ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩য়

প্রকাশিত: ১:০৪ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০২০

দেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে চালের উৎপাদন। দীর্ঘদিন ধরেই খাদ্যশস্যটি উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান ছিল চতুর্থ। চীন ও ভারতের পরই তৃতীয় স্থানটি ছিল ইন্দোনেশিয়ার। তবে এবার ইন্দোনেশিয়াকে সরিয়ে সেই অবস্থানে উঠে আসছে বাংলাদেশ।

বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য নিয়ে বুদবার (১৩ মে) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় হওয়ার এ পূর্বাভাস দিয়েছে ইউএসডিএ।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সারা বিশ্বে ৫০ কোটি ২০ লাখ টন ছাড়াতে পারে চালের উৎপাদন, যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি। চীন সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন করবে। দেশটি চলতি অর্থবছরে ১৪ কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদনের মাধ্যমে শীর্ষে অবস্থান করবে। চীনের পরই আছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। দেশটির চাল উৎপাদন দাঁড়াবে ১১ কোটি ৮০ লাখ টন। এর পরই ৩ কোটি ৬০ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসবে বাংলাদেশ। আর দীর্ঘদিন ধরেই তিন নম্বর স্থানটি দখলে রাখা ইন্দোনেশিয়া এবার চতুর্থ অবস্থানে নেমে আসবে। দেশটিতে চালের উৎপাদন হবে ৩ কোটি ৪৯ লাখ টন।

চলতি অর্থবছরে আমন মৌসুমে রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে। আবার গত আউশ মৌসুমেও চালের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ চলতি বোরো মৌসুমে সাড়ে চার লাখ টন বাড়তে পারে চালের উৎপাদন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তিন মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্মিলিত ফলাফলই বাংলাদেশ শীর্ষ তিনে চলে আসার মূল কারণ।

কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের কৃষকরাই এ অর্জনের প্রধান দাবিদার। এর সঙ্গে এ খাতে নিয়োজিত সম্প্রসারণকর্মী, বিজ্ঞানী, গবেষক ও বেসরকারি খাতের অবদান রয়েছে। তাদের সহায়তা করার জন্য আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা শুধু প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উপকরণ, আর্থিক ও নীতিসহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সরকারপ্রধান কৃষি ও কৃষকদের জন্য অন্তঃপ্রাণ। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের চাল উৎপাদনে বৈশ্বিক এ সফলতা এসেছে।

তিনি বলেন, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও চাল উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে দেশে। ঘাতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করে তা আবাদে লবণাক্ত, খরা ও হাওড় অঞ্চলের কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে এসব এলাকায় এখন একটির পরিবর্তে দুটি ধানের আবাদ হচ্ছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি ধান করা যায় কিনা, সেটি নিয়েও ভাবছি আমরা। এবার হাওড়ের ধান কাটায় সফলতার জন্য যান্ত্রিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকের জন্য আর্থিক প্রণোদনা থেকে শুরু করে বিপণন, সরবরাহ ও উপকরণের সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করছি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের খাদ্যশস্যের চাহিদা নিজেদের উৎপাদনের মাধ্যমেই পূরণ করতে হবে।

দেশের উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশের বেশি আসে বোরো ধান থেকে। বাকিটা আসে আউশ ও আমন থেকে। দেশের জমিগুলোতে বছরে একই জমিতে তিনবার ধান উৎপাদন করা হয়। বিস্তীর্ণ হাওড় এলাকা ধান আবাদের আওতায় আনা হচ্ছে। এ অঞ্চলের উপযোগী ধানের জাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। চলতি মৌসুমে হাওড় এলাকায় ধানের বাম্পার ফলনের মাধ্যমে দেশের চালের উৎপাদনে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, চলতি অর্থবছরের আমন মৌসুমে রেকর্ড উৎপাদন পেয়েছি। আবার চলতি বোরো মৌসুমে এখন পর্যন্ত আবহাওয়া স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে। হাওড়ের শতভাগ ধান কাটা প্রায় সম্পন্ন। একটা মাস ভালো আবহাওয়া পাওয়া গেলে বোরোতে রেকর্ড উৎপাদন হবে। আবার আগামী মৌসুমের জন্য আউশের ব্যাপক প্রণোদনা কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। ফলে সেখানেও উৎপাদন কয়েক লাখ টন বৃদ্ধি করতে সক্ষম হব। ফলে চাল নিয়ে ইউএসডিএ যদি এ ধরনের প্রক্ষেপণ দিয়ে থাকে তবে সেটা যথার্থই হয়েছে। যদিও এখনও আমরা প্রতিবেদনটি হাতে পাইনি।

ইউএসডিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার চাল উৎপাদনের শীর্ষ ১২টি দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পরই থাকছে ভিয়েতনাম। দেশটিতে এবার উৎপাদন দাঁড়াবে ২ কোটি ৭৫ লাখ টন। এছাড়া থাইল্যান্ডে ২ কোটি ৪ লাখ টন, মিয়ানমারে ১ কোটি ৩১ লাখ টন, ফিলিপাইনে ১ কোটি ১০ লাখ টন, জাপানে ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টন, পাকিস্তানে ৭৫ লাখ টন, ব্রাজিলে ৬৯ লাখ ও কম্বোডিয়ার প্রায় ৫৮ লাখ টন চাল উৎপাদন হবে। ইন্দোনেশিয়া চলতি বছর খারাপ পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি। তবে সামনের বছরে দেশটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তখন বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় স্থান ধরে রাখাটা চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক এ প্রসঙ্গে বলেন, কয়েক বছর ধরেই দেশে চালের উৎপাদনে একটি ধারাবাহিকতা আছে। সেটার কারণেই বাংলাদেশের উল্লম্ফনটা এসেছে। তবে সেটি ধরে রাখতে হবে। অর্জনটা ধরে রাখতে হলে কৃষি খাতে গবেষণা যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত মানের বীজ সরবরাহ বাড়াতে হবে, কৃষকের ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে। শুধু জাত উদ্ভাবনেই সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। সেগুলোকে কৃষকের কাছে জনপ্রিয় করতে হবে। ধানের স্টোরেজ ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। বিপণন ব্যবস্থায় মিলারদের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কৃষক ও সরকারকে আরো শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে। উৎপাদনে কৃষকের খরচ কমিয়ে আনা এবং বিপণন ব্যবস্থায় আরো পদক্ষেপ নিলেই ধরে রাখা যাবে এ অবস্থান।

চাল উৎপাদনে শীর্ষ ১২ দেশ

দেশ উৎপাদন

চীন ১৪৯

ভারত ১১৮

বাংলাদেশ ৩৬.০

ইন্দোনেশিয়া ৩৪.৯

ভিয়েতনাম ২৭.৫

থাইল্যান্ড ২০.৪

মিয়ানমার ১৩.১

ফিলিপাইন ১১.০

জাপান ৭.৬৫

পাকিস্তান ৭.৫০

ব্রাজিল ৬.৮৭

কম্বোডিয়া ৫.৭০

(উৎপাদন=মিলিয়িন টন) সূত্র: ইউএসডিএ

এমএম/পাবলিকভয়েস

মন্তব্য করুন