প্রাইভেট শিক্ষাবোর্ডের নামে সরকারের কাছে অনুদান চাওয়া নীতিবিরোধী

প্রকাশিত: ১১:২০ অপরাহ্ণ, মে ২, ২০২০

বিশেষ প্রতিবেদক, পাবলিক ভয়েস: মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপে সঙ্কটে আছেন দেশের প্রতিটি সেক্টরের মানুষ। কওমী মাদরাসা সংশ্লিষ্টরাও ব্যতিক্রম নন। কওমী মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের প্রান্তিক অবস্থার কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নিজস্ব তহবিল থেকে ৬৯৫৯টি মাদরাসার জন্য ৮ কোটি ৩১ লাখ ২৫ হাজার টাকার অনুদান দিয়েছেন। এই অনুদান গ্রহণ করা না করা নিয়ে দেখা দিয়েছে কওমী মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের মতভিন্নতা।

এরই মধ্যে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনায় আসা মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদরসার পরিচালক হাফেজ নেছার আহমাদ নাছিরী পরিচালিত ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রাইভেট মাদরাসা স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রাইভেট মাদরাসার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন।

নেছার আহমাদ আন নাছিরী নিজেকে চেয়াম্যান দাবি করে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ নাম দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারক প্রদানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণ। প্রাইভেট মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের প্রতিনিধিত্বকারী একাধিক সংগঠন ইতোমধ্যে এ নিয়ে প্রতিবাদ বিবৃতিও দিয়েছেন।

‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা ঐক্যপরিষদ’ এই ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে বিৃবতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা বলেছেন, নেছার আহমাদ পরিচালিত ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’র কর্মকাণ্ডের সাঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা এসব কাজ সমর্থনও করে না।

একই সাথে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা ঐক্যপরিষদ’ কোনো নিজস্ব তৈরির শিক্ষাবোর্ড সমর্থন করে না জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ নামে মুষ্টিমেয় কিছু লোক প্রাইভেট মাদরাসা সমূহের সুযোগ সুবিধার দাবি নিয়ে প্রেসক্লাবে মানবন্ধন এবং প্রধানমন্ত্রী বরাবর যে স্মারকলিপি প্রদান করেছে, সে সম্পর্কে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ওলামায়ে কেরাম এবং হুফফাজে কেরামগণ অবগত নন।

এ বিষেয় পাবলিক ভয়েসেন পক্ষ থেকে কথা বলা হয় “প্রাইভেট মাদরাসা ঐক্যপরিষদ”র সংগঠনের চেয়ারম্যান প্রখ্যাত ক্বারী শায়খ নাজমুল হাসান-এর সঙ্গে। তিনি পাবলিক ভয়েসকে জানান, বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা ঐক্যপরিষদের সাথে সম্পৃক্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ’ এর অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকে। সেখানে আলাদা শিক্ষাবোর্ডের কোন যুক্তি থাকতে পারে না।

তিনি বলেন, আমাদের পরিচালিত ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা ঐক্যপরিষদ’ এটা কোনো বোর্ড নয়। প্রাইভেট মাদরাসাসমূহের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কাজ করে এই সংগঠন। আমরা এই সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসাসমূহের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে কল্যাণমূলক কাজ করে থাকি। বাংলাদেশে প্রাইভেট মাদরাসাসমূহের জন্য কোনো স্বীকৃত আলাদা বোর্ড নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘প্রাইভেট মাদরাসা অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ’ নামেরও একটি সংগঠন। এই সংগঠনের চেয়ারম্যান মুফতী নেয়ামতুল্লাহ আমিন পাবলিক ভয়েসকে জানান, ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ এর সঙ্গে ‘প্রাইভেট মাদরাসা অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ’র কোনো সম্পর্ক নাই এবং তারা এই শিক্ষাবোর্ডের কোন কাজ সমর্থনও করেন না।

একই সাথে নেছার আহমাদ নাছিরীর নেতৃত্বাধীন ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ এর দাবির সাথে একমত পোষণ না করার পেছনে কয়েকটি যুক্তিও তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন- প্রাইভেট মাদরাসার মাঝে দাওরা হাদীস ও ফতোয়া বিভাগ সম্পন্ন মাদরাসাও আছে। দেশে হাজার হাজার প্রাইভেট কওমী মাদরাসা আছে, তার নেতৃত্ব তিনি একজন হাফেজ হয়ে কীভাবে দেবেন? প্রাইভেট মাদরাসাগুলোও বেফাক বোর্ডের আওতাধীন। সেখানে হঠাৎ করে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ নামে আলাদা বোর্ড নাম দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান গজিয়ে যাওয়াটা উদ্দেশ্যমূলকই মনে হয়।

সরকারি অনুদান গ্রহণ এবং বাস ভাড়া মওকুফের দাবির সাথে দ্বিমত পোষণ করে তিনি যুক্তি ‍তুলে ধরে বলেন, আমাদের মাদরাসাগুলো মূলত ভাড়া বাসায় চলে। মাদরাসাগুলো বিশেষ কোনো আয়ের উৎস নাই। প্রাইভেট মাদরাসাগুলোতেও শিক্ষার্থীদের প্রদেয় বেতনের পাশাপাশি জনগণের অনুদানে চলে।

এক্ষেত্রে সরকারের নামমাত্র অনুদান গ্রহণ করলে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নেবে। এছাড়াও বাড়ি ভাড়া মওকুফের দাবি ‍তুলে কথিত আন্দোলনে নামলে পরবর্তীতে বাড়িওয়ালারা আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হবেন। মাদরাসাগুলো আবাসন সঙ্কটে পড়বে। এতে করে প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা বিরাট হুমকির মুখে পড়তে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন মুফতী নেয়ামাতুল্লাহ।

এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রাইভেট মাদরাসা থেকেও পাবলিক ভয়েসের কাছে প্রতিবাদ এসেছে। তাদের বক্তব্য, এমন একটি শিক্ষাবোর্ড কিভাবে হুট করে গজিয়ে উঠতে পারে? তাও একজন ব্যাক্তির মাধ্যমে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একটি কওমী মাদরাসার সিনিয়র এক আলেম পাবলিক ভয়েসকে বলেন- স্মারকলিপি প্রদানের নামে কথিত এই বোর্ড এবং বোর্ডের দায়িত্বশীলরা কওমী মাদরাসা ও আলেমদের ছোট করেছে। তাদের দাবি থাকলে বেফাক বোর্ডে গিয়ে দাবি করতে পারতো। সবাইকে উপেক্ষা করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার মাঝে নিশ্চয়ই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে তাদের।

তিনি কেন এটা করেছেন এবং কারা তাকে শেল্টার দিয়েছে সেগুলোও তদন্তের দাবি জানান অনেকে। তারা বলেন, যেখানে কওমী মাদারাসা শিক্ষাবোর্ড ও শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বী আলেমরা অনুদান না নেওয়ার পক্ষে সেখানে নেছার আহমাদ নাছিরী বোর্ডের নাম দিয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার পেছনে অবশ্যই উদ্দেশ্য রয়েছে।

এ বিষয়ে পাবলিক ভয়েসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি হওয়ার পর হাফেজ নেছার আহমাদ আন নাসিরী ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড’ নামের একটি সংগঠন থেকে প্রথমে কিছু সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং এর কিছুদিন পরই গত ২৯ এপ্রিল বিশেষ কিছু দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরবার স্মারকলিপি জমা দেন।

স্মারকলিপিতে দিন দফা দাবি পেশ করে তারা। স্মারকলিপি দেওয়ার পূর্বে এই দাবিগুলো নিয়ে জনমত গঠনের চেষ্টা করে এই বোড। দবিগুলো বলা হয়:-

– এপ্রিল, মে, জুন পর্যন্ত ভাড়ায় পরিচালিত প্রাইভেট মাদরাসার বাড়ী ভাড়ার ভুর্তুকি প্রদান করুন।
– এপ্রিল, মে,জুন পর্যন্ত আপনার (প্রধানমন্ত্রী) ঘোষিত প্যাকেজ থেকে শিক্ষকদের বেতন ভাতা প্রদান করুন।
– স্বাস্থ্যবিধি মেনে শর্তসাপেক্ষে ঈদের এক সপ্তাহ পর হিফজখানা খুলে দিন।

এর কয়েকদিন পর তিনি ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর বাসার সামনে দাড়িয়েও মানববন্ধন করেছেন এসব দাবি নিয়ে। এসব কার্যক্রমে তাঁর সাথে কওমী মাদরাসার বা আলেম ওলামাদের মধ্যে এমনকি পরিচিত হাফেজদের মধ্য থেকে পরিচিত কাউকেই তেমন দেখা যায়নি।

তবে এসব কার্যক্রম নিয়ে হাফেজ নাছিরীর সাথে আলোচনা করলে তিনি দাবি করে পাবলিক ভয়েসকে বলেন – ‘আমরা হেফজ মাদরাসাসমূহের অধিকার নিয়ে কাজ করতে চাই’।

‘আপনার দাবির সাথে অনেক প্রাইভেট মাদরাসা একমত নয় কেন’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- তারা কেন একমত নয় তা তারাই বলতে পারবে, আমরা হিফজকেন্দ্রিক শিক্ষাবোর্ড নিয়ে কাজ করছি।

‘বেশিরভাগ প্রাইভেট মাদরাসাই (হোক সেটা হিফজ বা কওমী) বেফাকসহ কোনো না কোনো শিক্ষাবোর্ডের অন্তর্ভূক্ত, সেখানে আপনি কিভাবে আর একটি শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা করলেন’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- এটা হেফজ মাদরাসা নিয়ে গঠিত শিক্ষাবোর্ড এবং অনেক মুরুব্বিরাই এখানে সম্পৃক্ত আছেন।

কারা কারা বা কোন কোন মুরুব্বি তাদের সাথে সম্পৃক্ত আছেন জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট করে নাম বলেননি কারও। তবে হেফজ মাদরাসার উন্নতিকল্পে আরও অনেক কাজ করে যেতে চান বলে উল্ল্যেখ করেন।

[উল্লিখিত সকল বক্তব্যের ডকুমেন্ট পাবলিক ভয়েসের কাছে সংরক্ষিত আছে]

সংশ্লিষ্ট সংবাদ :

সরকারী কোন অনুদান না নেওয়ার বেফাকের

কওমী মাদরাসা কোনো সরকারি অনুদান নেবে না : ৭১ আলেমের বিবৃতি

অনুদান প্রয়োজন নেই হাটহাজারীর মাদরাসার, প্রত্যাখ্যান মেখল মাদরাসার

রাষ্ট্র-ব্যক্তি সম্পর্কের বোঝাপড়া ; প্রেক্ষিত কওমী মাদ্রাসায় ‘অনুদান’ বিতর্ক

৬,৯৫৯ কওমী মাদরাসায় ৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা অনুদান প্রধানমন্ত্রীর

সহায়তা পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করলেন কওমী শিক্ষকরা

কওমী মাদরাসায় অনুদান দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আল্লামা মাসউদের

এসএস/এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন