প্রতিদিনের তারাবীহ’র তেলাওয়াতকৃত আয়াতের তাৎপর্য : ৯ম রমযান

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, মে ২, ২০২০

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আজকে সালাতুত তারাবীহে পঠিতব্য অংশের সংক্ষিপ্ত আলোচনা

(১২ নং পারা)

১২ নং পারা সুরা হুদ এবং সুরা ইউসুফের সমষ্টি৷ সুরা হুদ মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ১২৩ টি আয়াত ও ১০ টি রুকু রয়েছে৷ সুরার শুরুতে কুরআনে কারীমের মর্যাদা, অর্থ ও মর্মের দিক থেকে সুস্পষ্ট হওয়ার উল্লেখ এবং কোনোরূপ সমস্যা এবং অসামঞ্জস্যতার বিষয়টি নাকচ করে দেয়া হয়েছে৷ এই কিতাব সুস্পষ্ট হওয়ার বড় কারণ হলো, এই কুরআন তো সেই সত্তার পক্ষ থেকে এসেছে যিনি মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত, তাদের ব্যক্তিসত্তা, দুর্বলতা এবং প্রয়োজনাদি সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত৷ (১)

কিতাবের মর্যাদা বর্ণনার পর তাওহিদের দাওয়াত দেয়া হচ্ছে৷ তাওহিদের দাওয়াতের পর তাওহিদের দলিল বিবৃত হচ্ছে, যা সমস্ত মাখলুকাতের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে৷ সমস্ত মাখলুকাতকে আল্লাহ তাআলা রিযিক প্রদান করেন৷ ইরশাদ হচ্ছে- “আর পৃথিবীতে কোনো বিচরণশীল নেই, তবে সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন৷” (৬)

আসমান-যমীন ৬ দিনে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এই আলোচনা৷ যারা হিংসা আর জিদের বশবর্তী হয়েছে, তারা তাওহীদের অস্বীকার করেছে, কুরআন যে আল্লাহর কালাম, সেটাও অস্বীকার করেছে৷ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে যে, যদি বাস্তবেই কুরআন মানুষের বানানো হয়ে থাকে, তাহলে এর মতো অন্তত দশটি সুরা বানিয়ে দেখাও৷ (১৩)

অস্বীকারকারীদের সর্বমোট তিনবার চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে৷ প্রথমে পুরো কুরআনের মতো আরেকটি গ্রন্থ সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ, তারপর দশটি সুরা, তারপর সুরা বাকারায় কেবল একটি সুরা বানিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু তিন তিনবারই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে তারা অক্ষম হয়েছে৷

মানুষ দু-ভাগে বিভক্ত৷ কারো জীবনের সকল ব্যস্ততা, চেষ্টা ও কাজকর্ম কেবল দুনিয়াকে ঘিরেই৷ সারাক্ষণ এই জীবনে কত আরাম করতে পারে, এই জীবনকেই কিভাবে সাজাতে পারে, সেই ভাবনায় বিভোর থাকে৷ ভুলেও পরকালের কথা স্মরণ করে না৷ আরেক প্রকার মানুষ যারা দুনিয়ার জন্য প্রয়োজনমতো কিছু করলেও চূড়ান্ত টার্গেট থাকে আখেরাতের প্রতি৷ তারা পরকালীন জীবনকে সামনে রেখে দুনিয়ার জীবন যাপিত করেন৷ প্রথম দলের উদাহরণ অন্ধ ও বধিরের মতো, দ্বিতীয় দলের উদাহরণ চৌকস ও দূরদর্শী মানুষদের মতো৷ (১৫-১৭)

কুরআনের সত্যতা, তাওহীদ ও রিসালাতের প্রমাণাদির আলোচনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণের জন্য পূর্বেকার আম্বিয়ায়ে কেরাম- হযরত নূহ, হযরত হূদ, হযরত সালেহ, হযরত লূত, হযরত শুয়াইব, হযরত মূসা, হযরত হারুন আলাইহিমুস সালামের ঘটনাসমূহের আলোকপাত করলেন৷ কুরআনের মু’জিযার বিবরণ দিলেন৷

নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনা, তাঁর সম্প্রদায়ের সাথে কথোপকথন, প্লাবন সংঘটিত হওয়া, ঈমানদারদের নৌযানে আরোহণ করা প্রভৃতি বর্ণনা করার পর শেষে বলা হলো, এটি গায়বের খবর, আমি আপনার নিকট ওহী প্রেরণ করেছি৷ ইতোপূর্বে এটা আপনার এবং আপনার জাতির জানা ছিলো না৷ সুতরাং হে নুহ! আপনি ধৈর্যধারণ করুন৷ পরহেযগারদের শেষ ভালোই হয়৷ (৪৯)

আল্লাহ তাআলা বললেন: আর আপনি নৌকা তৈরি করুন আমার তত্বাবধানে ও ওহী অনুসারে৷ মানে ওহীর মাধ্যমে নূহ আলাইহিস সালামকে নির্মাণ কৌশল শিখিয়ে দেয়া হলো৷ কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে নৌকাটি ৩০০ গজ দীর্ঘ, ৫০ গজ প্রস্থ, ৩০ গজ উঁচু ও ত্রিতল বিশিষ্ট ছিলো৷ দুই পার্শ্বে অনেকগুলো জানালা ছিলো৷ এভাবে ওহীর মাধ্যমে হযরত নূহ আলাইহিস সালামের হাতে নৌকা ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছিল৷ ঠিক তদ্রূপ প্রতিটি শিল্পকর্মের সূচনা ওহীর মাধ্যমে হয়েছে৷

মহাপ্লাবন যখন শুরু হবে, তখন আপনি কোনো অবাধ্য কাফিরের জন্য আমার কাছে সুপারিশ করবেন না৷ (সুরা হূদ: ৩৭) নূহ আলাইহিস সালামের প্রতি আল্লাহ তাআলার এই নিষেধাজ্ঞায় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে৷ এই আয়াতের অধিনে তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআনে বলা হয়েছে যে, দুআকারীর কর্তব্য হলো যার জন্য ও যে কাজের জন্য দুআ করা হবে, তা জায়েয, হালাল ও ন্যায়সঙ্গত কি না তা জেনে নেয়া৷

আরো জানা গেলো যে, বর্তমানে অনেক পীর-বুযুর্গদের নীতি হচ্ছে, যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো দুআর জন্য তাদের কাছে আসে, পীর-বুযুর্গান তাদের জন্যই হাত তুলেন, মাকসাদ হাসিলের দুআ করেন৷ অথচ অনেক ক্ষেত্রে তাদের জানা থাকে যে, এ ব্যক্তি যালেম ও অন্যায়কারী, অথবা যে মকসাদের জন্য দুআ করাচ্ছে তা তার জন্য হালাল নয়৷ এমন কোনো চাকরি বা পদ লাভের জন্য দুআ চায়, যার ফলে সে হারামে লিপ্ত হবে৷ অথবা কারো হক নষ্ট করে নিজে লাভবান হবে৷ জেনেশুনে এসব দুআ করা তো হারাম বটেই, এমনকি সন্দেহজনক ব্যাপারেও প্রকৃত অবস্থা না জেনে দুআর জন্য হাত তোলাও সমীচীন নয়৷

এই সমস্ত ঘটনার বিবরণ একদিকে যেমন সচেতনদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের বিষয়, অপরদিকে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও নিষ্ঠাবান মুমিনদের জন্য সান্ত্বনা এবং দৃঢ়পদ থাকার উপকরণ এবং সবক৷ এজন্যে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইস্তেকামত তথা দৃঢ়পদ থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে৷ (১১২)

এর মাধ্যমে পুরো উম্মতই এই হুকুমের আওতায় চলে এলো৷ ইস্তেকামত তথা দৃঢ়পদ সাধারণ কিংবা সহজ কোনো বিষয় নয়৷ এটি এমন এক হুকুম, যার সম্পর্ক আকিদা, আমল, লেন-দেন, আচার-ব্যবহার, আখলাক, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ উপার্জন ও ব্যয় সবকিছু আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে তাঁরই নির্দেশিত সোজা পথে চলা৷ তাই এই সিফাত তাদেরই কেবল অর্জিত হয়, যারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দা৷ এ জন্য উলামায়ে কেরাম ইস্তেকামত তথা দৃঢ়পদ থাকাকে কারামত আখ্যা দিয়েছেন৷

ইবনে আব্বাস রা, বলেন: রাসুল ﷺ এর উপর পূর্ণ কুরআনের মধ্যে এই আয়াতের চেয়ে কঠিন ও কষ্টকর কোনো হুকুম নাযিল হয় নাই৷ তিনি আরো বলেন- একবার সাহাবায়ে কেরাম রা, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর দাড়ি মোবারকের কয়েক গাছি পেকে গেছে দেখতে পেলেন, তখন আফসোস করে বললেন, আপনার দিকে দ্রুতগতিতে বার্ধক্য এগিয়ে আসছে৷ তদুত্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন- সুরা হুদ আমাকে বৃদ্ধ করেছে৷ বার্ধক্যের কারণ হিসেবে সুরা হুদে বর্ণিত পূর্ববর্তী বিভিন্ন জাতির উপর কঠোর আযাবের ঘটনাবলিও হতে পারে৷ তবে হযরত ইবনে আব্বাস রা, বলেন- ‘ইস্তেকামতের’ নির্দেশই ছিলো বার্ধক্যের কারণ৷

নামায কায়েমের নির্দেশ দিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে নামাযের ওয়াক্ত বর্ণনা করছেন৷ “দিনের দু’প্রান্তে অর্থাৎ শুরুতে ও শেষভাগে এবং রাতের কিছু অংশে নামায কায়েম করবে৷” এখানে চারটি ওয়াক্তের কথা চলে এসেছে৷ রইল কেবল যুহরের ওয়াক্তের কথা৷ সেটা অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “নামায কায়েম কর যখন সূর্য ঢলে পড়ে৷” এরপর বলা হয়েছে “পুণ্যকর্ম অবশ্যই পাপকে মিটিয়ে দেয়৷” অর্থাৎ এখানে নামায, রোযা, যাকাত, হজ্ব, সদকা, সদ্ব্যবহার, উত্তম লেন-দেন যাবতীয় নেক কাজ উদ্দেশ্য৷ (১১৪)

সুরা হুদের ১১৬ নং আয়াতের মর্ম অনুধাবন করলে বোঝা যায় যে, কোনো সম্প্রদায়ের উপর তখনই আযাব নেমে আসে, যখন তাদের মাঝে দুটি খারাবি সৃষ্টি হয়৷ এক. এমন দরদী এবং বিচক্ষণ লোকের সংকট দেখা দেয়, যারা তাদের সম্প্রদায়ের লোককে ফিতনা-ফাসাদ থেকে বারণ করবেন৷ দুই. তারা অতিমাত্রায় ভোগ-বিলাসিতা এবং গোনাহে মত্ত হয়ে পড়ে৷ তখন সেই সম্প্রদায় আসমানি আযাব-গজবের উপযুক্ত হয়ে যায়৷

সুরা ইউসুফ মক্কায় অবতীর্ণ সুরা৷ এতে ১১১ টি আয়াত ও ১২ টি রুকু রয়েছে৷ যেহেতু এই সুরার পুরোটাই ইউসুফ আলাইহিস সালাম সংক্রান্ত ঘটনার বিবরণ সংশ্লিষ্ট, তাই এর নাম সুরা ইউসুফ৷ অন্য সুরার মতো না হয়ে বরং পুরো ঘটনাই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিবৃত হয়েছে৷ ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনায় এত বেশি শিক্ষণীয় ও উপদেশমূলক বিষয় রয়েছে যে, অন্য সুরার কাহিনীতে এমনটা হয় নি৷ তাই ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাহিনিকে কুরআনের ভাষায় ‘আহসানুল কাসাস’ তথা ‘উত্তম কাহিনি’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷

ব্যাপকতার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এখানে দ্বীনের কথাও এসেছে, দুনিয়ার কথাও এসেছে, তাওহীদ, ফিকহ, সীরাত, জীবনি, স্বপ্নের ব্যাখ্যা, রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ও ভালোবাসার উপকরণ, দুনিয়া-বিমুখতা, তাকওয়া অর্জনের কথা এবং নবীগণের আলোচনাও এসেছে৷ ফেরেশতা, শয়তান, জিন, ইনসান, চতুষ্পদ জন্তু, পাখিসমূহেরও কথা এসেছে৷ বাদশাহ, ব্যবসায়ী, আলিম, জাহিলের অবস্থাও বিবৃত হয়েছে৷ বিপথগামী নারীর কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র ও নির্লজ্জতার কথাও এসেছে৷ অখ্যাত হওয়ার কথাও এসেছে, প্রসিদ্ধি পাওয়ার কথাও এসেছে৷ অভাবের কথাও এসেছে, সমৃদ্ধির কথাও এসেছে, ইজ্জতের কথাও এসেছে, যিল্লতির কথাও এসেছে৷ ধৈর্যও দৃঢ়তার কথাও এসেছে, প্রবৃত্তির অনুসরণের কথাও এসেছে৷ একই কাহিনীতে এতগুলো বিষয় সন্নিবেশিত হওয়া অবাক হওয়ার মতো বিষয়ই৷

ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনাবহুল জীবনের সাথে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের বড় সাদৃশ্য রয়েছে৷ ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের ন্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথেও তাঁর কুরায়শের ভাইয়েরা হিংসা করল, হত্যার পরিকল্পনা করল, মক্কা ছাড়তে হলো, তিনদিন পর্যন্ত সওর গুহায় আত্মগোপনে থাকতে হলো, সেখান থেকে মদীনায় হিজরত করলেন৷ সেখান থেকে আস্তে আস্তে উন্নতি অর্জিত হলো৷ এমনকি ইসলামি রাষ্ট্রের কর্ণধার হলেন৷ তারপর মক্কা বিজয় হলো, কুরায়শের ভাইয়েরা লজ্জিত হলো৷ যেভাবে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা লজ্জিত হয়েছিলেন৷ তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেন৷ দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতে সম্মানিত হলেন৷

এই কাহিনিকে আল্লাহ তাআলা উত্তম কাহিনি বলে আখ্যায়িত করলেন৷ ইউসুফ এগারোটি নক্ষত্র ও চন্দ্র-সূর্য তাঁকে সিজদা করার স্বপ্নের কথা বাবাকে জানালেন৷ বাবা ইয়াকুব আলাইহিস সালাম ভাইদেরকে এই স্বপ্নের কথা জানাতে বারণ করে দিলেন৷ এবং এও সতর্ক করে দিলেন যে, তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে৷ এরপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নিয়ামত ও অনুগ্রহ প্রাপ্তির সুসংবাদ দিলেন৷ ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের কাহিনীতে জিজ্ঞাসুদের জন্য অনেক নিদর্শনাবলি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ (৩-৭)

ইয়াকুব আলাইহিস সালামের ১২ জন পুত্র ছিলেন৷ তন্মধ্যে ইউসুফ আলাইহিস সালাম অস্বাভাবিক সুন্দর ছিলেন৷ বাহ্যিক এবং চারিত্রিক সৌন্দর্যের কারণে বাবার অত্যধিক ভালোবাসার পাত্র ছিলেন৷ সবচে ছোট এবং মা-হারা হওয়ায় ভালোবাসার মাত্রাটা আরো বেশি ছিলো৷ বাবার এই অত্যধিক ভালোবাসায় ভাইয়েরা হিংসায় লিপ্ত হয়ে গেলো৷ বাবার কাছে ভ্রমণের কথা বলে ছোট্ট ইউসুফকে মাঠে নিয়ে গেলো৷ তারপর কূপের মধ্য নিক্ষেপ করে দিলো৷ সেদিক দিয়ে এক কাফেলা যাচ্ছিল৷ তারা পানি উঠানোর জন্য কূপে বালতি ঢালতেই কূপের ভেতর থেকে ইউসুফ উঠে এলেন৷ কাফেলার লোকেরা মিশর নিয়ে বিক্রি করে দিলো ইউসুফকে৷ আযীযে মিসর বা মিসরের অর্থমন্ত্রী ইউসুফকে ক্রয় করে ঘরে নিয়ে গেলো৷

যখন যৌবনে পদার্পণ করলেন, তখন আযীযে মিসরের স্ত্রী দুর্বল হয়ে পড়ল যুবক ইউসুফের প্রতি৷ গোনাহের দিকে আহবান করল, তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন৷ ঘটনা টের পেয়ে বদনাম থেকে বাঁচার জন্য আযীযে মিসর ইউসুফ আলাইহিস সালামকে জেলে পুরে দিলো৷ জেলেও তিনি তাওহীদের দাওয়াত জারি রাখলেন৷ যার কারণে জেলের লোকেরা তাঁকে সম্মান করত৷ বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলার কারণে তিনি বাদশাহর সুদৃষ্টি পেতে সমর্থ হলেন৷ তারপর বাদশাহ তাঁকে অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে দিলো৷ মিশর এবং আশপাশের এলাকা দুর্ভিক্ষ কবলিত হওয়ায় ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহের জন্য মিসর এলো৷ দু-একবার সাক্ষাতের পর তিনিই বলে দিলেন, আমি তোমাদের ভাই ইউসুফ৷ তারপর মা-বাবাও মিশর চলে এসে এখানেই স্থায়ী হয়ে গেলেন৷

এই হলো ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত কাহিনি৷

উপরোল্লিখিত ১৪ নং পয়েন্টের কিছু শিক্ষণীয় বিষয় হলো, যে কারো কাছে স্বপ্নের বর্ণনা করা ঠিক নয়৷ বিশেষ করে হিতাকাংখী ও সহানুভূতিশীল নয়, বা এই বিষয়ে পারদর্শী নয়; এরূপ লোকের কাছে স্বপ্নের বিবরণ দেয়া উচিত নয়৷ আরো জানা গেলো কষ্টদায়ক ও বিপজ্জনক স্বপ্ন কারও কাছে বর্ণনা করতে নেই৷ এখান থেকে আরো জানা যায় যে, মুসলমানকে অপরের অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্যে অপরের কোনো মন্দ অভ্যাস অথবা স্বভাব প্রকাশ করা জায়েয৷ এটা গিবতের অন্তর্ভুক্ত নয়৷ ইউসুফ আলাইহিস সালামের স্বপ্নের ব্যাখ্যা চল্লিশ বছর পর প্রকাশ পায়৷ এতে বোঝা যায় যে, তাৎক্ষণিকভাবে স্বপ্ন ফলে যাওয়া জরুরি নয়৷

তারা ইউসুফ আলাইহিস সালামের রক্তেভেজা জামা বাবাকে দেখাল যে, দেখেন! ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে৷ কিন্তু ইয়াকুব আলাইহিস সালাম জামা অক্ষত দেখে বুঝতে পারলেন তারা জামায় কৃত্রিমভাবে রক্ত লাগিয়েছে৷ এরপর তিনি তাদের বললেন: ইউসুফকে বাঘে খায় নি; বরং তোমাদেরই মন একটি বিষয় খাড়া করেছে৷ এখন আমার জন্য উত্তম এই যে, ধৈর্যধারণ করি এবং তোমারা যা বলো, তাতে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি৷

ভাইয়েরা যখন ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কূপের গভীরে নিক্ষেপ করতে একমত হয়ে গেলো, তখন আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে সংবাদ দিলেন যে, একদিন আসবে, যখন তুমি ভাইদের কাছে তাদের এ কুকর্মের কথা ব্যক্ত করবে৷ তারা তখন কিছুই বুঝতে পারবে না৷ অর্থাৎ ধ্বংস হওয়া থেকে মুক্ত থাকার কথা বলার এবং তাদেরকে তিরস্কার করার সুযোগ আসবে৷ অথচ তারা তোমাকে চিনবেও না যে, তুমিই তাদের ভাই ইউসুফ৷

ইউসুফ আলাইহিস সালামের পরনের জামা কিছু আশ্চর্যজনক বিষয়ের স্মারক হয়ে আছে৷ তিনটি বিরাট ঘটনা এই জামার সাথেই জড়িত রয়েছে৷ প্রথম ঘটনা হলো, রক্তে রঞ্জিত করে পিতাকে ধোকা দেয়া এবং জামার সাক্ষ্য দ্বারাই তাদের মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া৷ দ্বিতীয় যুলায়খার ঘটনা৷ এতেও ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামাটিই সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হয়েছে৷ তৃতীয় ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসার ঘটনা৷ এতেও তাঁর জামাটিই মু’জিযার প্রতীক প্রমাণিত হয়েছে৷

যে ইউসুফ ক্রীতদাসের বেশে আযীযে মিসরের ঘরে প্রবেশ করলেন, আল্লাহ তাআলা সেই ইউসুফ আলাইহিস সালামকে অতি সত্ত্বর মিসরের সর্বপ্রধান ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের সুসংবাদ দিলেন৷ পরের ইতিহাস তো সবার জানা৷

আযীযে মিসরের স্ত্রী ইউসুফ আলাইহিস সালামের প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ল এবং ঘরের সবগুলো দরজা বন্ধ করে কুবাসনা চরিতার্থের জন্যে তাঁকে আহবান জানাল৷ তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন৷ যার কারণে অলৌকিকভাবে আল্লাহ তাআলা এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বাঁচিয়ে আনলেন৷ তাই বোঝা গেলো, গোনাহ থেকে বাঁচার প্রধান অবলম্বন একমাত্র আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা৷

ইউসুফ আলাইহিস সালাম গোনাহ থেকে বাঁচার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলেন৷ যুলায়খাও পেছন দিক থেকে দৌড় দিলো৷ ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামা ধরে টানার কারণে জামা ছিড়ে গেলো৷ এ থেকে বোঝা যায়, যে জায়গায় পাপে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সে জায়গাকেই পরিত্যাগ করা উচিত৷

নিজে দোষ করে যুলায়খা ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করল৷ আযীযে মিসর সব বুঝতে পারল৷ তাই তো যুলায়খাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তোমাদের চক্রান্ত খুবই জটিল৷” নারী জাতির ছলনা আসলেই মারাত্মক বিষয়৷ তারা বাহ্যত কোমল, নাজুক ও অবলা হয়ে থাকে৷ তাদেরকে দ্রুত বিশ্বাস স্থাপনের অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যায়৷ কিন্তু বুদ্ধি ও দীনদারিতার অভাববশত তা অধিকাংশ সময় ছলনা হয়ে থাকে৷ জানা কথা যে, এখানে সব নারী বোঝানো হয় নি বরং ঐসব নারীদের সম্পর্কেই বলা হয়েছে যারা এ ধরণের ছলচাতুরিতে লিপ্ত৷

সুরা ইউসুফের কাহিনী থেকে যে শিক্ষা এবং উপদেশ আমরা গ্রহণ করতে পারি৷

-কোনো সময় বড় মুসিবতে পতিত হওয়া জীবনের উন্নতি ও সমৃদ্ধির কারণ হতে পারে৷ ইউসুফ আ, ভাইদের ষড়যন্ত্র, ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রিত হওয়া, নারীর ফিতনায় পতিত হওয়া, কয়েকবছর জেল খাটার মতো মুসিবত মাড়িয়ে মিসরের সম্রাট হলেন৷ দ্বীনি এবং দুনিয়াবী সম্মানে ভূষিত হলেন৷

★ হিংসা চূড়ান্ত পর্যায়ের ভয়ানক রোগ৷ ভাইদের মাঝে যখন এই রোগ সৃষ্টি হয়ে যায়; তখন বড়ই দুঃখজনক ঘটনার জন্ম নেয়৷

★ উত্তম আখলাক, সর্বোচ্চ গুণাগুণ ও শ্রেষ্ঠ তারবিয়াত ও দীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ এক মহান বাবার হাতে দীক্ষা লাভ, পূর্বপুরুষদের নবুওয়তী ও আখলাকী সিলসিলার উপর পূর্ণাঙ্গরূপে বেড়ে ওঠার ফলশ্রুতি এমন হয়েছে যে, নানারূপী বিপদ-মুসিবতও তাঁকে হিম্মতহারা কিংবা পথচ্যুত করতে পারে নি৷ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন দৃঢ়পদে৷

★ নারী-পুরুষ সবার জন্য চারিত্রিক পবিত্রতা, আমানতদারী এবং দৃঢ়পদ থাকা সকল কল্যাণের উৎস৷ যারা দ্বীনের উপর অবিচল এবং দৃঢ়পদ থাকে, একদিন তারা মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়ই৷

★ নারী-পুরুষের মাখামাখি নিশ্চিতভাবে বড় ফিতনার কারণ৷ এজন্য একাকী নারী-পুরুষ মিলিত হওয়া ইসলামি শরীয়ত হারাম সাব্যস্ত করে দিয়েছে৷ হাদীসে এসেছে, নারী-পুরুষ যখন একাকি মিলিত হয়, শয়তান তখন তৃতীয় লোক হিসেবে ভূমিকা রাখে৷

চলবে…

[প্রতিদিন আসরের পর ইসলামী লেখক ও খতিব মুফতী জিয়া রহমান লিখিত ওই দিনের তারাবীহর আলোচনা প্রকাশ করা হবে। পড়তে পাবলিক ভয়েসের ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ ফলো করুন]

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

মন্তব্য করুন