সাধারণত ধন-সম্পদের যাকাত আদায়ের প্রচলন আছে। যাকাত আদায়ের সাথে সরাসরি রমজান মাসের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও রমজান মাসই যাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময়।

এ মাসে দান-সদকা করলে অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি নেকি হয়। আর এখন তো করোনা মহামারির কারণে সমাজের অসহায় মানুষগুলো অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। তাই একে তো রমজান দ্বিতীয়ত মানুষের এখন অভাবের সময় তাই যাকাত আদায়ের এখনই মোক্ষম সময়। তাই এ সময় যাকাত আদায় করলে গরিব-অসহায় মানুষগুলো সাহরি-ইফতারের জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে পারবে। কোনোরকম দিন কাটাতে পারবে।

যাকাত গরিবের অধিকার :
যাকাত কোনো দয়া ও করুণার বিষয় নয়, ইহা গরিব-অসহায় মানুষের অধিকার। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাদের ধনসম্পদে ছিল প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক বা ন্যায্য অধিকার।’ (সূরা যারিয়াত, আয়াত : ১৫-১৯)

যাকাত না দেয়ার পরিণতি :
যাকাত আদায় না করলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয়। সম্পদের পরিমাণও কমে যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘সেসব মুশরিকদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য, যারা যাকাত দেয় না।’ (সূরা হামিম আসসাজদা, আয়াত : ৭-৮)

হাদীসের বিশুদ্ধতম গ্রন্থ সহীহ বোখারীতে এসেছে, ‘যারা আল্লাহর দেয়া ধন-মালে কার্পণ্য করে, তারা যেন মনে না করে যে, তাদের জন্য তা মঙ্গলময় বরং তা তাদের জন্য খুবই খারাপ। তারা যে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করেছে, তাই কিয়ামতের দিন তাদের গলার বেড়ি দেয়া হবে।’

যাকাতের উপকারিতা :
ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে যাকাত আদায়ের উপকারিতা অগণিত অসংখ্য। মহানবী সা. বলেন, ‘দাতা আল্লাহর কাছে প্রিয়। মানুষের কাছে প্রিয়। জান্নাতের নিকটতম। জাহান্নাম থেকে দূরে। সাধারণ দাতা অধিক ইবাদতকারী কৃপণ অপেক্ষা আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৬১)

যাকাতদাতা ফেরেশতার দোয়া লাভ করে। নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা যাকাত আদায় করে, তখন ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করে।’

যাকাত দারিদ্র বিমোচন করে :

যাকাত দারিদ্র বিমোচন করে ও সম্পদের প্রবাহ তৈরি করে। ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করে। আল্লাহ পাক বলেন, ‘যাতে তোমাদের বিত্তবানদের মাঝেই শুধু সম্পদ আবর্তন না করে। (সূরা হাশর, আয়াত : ৭)

যাকাতে সম্পদ বৃদ্ধি হয় :
যাকাত ধন-সম্পদে প্রবৃদ্ধি ঘটায়। এতে সম্পদে বরকত হয়। বাহ্যত সম্পদ কমে যেতে দেখলেও প্রকৃতপক্ষে তাতে বৃদ্ধি ঘটে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তোমরা যে যাকাত দাও, প্রকৃতপক্ষে সেই যাকাত তোমাদের সম্পদ বৃদ্ধি করে।’ (সূরা রোম, আয়াত : ৩৯)

যাকাত সম্পদ পবিত্র করে :
যাকাত ধন-সম্পদের পবিত্রতা সাধন করে। নিজের সম্পদের মধ্যে অপরের সম্পদ মিশে থাকলে তা কলুষিত হয়। অপরের সম্পদ বের করে না দেওয়া পর্যন্ত তা পবিত্র হতে পারে না। এ কারণে প্রিয়নবী সা. বলেছেন, ‘তুমি যখন তোমার সম্পদের যাকাত দিয়ে দিলে, তখন তুমি তা হতে (তোমার পক্ষে) খারাপটা দূর করে দিলে।’ অর্থাৎ গরিব-মিসকিনের যে ভাগটা তোমার সম্পদের মিশে ছিল তা সরিয়ে দিয়ে নিজের সম্পদকে পবিত্র করলে।

যাকাত ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠার মাধ্যম :
যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সমাজে পারষ্পরিক ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, দৃঢ় ও মজবুত সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। হযরত আবু দারদা রা. হতে বর্ণিত, মহানবী সা. বলেছেন, ‘যাকাত ইসলামের সেতু।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৩০৩৮ )

যাকাত আত্মশুদ্ধির মাধ্যম :
যাকাত দেয়ার মাধ্যমে ধনী ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি হয়। ধনী ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সমৃদ্ধি ও তার অন্তর্নিহিত সত্তার বিকাশ সাধন হয়। আল্লাহ পাক বলেন, ‘আপনি তাদের মাল থেকে যাকাত গ্রহণ করুন যা দ্বারা তাদেরকে পাক ও পবিত্র করবেন।’ (সূরা তওবা, আয়াত : ১০৩)

হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘প্রতিটি বস্তুরই একটি যাকাত রয়েছে, আর মানুষের দেহের যাকাত হলো রোজা।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৭৪৫)।

কী পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত দিতে হয় :
সারা বছর নিজের ও পরিবারের যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে কোনো মুসলমানের কাছে কমপক্ষে সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রোপা অথবা সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসা পণ্য থাকে, তবে সম্পদের শতকারা আড়াই শতাংশ হিসাবে আল্লাহর নির্ধারিত খাতে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করতে হয়-এটাই যাকাত।

যাকাতের খাত :
পবিত্র কুরআনে যাকাতের আটটি খাত উল্লেখ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মূলত সদাকাত হলো ফকির, মিসকিন, যাকাতকর্মী, অনুরক্ত ব্যক্তি ও নওমুসলিম, কৃতদাস, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে জিহাদ ও বিপদগ্রস্ত বিদেশি মুসাফির ও পথ সন্তানদের জন্য। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞানী ও পরম কৌশলী।’ (সূরা তওবা, আয়াত : ৬০)

সঠিক হিসাব অনুযায়ী যাকাত প্রদান করা : সঠিক হিসাব অনুযায়ী যাকাত প্রদান করা হলেই পুরো সম্পত্তি হালাল হয়। পুরো সম্পদের হিসাব-নিকাশ ছাড়া নামে মাত্র কিছু শাড়ি আর লুঙ্গি দিয়ে দিলে যাকাত আদায় হবে না।

যাকাত হিসেবে যে কোনো বস্তু দেয়ার চেয়ে নগদ অর্থ দেয়াই ভালো। এতে করে গরিব-অসহায় মানুষগুলো সত্যিকারভাবে উপকৃত হবে। নিজেদের প্রয়োজনীয় খাতে খরচ করতে পারবে।

লেখক : মুফতী নূর মুহাম্মদ রাহমানী
সিনিয়র শিক্ষক জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত
৪৩ নবাব সলিমুল্লাহ রোড, চাষাড়া, নারায়ণগঞঞ্জ

এটিও পড়ুন: জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২২০০ টাকা ও সর্বনিম্ন ৭০ টাকা হারে ফিতরা নির্ধারণ

আরো পড়ুন: খুলনায় ফিতরা সর্বনিম্ন ৬০ টাকা নির্ধারণ

মন্তব্য করুন