ঝরে পড়া এক আলোর পিদিম

প্রকাশিত: ১:১৬ অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০২০

তিনি আজ মরেও অমর!

জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই যারা আমরণ সাধনা করেন। তাদের লক্ষ্য থাকে অনেক বড় হওয়া। ধ্যানে-জ্ঞানে পরমে থাকে ডানা মেলে আকাশে উড়বার অদম্য বাসনা। তাদের অনেকে বড়ও হন একদিন। যশ-খ্যাতি তাদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেয়। সবাই তাদের চেনে। শ্রদ্ধা করে। বরণ করে। তারা নন্দিত।

কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষ আমাদের সবার আড়ালে থেকে জীবনযাপন করে এ দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়ে চলে যান। যারা নীরবে নিরালায় সবার অজান্তে মানুষের জন্য, সমাজের কল্যাণে, দেশের হিতে এবং বিশ্ব মানবতার সেবায় তিলতিল করে আপন অস্তিত্ব বিকিয়ে দিয়ে চলেছেন। জীবনের উষালগ্ন থেকে যারা ব্রতী হয়েছেন উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে, আদর্শ জাতি গঠনে এবং বিশ্ব সংসারের কুশল কামনায়। সাফল্য ও কর্মবৈচিত্রের এই পড়ন্ত বেলায়ও যারা নিরন্তর সাধনা করে চলেছিলেন। তাদের ভুলে যাওয়া বড় অন্যায়। বরং তারাইতো বেশী শ্রদ্ধার পাত্র। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আসে অন্তরের গহীন থেকে। তাদের গলায় সাফল্যের মালা দান হয় ভালোবাসার টানে, আত্মার শক্তিতে। তাদের মহানুভবতা আকাশসম বরং তারও ওপরে।

এমনভাবে কোনো কোনো মানুষ সবার প্রিয় হয়েও বাস করেন নিভৃতে। কোনো কোনো মানুষ সবার মান্য হয়েও বাস করেন নিঃশব্দে। তারা আল্লাহর দুনিয়ায় এসে আল্লাহর দীনের কাজে ডুবে থাকেন। নিজের চেষ্টা, শ্রম-সাধনা বিলিয়ে যান অকাতরে। আর সেটা দেওয়াটাই থাকে তাদের কাজ। নির্দিষ্ট সময় এলে আবার আল্লাহর হুকুমে দুনিয়া ছেড়ে আল্লাহর কাছে চলে যান। দুনিয়ার মানুষ তাকে হারিয়ে বুঝতে পারে-তিনি কতো বড়ো আশ্রয় ছিলেন। কতো বড়ো আপন ঠিকানা ছিলেন। কতো বড়ো মহা মনীষী ছিলেন। তখন মানুষ শোকে-কেঁদে বুক ভাসায়। এমনি একজন মানুষ, সর্বজনমান্য আল্লাহর ওলি, উস্তাযুল আসাতিযা, মুস্তাজাবুদ দাওয়াত ছিলেন, ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ দারুল উলুম দেওবন্দের শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রহ.।

জন্ম : মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরি ১৩৬২ হিজরি মোতাবেক ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বনাস কাঁথা (উত্তর গুজরাট) মৌজা কালীত্রা জেলার বাসিন্দা। তাঁর বাবা-মা  “আহমাদ” নাম রেখেছিলেন তার। কিন্তু তিনি যখন মাদরাসা মাযাহির উলূম সাহারানপুর ভর্তি হোন, তখন তিনি তাঁর নামের শুরুতে “সাঈদ” যুক্ত করেছিলেন, এইভাবে তাঁর পুরো নাম দিয়েছিলেন “সাঈদ আহমদ”

শিক্ষাজীবন : হজরত পালনপুরির প্রাথমিক শিক্ষা তার নিজ শহর গুজরাটে শুরু করেন। পিতার কাছ থেকেই শুরু হয় তার ইলম অর্জনের হাতেখড়ি। শহরেই তিনি ধর্মতত্ত্বে পড়াশোনা করেছিলেন। তারপর দারুল উলূমে দেওবন্দে যান এবং সেখানে প্রাথমিক ফারসি বই পড়েন।

দারুল উলূমে দেওবন্দ তাঁর অবস্থান ছয় মাস স্থায়ী হয়। অতঃপর তিনি নাজির আহমদ পালনপুরীর মাদরাসায় ভর্তি হন এবং সেখানে আরবি স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। যেখানে মুহাম্মদ আকবর পালানপুরী এবং হাশিম বুখারি তাঁর বিশেষ শিক্ষক ছিলেন।

১৩৭৭ হিজরিতে তিনি মাযাহির উলূম সাহারানপুরে ভর্তি হন, সেখানে ব্যাকরণ, যুক্তি ও দর্শন নিয়ে বেশিরভাগ বই পড়েছিলেন, পরে ১৩৮০ হিজরীতে তিনি ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে  দারুল উলূম দেওবন্দে আবার ভর্তি হন এবং হাদিস, তাফসির ও ফিকাহ ছাড়াও আরও অনেক শিল্পকলা তখন অধ্যয়ন করেন।

১৩২৮ হিজরী অনুসারে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে দাওরায়ে হাদিস পড়ে স্নাতক হন এবং বার্ষিক পরীক্ষায় স্বতন্ত্র নম্বর অর্জন করেন। পরের শিক্ষাবর্ষে তিনি ইফতা বিভাগে ভর্তি হন এবং ফতোয়া লেখার প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করেন।

কর্মজীবন : ইফতা সমাপ্তির পরে ১৩৮৪ হিজরিতে আলিয়া মাদরাসা দারুল উলূম আশরাফিয়া রণদীরে (সুরত) শিক্ষক নিযুক্ত হন, সেখানে তিনি প্রায় দশ বছর শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ১৩৯৩ হিজরিতে দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শুরার সম্মানিত সদস্য মুহাম্মদ মনজুর নোমানীর পরামর্শে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষক পদে নির্বাচিত হন এবং তিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত দারুল উলূমে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

দারুল উলূম দেওন্দে বিভিন্ন চারুকলার বই পড়ানোর পাশাপাশি তিনি তিরমিযি শরিফ প্রথম খণ্ড ও তাহাবি শরিফের পাঠ দান করতেন। তার দারস অত্যন্ত জনপ্রিয়, সংগঠিত এবং তথ্যে পূর্ণ ছিল৷ শিক্ষার্থীরা তার বক্তৃতার নোট নেওয়ার প্রবণতা রাখতো শুরু থেকেই। তাঁর বক্তব্য এতটাই স্থির এবং স্বচ্ছ যে- দারুল উলূমের শাইখুল-হাদিস এবং সদরুল মুদাররিসিন নাসির আহমদ খান (১৪২৯ হিজরি ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ) নিজের অসুস্থতার কারণে বুখারি শরিফের পাঠদানের দায়িত্ব অর্পণ করেন। পরে তিনি দেওবন্দের শাইখুল হাদিস পদে সমাসীন হন।

দারস-তাদরিস : হযরত পালনপুরির দরস ছিল হযরতের জীবন্ত কারামত। কঠিন কঠিন বিষয় হযরত সহজেই বুঝাতে পারতেন । হযরত বলতেন- যেত্নে  ভি কঠিন মাসআলা লাও মাই চুটকি সে সমঝা দোঙ্গা! ঘন্টার পর ঘন্টা হযরত দরস দিতেন বিরক্তি লাগতো না । মাঝে মাঝে ক্লান্তি দূর করার জন্য হাস্যরস করতেন। আমার দেখামতে, দারুল উলুমের সবচেয়ে আদর্শবান উস্তাদ ছিলেন তিনি। নিজস্ব মানহায ছিল সবকিছুতে চলন-বলন, আচার-ব্যবহার সবক্ষেত্রে। হযরত সময় নষ্ট হবে সেজন্য দোস্ত আহবাবদের দাওয়াতও গ্রহণ করতেন না । দরসের ব্যাপারে ছিলেন আপোষহীন। সকালে   আহলিয়ার ইন্তেকাল, দাফন-কাফন শেষ করে জোহরের আগে দরসে উপস্থিত।

প্রয়াত শায়খে সানি আবদুল হক আজমি রহ-এর ইন্তেকালের দিন হযরত দরসে আসলেন । দোয়া করলেন আর বললেন- কেছি কি ওহ যেতনি ভি বুযুর্গ আদমি হো, ইনতিকাল কি অজাহসে দীনি কাম বন্দ নেহি হো সাকতা

দরস শেষ হতো সাড়ে বারটায় সঙ্গে সঙ্গে কিতাব বন্ধ করে ফেলতেন । কখনো কখনো এক দুই মিনিট দেরি হয়ে গেলে মজা  করে বলতেন সরি ! ছাত্ররা হেসে খুন। কখনো মজা করে বলতেন এহ বাত মুফতি গুগল ছে পুচহ লো। একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন।

হযরতের যে বিষয়টা আমাকে বেশি আকৃষ্ট করতো তা হলো তার গাম্ভীর্যতা। আল্লাহ তার চেহারায় অনেক রুগুব ঢেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন হাস্যরস করতেন পরিবেশ সহজ হয়ে যেত। অনেক অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে এই মুহূর্তে। হযরত ছিলেন ভালোলাগা ভালোবাসার নাম। হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ. ও কাসেম নানুতবি রহ.-এর ভাষ্যকার। তাদের কঠিন কঠিন কিতাবগুলো খুব সহজে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

লেখালেখি ও রচনাবলী : মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. নিজে পড়াতেন আবার ব্যবসাও করতেন। করতেন লেখালেখিও। তার রচনাবলির সংখ্যা অনেক। পাঠদানের পাশাপাশি তার জীবনের বাকি সময়গুলোই তিনি লেখালেখিতে ব্যয় করেছেন। তার অসংখ্য রচনাবলী থেকে কয়েকটি রচনা হলো- মাবাদিয়াত ফিকাহ, আপ ফতোয়া কেইসে দে, حرمت مصاہرت, داڑھی اور انبیا کی سنت, تحشیہ امدادالفتاوی, কিয়া মুক্তাদি পর ফাতিহা ওয়াজিব হ্যায়, تسہیل ادلہ کاملہ, তাফসিরে হেদায়াতুল কুরআন, রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিয়া, আসান নাহু, আসান মানতেক, আসান সরফ, মাবাদিউল ফালসাফাহ (আরবি), মুইনুল ফালসাফাহ, আল আউনুল কাবির, ফাইযুল মুনঈম, মিফতাহুত তাহযিব, তুহফাতুদ দুরার, হায়াতে ইমাম দাউদ, হায়াতে ইমাম তাহাবি। এ ছাড়াও আরও গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন।

দিনাতিপাতে সাদামাটা একটি জীবন ছিল তার। বিশ্ববিখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠানের শাইখুল হাদিস ছিলেন তিনি। কিন্তু কিঞ্চিৎ পরিমাণও কোনো বিলাসিতা করতেন না। পরিমিত খাবার আর প্রয়োজনমাফিক খরচ করতেন সবসময়! রিকশায় চড়ে দরসে আসতেন। অথচ চাইলে দামি গাড়ি ব্যবহার করতে পারতেন। নিজের কাজ অনেকটা নিজেই করতেন। সব কাজ ঠিক সময়মতো করতেন। কোনো অনিয়ম বিলকুল পছন্দ করতেন না।

ওফাত (মৃত্যু) :

ইবনে আবিয যিনাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন- যে আলেম দুনিয়াদারদের সন্তুষ্টি কামনা করে সে জাহিলের চেয়ে অপদার্থ। পকৃত আলেম আল্লাহর সম্প্রীতি অনুসন্ধান করে,  এতে দুনিয়াদার যদিও অসন্তুষ্ট হয়।

তাআল্লুক মাআল্লা তাঁদের পুঁজি। এর মাধ্যমে খুঁজে নেন নিজের সমস্যার সমাধান। হজরতুল উস্তায সমকালের একজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও জীবন কাটাচ্ছিলেন আত্মহীনতায়। বস্তুপূজার ক্রান্তিকালেও বেয়েছিলেন বৈঠা স্রোতের উল্টা। তিনি দৃশ্যমান বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে অদৃশ্যের প্রতি ভরসাকে জীবন সংগ্রামে বিবেচনায় এনেছিলেন। এবং তাঁর এই অভিযাত্রা ছিল দুনিয়া পূজার প্রতিবেশ থেকে হিজরত করে খোদার সন্তুষ্টির আলোকিত বন্দরের দিকে।

এভাবেই হজরতুল উস্তায রাহিমাহুল্লাহও আমাদের ইয়াতিম করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন তাঁর পরম বন্ধু মহান প্রভুর সান্নিধ্যে। সর্বোপরি মহান রাব্বে কারীমের দরবারে আরতি পেশ করি, তিনি যেনো তাঁর কবরে রহমতের বারি বর্ষণ করেন ও জান্নাতুল ফিরদউসে উচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন!

#এনকিউ/আরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন