এবি পার্টির অভ্যুদয় : অভিনন্দন ও পর্যালোচনা

প্রকাশিত: ৫:২০ অপরাহ্ণ, মে ৩, ২০২০

এবিপির মুল কারিগর মুজিবুর রহমান মঞ্জু ভাই পরীক্ষিত সংগঠক। কিন্তু যাকে বলে জননেতা তা তিনি নন। সভাপতি জনাব সোলায়মান সাহেব একজন জাঁদরেল আমলা কিন্তু গণসংগঠন পরিচালনায় তার মাঠের অভিজ্ঞতা নাই। এভাবে এবিপির নেতৃত্বের সবাই প্রায় সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি, স্বীকৃত মেধাবী ও সফল মানুষ হলেও “জননেতা” ধরনের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এবিপির এই নেতৃত্বের পক্ষে জোড়ালো কোন রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।

– শেখ ফজলুল করীম মারুফ

“সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার” নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে একটি “কল্যাণ রাষ্ট্রে উন্নীত” করার উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা নতুন এই দলকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

এবি পার্টির আপ্তবাক্যগুলোর কোনটাই নতুন না। গণসংহতি আন্দোলনও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচারকে মুলনীতি ধরে রাজনীতি করে।

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনও ২০১৭ সাল থেকে “সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামই একমাত্র সমাধান শ্লোগান দিয়ে সেই আলোকে বক্তব্য-বিবৃতি নির্মান করে আসছে। ছাত্র আন্দোলনের ২০১৮ সালের ক্যালেন্ডারেই “সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় নীতির পরিবর্তন চাই” বিষয়কে প্রতিপাদ্য হিসেবে সামনে আনা হয়েছিলো।

কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাংলাদেশের সবগুলো ইসলামপন্থী সংগঠনের ব্যবহৃত কৌশলগত শব্দ। যদিও কল্যাণ রাষ্ট্রের (Welfare State)  ধারনা ইসলামপন্থীদের আগেই ১৯৩০ এর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দার সময় জন কেইন গোত্রিয় অর্থনীতিবিদদের দেয়া একটি ধারনা। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশই কল্যাণ রাষ্ট্রের শর্তগুলো পূরণ করে।

তারপরেও ইসলামপন্থীরা ইসলামী রাষ্ট্র বা খেলাফতের বিপরিতে অথবা যথাপোযুক্ত পরিভাষার অভাবে এই শব্দটা ব্যবহার করে। আদতে ইসলামের যে রাজনৈতিক বয়ান তা কেবলই কল্যাণ রাষ্ট্র পরিভাষায় ব্যক্ত হয় না। তারপরেও এই শব্দটা বহুল ব্যবহৃত।

শ্লোগান, প্রতিপাদ্য ও মুলনীতি বিবেচনায় এবি পার্টির অভ্যুদয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোন মাত্রা যোগ না করলেও শুভ চিন্তা নিয়ে নতুন একটি প্রচেষ্টা যোগ করেছে। সমস্যাগ্রস্ত বাংলাদেশে এই নতুন প্রচেষ্টা অবশ্যই সাধুবাদ যোগ্য।

এবি পার্টি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংস্কৃত অংশ। তবে এর তাৎপর্যপূর্ণ আদর্শগত মাত্রা আছে। প্রথম মাত্রা ৭১ প্রশ্নে। জামায়াত ৭১ এ তাদের ভূমিকাকে যথার্থ মনে করে বলে দৃশ্যত মনে হয়। সেখানে এবি পার্টি ৭১ এ জামায়াতের ভূমিকা থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা করে। ৭১কে ধারন করার এই সিদ্ধান্ত সত্যিই ভালো সিদ্ধান্ত। তবে কথায়, বক্তব্যে, ব্যানারে, বিবৃতিতে সর্বত্র যেভাবে ৭১কে সামনে আনা হচ্ছে তাতে অতিভক্তি প্রকাশ পাচ্ছে। এবং একটু প্রকট হয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় মাত্রা ইসলাম প্রশ্নে। রাজনৈতিক ইসলামপন্থায় তুরস্কে এরদোয়ানের নেতৃত্বে একেপি একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নামে, ব্যানারে, ঘোষণায় ইসলাম, ইসলামী নির্দশন ও পরিভাষা উহ্য রেখে নীতিগতভাবে ইসলাম অনুসরন করার এই কৌশল তুরস্কে খুব ভালো কাজ দিয়েছে। যেকোন সফল কৌশলের মতোই একেপির এই কৌশলটাও বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থীদের নজর কেড়েছে এবং অনেকেই তা অনুসরন করা শুরু করেছে।

জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক ইসলামপন্থার উদারতম দল হলেও তার নামে, ব্যানারে ইসলাম, ইসলামী নিদর্শন ও পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। এবিপি জামায়াতের এই প্রকাশ্য ইসলামপন্থা থেকে সরে এসে সেক্যুলার বেশে ইসলামপন্থার নীতি নিয়েছে। এটা একটা পরীক্ষণ (Experiment)। এটা কতটা কাজ করবে তা সময় বলে দেবে। তবে সমাজবিজ্ঞানে একটা চিরসত্য আপ্তবাক্য আছে। তাহলো, সমাজবিজ্ঞানের কোন তত্ত্ব সার্বজনীন হয় না। সব তত্ত্বেই স্থানিক বাস্তবতা প্রধান। বাংলাদেশ আর তুরস্কের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানুষের মনস্তত্ত্ব এক না। তুরস্কে প্রায় পৌনে এক শতাব্দি ইসলাম, শিয়ারে ইসলাম, ইসলামী রাজনীতি, ইসলামী পরিচয়কে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বানিয়ে ফেলা হয়েছিলো। এখনও সেখানে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ। আর বাংলাদেশে কট্টর নাস্তিকও সমাজের চাপে ইসলামী আচার অনুসরনে বাধ্য হয়। পোড় খাওয়া কমরেডও রাজনৈতিক চাপে হজ্জ্ব করতে মক্কা যায়। সেজন্য বাংলাদেশে সেক্যুলার বেশে ইসলামপন্থা জনগণের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে তা দেখবার বিষয়। এখানে বরং এই পন্থা শঠতা বলে চিহ্নিত হতে পারে।

এবিপির মুল কারিগর মুজিবুর রহমান মঞ্জু ভাই পরীক্ষিত সংগঠক। কিন্তু যাকে বলে জননেতা তা তিনি নন। সভাপতি জনাব সোলায়মান সাহেব একজন জাঁদরেল আমলা কিন্তু গণসংগঠন পরিচালনায় তার মাঠের অভিজ্ঞতা নাই। এভাবে এবিপির নেতৃত্বের সবাই প্রায় সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি, স্বীকৃত মেধাবী ও সফল মানুষ হলেও “জননেতা” ধরনের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এবিপির এই নেতৃত্বের পক্ষে জোড়ালো কোন রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।

ড. কামাল, মাহমুদুর রহমান মান্না, বি চৌধুরীসহ আরো বহুজনের নাম করা যাবে যারা তাদের দলে মেধাবী, সফল পেশাজীবি এমনকি পূর্বতন দলের বদৌলতে হওয়া এমপি মন্ত্রীদের সমাবেশ ঘটিয়েও রাজনৈতিক ময়দানে শক্তি হয়ে উঠতে পারেননি। এবিপির সামনে ইতিহাসের এই ধারা ভাঙ্গার চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

আগেই উল্লেখ করেছি যে, এবিপি নীতিতে কোন নতুনত্ব আনেনি। পুরোনো নীতির চমৎকার উপস্থাপনা নতুন আলোড়ন তোলে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর উদাহরণ অনেক। বিকল্পধারা, গণসংহতি আন্দোলন, গণফোরাম বা নাগরিক ঐক্যের নীতি বিররণ মুগ্ধ হওয়ার মতো। কিন্তু তাতে কোন নতুনত্ব নাই। সব নান্দনিক চর্বিত চর্বন। “ভক্ষিত তৃণ” (সুরা ফিল), এর সেইসব শৈল্পিক উপস্থাপনা মিডিয়া আলোড়ন তুললেও জনমনে আলোড়ন তুলতে পারেনি। এক্ষেত্রে এবিপি কতটা সফল হবে তা সময় বলে দেবে।

বাংলাদেশের সমাজ অতিমাত্রায় Based on the Cult of Personality. ব্যক্তিত্বের প্রতি প্রবল ভক্তিই এখানকার সামাজিক ঐক্যের ভিত্তি। আধুনিক পশ্চিমের Christianity based Enlightenment এ প্রভাবিত কারো কাছে এটা পছন্দ না হতে পারে কিন্তু ভারত-উপমহাদেশই শুধু নয় গোটা প্রাচ্য সমাজেই এটা কমবেশি সত্য। রিচার্ড ইটনের মতে আজকের বাংলাদেশ আবাদই হয়েছে ব্যক্তিত্ব নির্ভর প্রচেষ্টার মাধ্যমে। এদেশের গ্রামে গ্রামে মাজার তারই প্রমাণ বহন করে। আর এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যক্তিত্ব নির্ভরতার কথা বলা রীতিমত বাহুল্য।

এবিপির এমন কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নাই যাকে কেন্দ্র করে শতবিভক্তি নিয়েই দলে ঐক্য বজায় থাকবে। একই সাথে এবিপি “ক্যাডার সিস্টেম” এর স্পষ্ট বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ক্যাডার সিস্টেমের ওপরে ভর করেই জামায়াত ব্যক্তিত্ব নির্ভরতা কাটাতে পেরেছিলো। এবিপি এটাও যদি অনুসরন না করে তারপরেও এবিপির ঐক্য কতদিন বজায় থাকে তা দেখার বিষয়।

এবিপির ঘোষিত নীতিগুলো Depended Principle. মানে অন্য মৌলিক নীতির ভিত্তিতে এগুলোর ধরন বদলে যাবে। যেমন ধরেন, “সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার” এই আপ্তবাক্যকে যদি ইসলামের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে তার ধরন একরকম হবে আর সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করলে তার ধরন আরেক রকম হবে। সেজন্যই গণসংহতি আন্দোলন আর ইশা ছাত্র আন্দোলনের বলা “সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার” এর অর্থ এক না। এবিপি এই Depended Principle গুলোকে কোন মৌলিক নীতির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করবেন তা সুস্পষ্ট নয়। এটা যেমন তাদের কৌশলগত সুবিধা দেবে তেমনি এটা তাদের প্রতি মানুষকে দ্বিধাগ্রস্তও করতে পারে।

এবিপিকে নিয়ে একাধিক ষড়যন্ত্র তত্ত্বও চাউর আছে। তাহলো, বিদ্যমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রকাশ্য রাজনীতি করার একটা প্রকল্প হিসেবে ও তুরস্কের একেপি মডেল বাংলাদেশে কার্যকর কিনা তা পরীক্ষা করার প্রকল্প হিসেবে এবিপি তৈরি করা হয়েছে বলে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বাজারে চালু আছে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আরেকটি ধারা হলো, সরকার বহু চেষ্টা করেও জামায়াতে ইসলামীকে ও তার কর্মী বাহিনীকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। জামায়াত এখনও একটি রাজনৈতিক শক্তি। শক্তি প্রয়োগ করে যাকে শেষ করা যাবে না। সেজন্য সরকার জামায়াতের বিকল্প হিসেবে জামায়াতমনা ও ইসলামমনাদের জন্য এবিপিকে তৈরি করেছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি হতে বেশি কারণ লাগে না। এখানেও এইসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পেছনে বেশি শক্ত কারণ নাই। তারপরেও তত্ত্বগুলো চালু আছে।

এতোসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবিপিকে পথচলতে হবে। এবিপি যদি সফলতা পায় তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি সত্যিই একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে। বাংলাদেশের রাজনীতির বহু চরিত্র বদলে যাবে এবং বহু পূর্বাভাস ভুল প্রমানিত হবে।

আমি চাই এবিপি সফল হোক। বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি হোক।

লেখক : রাজনীতি বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক, কলামিস্ট।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ : 

‘জামায়াত’ভাঙ্গা নতুন দল এবি পার্টির আত্মপ্রকাশ

জামায়াতে ইসলামীর সংস্কারবাদী নতুন দল ‘এ বি পার্টি

#এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন