প্রতিদিনের তারাবীহ’র তেলাওয়াতকৃত আয়াতের তাৎপর্য : ২২ তম রমজান

প্রকাশিত: ৪:৫০ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২০

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আজকে সালাতুত তারাবীহে পঠিতব্য অংশের পয়েন্টভিত্তিক কিঞ্চিত আলোকপাত

২৫ নং পারা :

২৪ তম পারার শেষের দিকে আল্লাহ তাআলার চূড়ান্ত ন্যায়পরায়ণতার কথা এসেছে, যার কারণে কিয়ামতের দিন কেউ ন্যায়বিচার বঞ্চিত হবে না৷ পচিশতম পারার শুরুতে বলা হয়েছে, কিয়ামত সংঘটিত হবার নির্ধারিত সময় কেবল আল্লাহ তাআলাই জানেন৷ মানুষ শপিং, মার্কেটিংয়ে থাকবে, বিনোদনে মত্ত থাকবে তো হঠাৎ কিয়ামত কায়েম হয়ে যাবে৷

এদিন মুশরিকদের আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, কোথায় গেলো তোমাদের ওই অংশীদার, যাদের তোমরা উপাসনা করতে? তারা অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে জবাব দেবে, আজ আমাদের কেউ নেই যাদেরকে আপনার শরীক হিসেবে আমরা স্বীকার করব৷ (হা-মীম সাজদাহ: ৪৭)

সুরার শেষের দিকে আল্লাহ তাআলা এই জগতে এবং মানুষের মাঝে লুক্কায়িত রহস্যে কুরআনের সত্যতার প্রমাণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, ‘এখন আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করাব পৃথিবীর দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের সত্তার মধ্যেও; ফলে তাদের কাছে ফুটে উঠবে যে, এ কোরআন সত্য’। (৫৩)

  • এই আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশ্বজগতের ছোট-বড় সৃষ্টি তথা আকাশ, পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী যে কোনো বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে তা আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও কুদরত এবং তাঁর একত্বের সাক্ষ্য দেয়৷ এর চাইতে আরো নিকটবর্তী বস্তু স্বয়ং মানুষের প্রাণ ও দেহ৷ তার এক একটি অঙ্গ এবং তাতে কর্মরত সূক্ষ্ম ও নাজুক যন্ত্রপাতির মধ্যে তার আরাম ও সুখের বিস্ময়কর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷

এসব যন্ত্রপাতিকে এমন মজবুত করা হয়েছে যে, সত্তর-আশি বছর পর্যন্তও ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না৷ মানুষের গ্রন্থিসমূহে যে স্প্রিং লাগানো হয়েছে, তা মানুষের তৈরি হলে ইস্পাত নির্মিত স্প্রিংও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে খতম হয়ে যেত৷

মানুষের হাতের চামড়া এবং তাতে অঙ্কিত রেখাও সারাজীবনে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না৷ এসব ব্যাপারে যদি সামান্য জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিও চিন্তাভাবনা করে, তবে সে এ বিশ্বাসে উপনীত হতে বাধ্য হবে যে, তার অবশ্যই একজন স্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা আছেন৷ যাঁর জ্ঞান ও কুদরত অসীম এবং যাঁর কোনো সমকক্ষ হতে পারে না৷ (মা’আরিফ)

এই কুরআন বস্তুগত নয়, বরং একটি জ্ঞানগত মু’জেযা৷ মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে যতই উন্নতি সাধন করবে, কুরআনের সত্যতা ততই পরিস্ফুটিত হবে৷ এমন সময় আসবে যখন প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তিই এই কুরআনের সামনে নতশীর হয়ে পড়বে৷

সুরা শুরা

সুরা শুরা মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৫৩ টি আয়াত ও ৫ টি রুকু রয়েছে৷ এই সুরার নাম ‘শুরা’ এ জন্য নামকরণ করা হয়েছে যে, এখানে একটি শব্দ ‘শুরা’ আছে৷ যার অর্থ মাশওয়ারা বা পরামর্শ৷ এখানে একটি আয়াত আছে- অর্থাৎ তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শক্রমে স্থিরীকৃত হয়৷ (৩৮)

অর্থাৎ যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরীয়ত কোনো বিশেষ বিধান নির্দিষ্ট করে নি, সেগুলো মীমাংসার কাজে তারা পরস্পর পরামর্শ করে৷

ইমাম জাসসাস আহকামুল কুরআনে বলেন: এ আয়াত থেকে পরামর্শের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে৷ এতে আমাদের প্রতি পরামর্শসপেক্ষ কাজে তাড়াহুড়ো না করার, নিজস্ব মতকেই প্রাধান্য দিয়ে কাজ না করার এবং জ্ঞানী ও সুধীবর্গের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ রয়েছে৷

  • এই সুরার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হচ্ছে, ওহী এবং রিসালাত৷ বিরুদ্ধবাদীদের কুরআনের মতো আরেকটি কিতাব বানানোর অক্ষমতার বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য সুরার শুরুতে হুরূফে মুকাত্তা’আত নিয়ে আসা হয়েছে৷ একথা বোঝানো উদ্দেশ্য যে, এই হরফগুলো বা এই ভাষার হরফগুলোর সমষ্টিতেই কুরআন হয়েছে৷

সুতরাং এর মতো একটি কুরআন তোমরা বানিয়ে দেখাও৷ পুরো কুরআন থাক, ছোট একটি সুরা অন্তত বানিয়ে দেখাও৷ হুরূফে মুকাত্তা’আতের পরেই আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলছেন- ‘এমনিভাবে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববতীদের প্রতি ওহী প্রেরণ করেন’৷ (৩)

তাহলে বোঝা গেলো ওহীর এই স্রোতধারা আদিকাল থেকে শেষ নবী পর্যন্ত একইভাবে জারি ছিলো৷ মধ্যখানে আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্বের বিবরণের পর আবারও ওহী সম্পর্কে বলছেন- ‘এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আরবি ভাষায় কুরআন নাযিল করেছ, যাতে আপনি মক্কা ও তার আশপাশের লোকদের সতর্ক করেন’৷ (৩-৭)

রিসালাতের বিষয়বস্তু পাকাপোক্ত এবং মজবুত করার জন্য এই বাস্তবতা তুলে ধরা হলো যে, আল্লাহর কাছে দ্বীন একটাই৷ সমস্ত নবী-রাসূল একই দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্যে দুনিয়ায় আগমন করেছেন৷ শরীয়ত ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবার দ্বীন একটাই ছিলো; দ্বীনে ইসলাম৷ হযরত নূহ, হযরত ইবরাহীম, হযরত মুসা, হযরত ঈসা আলাইহিমুস সালামকে একই দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্যে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে৷ এবং তাঁদের অনুসারীদের বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে৷ কিন্তু আহলে কিতাব হিংসা ও জিদের বশবর্তী হয়ে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে নিলো৷

তাদের সেই বিচ্ছিন্নতা মেটানোর জন্যেই আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁকে হুকুম দিয়েছেন- ‘সুতরাং আপনি এই দ্বীনের প্রতিই দাওয়াত দিন এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাকুন৷ আপনি তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করবেন না৷ বলুন, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন, আমি তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি’৷ (১৫)

ﺃَﻥْ ﺃَﻗِﻴﻤُﻮﺍ ﺍﻟﺪِّﻳﻦَ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺘَﻔَﺮَّﻗُﻮﺍ ﻓِﻴﻪِ

অর্থ : তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না। (১৩)

এ আয়াতে দীন প্রতিষ্ঠিত করা এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টির নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে৷

আগে ঈমানের আলোচনা হয়েছে, এখন ঈমানদারদের কিছু বিশেষ গুণাগুণের বিবরণ দেয়া হচ্ছে-

  • এক. তারা তাদের পালনকর্তার উপর ভরসা রাখে৷
    দুই. বড় বড় গোনাহ এবং অশ্লীল ও লজ্জাজনক কাজ থেকে বিরত থাকে৷
    তিন. রাগান্বিত হলে ক্ষমা করে দেয়৷
    চার. আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করে৷
    পাঁচ. নিয়মিত নামায আদায় করে৷
    ছয়. যে কোনো কাজ করে পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে৷
    সাত. আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে৷
    আট. তাদের উপর যদি কেউ যুলুম ও সীমালঙ্ঘন করে, তাহলে সমান সমান প্রতিশোধ গ্রহণ করে৷ বাড়াবাড়ি করে না৷ (৩৫-৪০)

এই গুণগুলো যদি আজ মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি হয়ে যেত, তাহলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে আমূল পরিবর্তন চলে আসত, বিপ্লব সাধিত হতো৷

সুরা যুখরুফ

সুরা যুখরুফ মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৮৯ টি আয়াত ও ৭ টি রুকু রয়েছে৷ যুখরুফ শব্দ সোনা বা সৌন্দর্যের অর্থে ব্যবহৃত হয়৷ এই সুরার বিষয়বস্তু ঈমানের মূলনীতি৷ সুরা শুরু হয়েছে কুরআনের আলোচনার মাধ্যমে৷ আল্লাহ এই সুস্পষ্ট এবং আলোকময় কিতাবের কসম করে বলেছেন, আমি একে করেছি কুরআন আরবি ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝো৷ নিশ্চয় এ কুরআন আমার কাছে সমুন্নত অটল রয়েছে লওহে-মাহফুযে৷

এরপর এই সুরায় আল্লাহ তাআলার কুদরতের দলিল সম্পর্কে আলোচনা এসেছে৷ এই তো আসমানের নীল ছাদ, এই তো যমীনের বিছানা, সুউচ্চ পাহাড়, প্রবাহমান নদী, দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র, পানিতে ভাসমান নৌকা এবং জাহাজ, আসমান থেকে টপটপ করে বর্ষিত বৃষ্টি, সব ধরনের আহারযোগ্য প্রাণী, বাহনযোগ্য জন্তু এ সব মহান আল্লাহর কুদরত এবং প্রজ্ঞার জীবন্ত সাক্ষী৷

  • এই সুরায় জাহিলিয়াতের যুগের এক নিতান্ত ঘৃণ্য চিন্তার প্রসঙ্গ ওঠে এসেছে৷ তারা কন্যা সন্তানকে খুব ঘৃণা করত (নাউযুবিল্লাহ)৷ এটা তাদের স্বভাবগত বিষয় হয়ে গিয়েছিল৷ কারো যদি কন্যা সন্তান জন্ম হতো, তখন মানুষ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকত৷ এবং এই কন্যা সন্তানকে জীবন্ত মাটির নিচে পুতে মারার ব্যবস্থায় লেগে যেত (আসতাগফিরুল্লাহ)৷ অপরদিকে তারা আল্লাহর দিকে কন্যা সন্তানের সম্বোধন করত এবং ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে আখ্যায়িত করত (নাউযুবিল্লাহ)৷ (১৫-১৬)

এরপর ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আলোচনা এসেছে৷ যাঁর ব্যাপারে মুশরিকদের দাবি হলো, তারা নাকি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাত এবং শরীয়তের উপর আছে৷ তাদের এই মিথ্যাচারের জবাবে বলা হয়েছে, তারা মূর্তিপূজা করে শরীয়ত অনুসরণের মিথ্যা দাবি করছে৷ অথচ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাওহিদের ঝাণ্ডাবাহী ছিলেন আর তারা আপাদমস্তক মূর্তিপূজার অপবিত্রতায় ডুবন্ত ছিলো৷ এদিকে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বীয় সন্তানদের জন্য কালিমায়ে তাওহিদের শিক্ষা রেখে গেছেন৷

এই কালিমার দাওয়াতই যখন শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুরু করলেন, তখন মক্কার মুশরিকরা আল্লাহর রাসূলকে যাদুকর বলা শুরু করল৷ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে তাদের এই ভ্রান্ত চিন্তা ছিলো সম্পূর্ণ মূর্খতাপ্রসূত৷

তারা বলে: কুরআন কেন দুই জনপদের কোনো প্রধান ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হলো না? তারা আরো বলে: আল্লাহ কি নবী বানানোর জন্যে এই গরীব অসহায় লোকটিকেই পেলেন?

أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَتَ رَبِّكَ ۚ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۚ وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيًّا ۗ وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ

অর্থ: তারা কি আপনার পালনকর্তার রহমত বন্টন করে? আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বন্টন করেছি পার্থিব জীবনে এবং একের মর্যাদাকে অপরের উপর উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে সেবক রূপে গ্রহণ করে। তারা যা সঞ্চয় করে, আপনার পালনকর্তার রহমত তদপেক্ষা উত্তম। (৩২)

‘আমি তাদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করেছি’৷ উদ্দেশ্য এই যে, আমি আমার অপার প্রজ্ঞার সাহায্যে বিশ্বের জীবনব্যবস্থা এমন করেছি যে, এখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রয়োজনাদি মিটানোর ক্ষেত্রে অপরের সাহায্যের মুখাপেক্ষি এবং সকল মানুষ এই পারস্পরিক মুখাপেক্ষিতার সূত্র গ্রথিত হয়ে সমাজের সব প্রয়োজনাদি মিটিয়ে যাচ্ছে৷ আলোচ্য আয়াতটি খোলাখুলি ব্যক্ত করেছে যে, আল্লাহ তাআলা জীবিকা বণ্টনের কাজ সোশ্যালিজমের ন্যায় কোনো ক্ষমতাশালী মানবিক প্রতিষ্ঠানের হাতে সোপর্দ করেননি। যে পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থির করবে যে, সমাজের প্রয়োজনাদি কী কী, সেগুলো কিভাবে মিটানো হবে, উৎপাদিত সম্পদকে কি হারে কি কাজে লাগানো হবে এবং এগুলোর মধ্যে আয়ের বণ্টন কিসের ভিত্তিতে করা হবে? এর পরিবর্তে এ সমস্ত কাজ আল্লাহ তাআলা নিজের হাতে রেখে দিয়েছেন৷

জীবিকা ব্যবস্থাও আল্লাহ তাআলা নিজের হাতে রেখে প্রত্যেকের মনে সেই কাজের প্রেরণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যা তার জন্য অধিক উপযুক্ত এবং যাতে সে সুষ্ঠুভাবে সেই কাজ আঞ্জাম দিতে পারে৷ তাই তো প্রত্যেক ব্যক্তি এমনকি একজন সুইপারও (ঝাড়ুদার) নিজের কাজ নিয়ে আনন্দিত ও গর্বিত থাকে৷ তবে পূঁজিবাদি ব্যবস্থার ন্যায় ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তিকে বৈধ ও অবৈধ উপায়ে সম্পদ জমা করে অপরের জন্য রিযিকের দ্বার বন্ধ করে দেয়ার স্বাধীনতা দেয়নি৷

বরং আমদানির উপায়সমূহের মধ্যে হালাল ও হারামের পার্থক্য করে সুদ, ফটকাবাজি, জুয়া, মজুদদারি ইত্যাদিকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে৷ এরপর বৈধ আমদানিতেও যাকাত, ওশর ইত্যাদি কর আরোপ করে সেসব অনিষ্টের মূলোৎপাঠন করেছে, যা বর্তমান পূঁজিবাদি ব্যবস্থায় পাওয়া যায়৷ (মা’আরিফ থেকে সংক্ষেপিত)

সুরার শেষের দিকে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধৈর্যধারণ করার এবং মূর্খ ও নির্বোধদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং শীঘ্রই তারা কঠিন আযাবের পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারবে৷

সুরা দুখান

সুরা দুখান মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ ৫৩ টি আয়াত ও ৩ টা রুকু রয়েছে৷ দুখান অর্থ ধোঁয়া৷ মুশরিকদের উপর যখন দুর্ভিক্ষ চলছিল, তখন তাদের কঠিন কষ্টের কারণে যে ধোঁয়া প্রকাশিত হয়েছিল, এজন্য এ সুরার নামকরণ দুখান করা হয়েছে৷

সুরার ফযিলত: হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমুআর রাত্রিতে সুরা দুখান পাঠ করবে, সকাল হওয়ার আগেই তার গোনাহ মাফ হয়ে যাবে৷

প্রথমে এই কুরআন যে লাইলাতুল কাদরে নাযিল হয়েছে, তার আলোচনা৷

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ

অর্থ: আমি একে নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে৷ (৩)

  • বরকতময় রাত দ্বারা এখানে শবে-কদর বোঝানো হয়েছে, যা রামাযান মাসের শেষ দশকে হয়৷ এই রাতকে ‘মুবারক’ বলার কারণ হলো, এই রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত নাযিল হয়৷

এরপর বান্দাদের হেদায়াত থেকে বঞ্চিত না থাকার আলোচনা৷ মুশরিক এবং কাফিরদের কুরআন এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অস্বীকারের আলোচনা৷

ফেরাউনের অর্থ ও সমৃদ্ধির অভাব ছিলো না৷ মিসরের সকল সম্পদ বলতে গেলে তারই ছিলো৷ কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো কাজে এলো না৷ সবার সামনেই সাগরের মধ্যখানে ডুবে মরতে হলো৷ সে সময় ঈমানের ঘোষণায় কোনো কাজ হলো না৷ সুরার শেষের দিকে নাফরমানদের কঠিন ও ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার আলোচনা, এবং নেক বান্দাদের জন্যে সীমাহীন নিয়ামতরাজির আলোচনা৷

এরপর কাওমে তুব্বা’র আলোচনা৷ তুব্বা হলো, ইয়ামনের হিময়ারি সম্রাটদের উপাধিবিশেষ৷ তারা দীর্ঘকাল পর্যন্ত ইয়ামনের পশ্চিমাংশকে রাজধানী করে আরব, শাম, ইরাক ও আফ্রিকার কিছু অংশ শাসন করেছে৷

সুরা জাসিয়া

সুরা জাসিয়া মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ৩৭ টি আয়াত ও ৪ টি রুকু রয়েছে৷ জাসিয়া অর্থ পায়ের টাখনুর সাহায্যে বসা৷ যাকে এ শব্দে নতজানু হয়ে বসাও বলে৷ কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ অবস্থা হবে যে, মানুষ নতজানু হয়ে বসা থাকবে৷

এরপর এই সুরায় আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব, মহত্ব, কুদরত ও একত্বের দলিল দিলেন, যা সুস্পষ্টভাবে সমস্ত সৃষ্টির মাঝে বিদ্যমান৷ এরপর এই পাপিষ্ঠদের অপছন্দনীয় চেহারা সামনে নিয়ে আসা হলো, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ শোনা সত্ত্বেও অস্বীকার এবং অহংকার ছাড়ে নি৷ বরং এই অবস্থা ধারণ করে যেন তারা কিছুই শুনে নি৷

বনী ইসরাইলকে প্রদত্ত নিয়ামতের আলোচনা এসেছে৷ কিন্তু তারা এসব নিয়ামত পেয়ে নিয়ামত আদায় দূরের কথা, বরাবরের মতো নাফরমানি জারি রেখে দিয়েছিল৷ এরপর কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার আলোচনা এসেছে৷

আল্লাহ তাআলা রাসুল ﷺ কে উদ্দেশ্য করে বলেন: আপনি প্রত্যেক উম্মতকে দেখবেন নতজানু অবস্থায়৷ প্রত্যেক উম্মতকে তাদের আমলনামা দেখতে বলা হবে৷ তোমরা যা করতে, আজ তোমাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে৷ (২৮)

এরপর মহান রাব্বুল আলামীনের প্রশংসা, বড়ত্ব ও প্রজ্ঞার আলোচনার মাধ্যমে সুরা সমাপ্ত হয়েছে৷ (৩৬-৩৭)

[প্রতিদিন আসরের পর ইসলামী লেখক ও খতীব মুফতী জিয়াউর রহমান লিখিত ওই দিনের তারাবীহ’র আলোচনা প্রকাশ করা হয়। ধারাবাহিক এ লেখা নিয়মিত পড়তে পাবলিক ভয়েসের ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ ফলো করুন]

 আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

মন্তব্য করুন