‘মানবতার ধর্মে জ্ঞানের পরিধি কখনোই স্রষ্টাকে অতিক্রম যোগ্য নয়’

প্রকাশিত: ৪:১৬ অপরাহ্ণ, মে ৯, ২০২০
মতামত : নজরুল ইসলাম তোফা

সৃষ্টিকর্তার সুপরিকল্পিত এমন সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের জীবন যাপনের দিক নির্দেশনা ও সাম্য-মৈত্রীর বাণী নিয়েই যেন যুগেযুগে বিভিন্ন ধর্মের আগমন ঘটেছে।

ইতিহাস বলে, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতবর্ষ হচ্ছে ধর্মের আদি ভূমি। তা সত্ত্বেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্মের নামে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অসচেতন মানুষরা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছে। আবার, ধর্মই মানুষকে করেছে সুসংহত, মানবতাবাদী। আবার ভালোবাসার বন্ধনেই যেন সকল ধর্মীয় মানুষরা সামাজিক পরিমণ্ডলে বসবাস করছে।

আসলে সকল ধর্ম বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে। যদি বলা হয় যে বিজ্ঞানটা যুক্তিবিজ্ঞানের উপরে নির্ভর করে, যে কারণে দুটি প্রায়ই সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তাই বিজ্ঞান ও ধর্ম নিয়ে প্রায়ই অনেকে তর্কের জায়গাতেই পৌঁছে যায়।

বিজ্ঞান এবং ধর্ম এদুটি একই সঙ্গে সাবলীল গতিতে চলে তা বলা যেতেই পারে। কিন্তু কিছু গোঁড়া বিজ্ঞানীরা কিংবা বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ বিজ্ঞানের অপব্যবহার করছে। তারা বিজ্ঞান দ্বারা ভুল বা ভ্রান্ত যুক্তির মাধ্যমে ধর্মের মিথ্যা প্রমাণটাও যেন করতে চায়। এদের ভ্রান্ত যুক্তি না বুঝে অনেকেই খারাপ দিকেও চলে যাচ্ছে, অস্বীকার করছে সৃষ্টি কর্তাকে এবং ধর্মকে।

মনে রাখতে হবে সৃষ্টিকর্তা সবার, ধর্ম যার যার। ‘সৃষ্টিকর্তা’ একজনই। কেউ তাকে আল্লাহ, কেউ ভগবান কেউবা ঈশ্বর বলে। যেকোনো ধর্মে কট্টরভাবে ধর্ম পালনের কথা বলা হয়নি। বরং সুষ্ঠু ভাবেই যেন ধর্মকে পালনের পাশাপাশি অন্যান্য সকল ধর্মের মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার শিক্ষা দিয়ে থাকে।

  • মানব জীবনে এ ধর্মটা হচ্ছে একটি ‘জীবন ব্যবস্থা বা শৃঙ্খলা’। অথচ এই সুন্দর ধর্মকে কিছু মানুষ- ভুল প্রমাণিত করতে চায়। আসলে কোনো কিছুই আপনা-আপনি উদ্দেশ্যহীনভাবেই সৃষ্টি হয় না। মানুষের জ্ঞানের পরিধি কখনই অতিক্রম যোগ্য নয় তা মানতেই হবে।

এই পৃথিবীতে ধর্ম এবং অধর্ম বলে দুটি কথা আছে। ধর্ম মানুষকে সঠিক পথে আর অধর্ম মানুষকে বিপথেই পরিচালিত করে।

  • মানুষ সৎ কাজ কিংবা পুণ্য কাজ যতো গোপনে বা প্রকাশ্যে করুক না কেন, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তা জনসাধারণের কাছে গোচরীভূত হয়।

তদ্রূপ- পাপকর্ম বা মিথ্যা তথ্য অতি গোপনীয়ভাবে করা হলেও তা আপনা-আপনি লোকসমাজে জানা-জানি হয়ে যায়। কথায় বলে, সত্য কোন দিন গোপন থাকে না। ধর্ম মেনে চললে কিংবা স্বার্থত্যাগ করে পরার্থে নিজেকেই ব্যাপৃত রাখলে সুফল হয়। কিন্তু স্বার্থপরেরা ধর্মটাকে চাপা দিয়ে বিজ্ঞানের যুক্তি-তর্ক দাঁড় করিয়েই স্বার্থান্বেষী হয়ে বিপথে পরিচালিত হয়।

কিন্তু এই ‘বিজ্ঞান চেতনার’ স্বার্থপর মানুষরা সত্যকে চাপা দিয়ে কোনো অসত্যকেই কখনো প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না। কপটচারীর মুখোশ একদিন খসে পড়বেই। সৃষ্টিকর্তার এ বিশ্বাস নিয়েই যেন সকল ধর্মাবলম্বীদের অবস্থান। কারণ যা খুব সত্য তাকে কোনো আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না।

যা ন্যায় এবং সত্য তা অন্যায় এবং অসত্যের মতো কোনো কিছু দিয়ে দূরে ঠেলে দিতে চাইলেও দিবালোকের মতোই উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। এক একটা সত্যকে চাপা দিতে হলে অনেক মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। তাই ‘সত্যের জয়’ অবশ্যম্ভাবী, তা মিথ্যার জাল ছিন্ন করেই প্রকাশ পায়।

জ্ঞানী মানুষ সহনশীলতা এবং ধৈর্য ধারণের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। কি অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিতরা তা পারে না। এখানে এমন কথা বলছি একারণেই যে, ধর্মের প্রতি কোনো আঘাত বা কটূক্তি সৃষ্টি হলেই তাদের ‘রক্ত গরম’ হয়ে উঠে। এটা একেবারেই ধর্মের আদর্শ নয়, সেটা যেই ধর্মাবলম্বীর মানুষ হোক না কেন।

আসলে বলতে হয় যে অন্ধ বিশ্বাসেই যে কোনো ধর্মকে আঁচড়ে ধরা ঠিক নয়। ধর্মটা হচ্ছে জ্ঞান অন্বেষণের জন্যে বৃহৎ প্লাটফর্ম। মহান স্রষ্টা বিশ্ব জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশংসিত জ্ঞানী, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাই তিনার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে জ্ঞানঅর্জনের চেষ্টা করতে হবে। যা কিছু ঠিক নয় তা কখনো করাটাও উচিত নয়।

সঠিক পথ ও দয়া সৎকর্মপরায়ণদের জন্যে সৃষ্টি কর্তা রেখেছেন। যারা মহান স্রষ্টাকে জ্ঞান ও সঠিক চেতনা দিয়ে স্মরণ করে বা পবিত্রতা বৃদ্ধি করেই দানের মাধ্যমে এগিয়ে আসে বা পুনরুত্থান সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে তারাই তো আসল ‘ধর্মপরায়ন’।

এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা কিনা মানুষকে মহান সৃষ্টিকর্তার সঠিক পথ থেকে ভূল পথে চলার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তাগুলি সংগ্রহ করে অন্ধভাবে সৃষ্টি কর্তাকে নিয়েই ঠাট্টা বিদ্রূপ করে। এদের জন্যেই রয়েছে ‘অবমাননাকর শাস্তি’। তিনি তো তাদের ‘বিচার’ করবেন।

তিনি বলেছেন, ‘যখন তাদের সামনে মহান স্রষ্টার কথাগুলো আবৃতি করা হয় ঠিক তখন ওরা দম্ভের সাথে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়- যেন ওরা তা শুনতেই পায়নি অথবা যেন ওদের দু’কান বধির, শোনে না সৃষ্টিকর্তার সঠিক কথা। সুতরাং, ওদেরকে কষ্টদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও’।

এখানে- শান্তি দেওয়ার কথাটা বলা হয়নি। আমরা রক্ত গরম মানুষ, অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী ভুল পথের মানুষ। একটু অসংগতি খবর পেলে তেলেবেগুনেই যেন গর্জে উঠি। সৃষ্টিকর্তার সঠিক দিক নির্দেশনা মানতে চাই না। আসলে বলতেই হয় যে অতৃপ্তি মানব চরিত্রেরই একটি স্বভাবধর্ম। অধিকাংশ মানুষই স্বীয় অবস্থায় সুখী ও সন্তুষ্ট নয়। অসংগতি দেখলেই অশিক্ষিত কিংবা অল্প শিক্ষিত মানুষের রাগ। এমন রাগ দেখানো ঠিক নয়।

সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ বলেন, বরং জুলুমকারীগণ সুস্পষ্ট ভূল পথেই পতিত হচ্ছে এবং তারা জ্ঞান শূন্য হিসেবেই বিবেচ্য। সুমহান স্রষ্টা মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন, তার যথাযথ প্রয়োগ ও পরিচর্যা করেই ধর্মকে চিনতে হবে।

এ মর্মে বলা যায় যে, তারা মহান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং সহনশীল হতেই হবে। যে কৃতজ্ঞ হয়, সেতো কেবল নিজ কল্যানের জন্য কৃতজ্ঞ হয়- আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, সেই মানুষেরাই মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট হতভাগ্য, অধম। জ্ঞানী লোকই তাদের মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে ‘সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত’ বা এরাই সফলকাম।

সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেই যেন প্রতিটি ধর্মে বা বিশেষ করে পবিত্র কোরআনে নিষেধ আছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ধর্মের ব্যাপারে জোরজবরদস্তি নেই। ভ্রান্ত মত ও পথকে সঠিক মত ও পথ থেকে ছাঁটাই করে পরিশুদ্ধভাবেই তা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।

সুতরাং ‘তোমাদের ধর্মটা তোমাদের জন্যে, আমাদের ধর্ম আমাদের জন্যে’র মর্মবাণী- একে অন্যের ধর্ম পালন করতে গিয়ে কেউ কোনোরূপে সীমা লঙ্ঘন কিংবা বাড়াবাড়ি করবে না। অন্য কেউ যদি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেও ফেলে তবে ভুলেও যেন কোনো মানুষ এই ধরনের হীণ ও জঘন্য কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত না করে।

এই বিষয়টিই নসিহত স্বরূপ মুমিনদের উদ্দেশে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব অন্য ধর্মাবলম্বীর মানুষ জন দেব-দেবীর পূজা-উপাসনা করে, তোমরা তাদের একটি গালিও দিও না। যাতে করে তারাই শিরক থেকে- আরো অগ্রসর হয়ে অজ্ঞতাবশত যেন আল্লাহ তায়ালাকে গালি দিয়ে না বসে।’

সুতরাং, যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকেই গালি দেওয়া নিষিদ্ধ, সেইখানে মন্দির ভাঙচুর ও মানুষ হত্যা কীভাবে বৈধ হতে পারে? একজন প্রকৃত মানুষকে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য চেষ্টা করা দরকার। কখনোই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে সামান্য আঘাত আসে- এমন ধরনের একটি কাজও করা যাবে না।

হজরত রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুন্ন করে বা তাদের ওপরে জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব’।

আল্লাহ তায়ালার নবী আরো বলেছেন, ‘অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম কিংবা বিধর্মীদের হত্যাকারীরা জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ, ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকে ওই ঘ্রাণ পাওয়া যাবে।’

অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে আল্লাহতায়ালা সেই মানুষদের জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’

রাসূলুল্লাহ সা. এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের চিরাচরিত এক চমৎকার নিয়ম ছিল, যখন কোনো সেনাবাহিনী প্রেরণ করার প্রয়োজন হতো, তখন যুদ্ধ সম্পর্কিত বিভিন্ন নসিহতের পাশাপাশি দিকনির্দেশনার সাথে এই কথা অবশ্যই বলে দিতেন যে, ‘যুদ্ধকালীন সময়ে কিংবা যুদ্ধের পরেও কোনো মন্দির, গীর্জা, উপাসনালয় ভেঙে ফেলবে না’।

সুতরাং বলতে চাই, এ জগৎ সংসারে প্রজ্ঞাময় মানুষের অভাব রয়েছে। ধর্ম মিথ্যাচার নয়, ধর্ম গুজব সৃষ্টিকারী কোনো বিধান নয়, ধর্ম প্রতারিত করা বা গুম, খুন, ধর্ষণ করার মতোও সাংবিধানিক নিয়ম নয়।

হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো এবং ভয় করো এমন এক দিবসকে, সেই সময় যখন নাকি পিতা পুত্রের কোন কাজেই আসবে না এবং পুত্রও তার পিতার কোনো উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতিজ্ঞা সত্য।

সুতরাং ‘পার্থিব জীবন’ যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয় এবং মহান স্রষ্টা সম্পর্কে প্রতারক ও মন্দ মানুষেরাই যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে। নিশ্চয় মহান স্রষ্টার কাছেই পুনরুত্থান দিবসের জ্ঞান আছে তা অর্জন করো- তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। কেউ তা জানে না আগামীকল্য সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন দেশে সে মৃত্যুবরণ করবে।

  • মহান স্রষ্টা সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে তিনি সম্যক জ্ঞাত। তিনিই জ্ঞানী, তাঁর বিধানের জ্ঞান অর্জনে ব্রত হও। বিজ্ঞানটাও তাঁরই সৃষ্টি, বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে, এ দু’টিকে সাবলীল গতিতে চলতে দেওয়া উচিত।

মানুষের জ্ঞানের পরিধি কখনোই সৃষ্টিকর্তাকে অতিক্রম কতে পারবে না। তাই শুধুই বিভেদ সৃষ্টি নয়, জ্ঞান অর্জন করেই আমাদের ধর্ম কিংবা বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন।

লেখক: নজরুল ইসলাম তোফা
টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক রাজশাহী আর্ট কলেজ

মন্তব্য করুন