রাষ্ট্র-ব্যক্তি সম্পর্কের বোঝাপড়া ; প্রেক্ষিত কওমী মাদ্রাসায় ‘অনুদান’ বিতর্ক

প্রকাশিত: ৩:২৬ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০২০

অতিসাম্প্রতিক কওমী মাদ্রাসায় সরকারের দেয়া “অনুদান” নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের পক্ষ-বিপক্ষ উভয়ই রাষ্ট্র-ব্যক্তির সম্পর্ক না বুঝে পক্ষ-বিপক্ষ নিচ্ছেন। এর ফল অতি মারাত্মক। এতে করে “শাসকগোষ্ঠী” (আধুনিক রাষ্ট্রে এই শব্দের ব্যবহারও শুদ্ধ না) দিন দিন নিজেকে রাজা বা সম্রাজ্ঞী ভাবা শুরু করে এবং সেরকমই আচরন করে।

রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক বোঝা খুব জরুরী। রাষ্ট্র বলতে একটি কতৃত্ব ও ক্ষমতা সম্পন্ন কাঠামো যার একাধিক প্রতিষ্ঠান আছে। এই কতৃত্ব ও ক্ষমতার উৎস এবং তার ব্যবহার পদ্ধতির ভিন্নতার ওপরেই রাষ্ট্রের আদর্শিক পরিচয় নির্ভর করে।

রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির সম্পর্কও নির্ণীত হয় এই রাষ্ট্রের মতাদর্শিক অবস্থানের ওপরে ভিত্তি করে।

রাজতন্ত্রে ব্যক্তিকে মনে করা হতো প্রজা, সামন্তবাদে দাস, সাম্রাজ্যবাদে না-মানুষ আর আধুনিক রাষ্ট্রের শুরুতে মনে করা হতো নাগরিক, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ক্রেতা আর এখন ব্যক্তিকে মনে করা হয় বিশেষত গণযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশগুলোতে ব্যক্তিকে মনে করা হয় রাষ্ট্রের মালিক।

বাংলাদেশ গণযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি দেশ। এর অর্থ হলো বাংলাদেশের মানুষ এই দেশের মালিক। সংবিধানও সেই স্বীকৃতি দিয়েছে।

আর সরকার? সরকার হলো বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে দেশের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়োজিত বেতনভুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সমষ্টি।

একজন সরকারী চাকুরীজীবি জনগণের অর্থে জীবিকা নির্বাহ করেন। অফিসে তিনি যে চা খান সেটাও জনগণের টাকায়। তার মাথার ওপরে যে পাখা ঘোরে বা কক্ষে যে বাতি জ্বলে তাও জনগণের টাকায়। কর্মকর্তা যত বড় হন তিনি তত রাষ্ট্রের ও জনগণের সম্পত্তি ভোগ করেন। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির থাকা-খাওয়া, চলাচল সবকিছুই জনগণের টাকায় হয়।

রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির এই সম্পর্ক বোঝা খুবই জরুরী। এটা যদি বোঝা যায় তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আমার দায়িত্ব কি বা আমার প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি? রাষ্ট্র আমাকে কি দিতে পারে আর কি দিতে পারে না, কোন শব্দ প্রয়োগ করতে পারে আর কোন শব্দ প্রয়োগ করতে পারে না তা নির্ণয় করা যায়। 

রাষ্ট্রের কোন সুবিধা আপনি নিবেন আর কোনটা নিবেন না তাও নির্ভর করে এই বোঝাপড়ার ওপরে। এই বোঝাপড়া না থাকলে আপনি পদে পদে ভুল করবেন এবং বঞ্চিত হবেন।

সেজন্যই রাষ্ট্র বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারনা থাকা সবার জন্যই অপরিহার্য। দেশের সাধারন শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুল পর্যায়ে সমাজ নামক পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে বাচ্চাদের এই সম্পর্কিত প্রাথমিক ধরনাগুলো দেয়া হয়। কওমী মাদ্রাসায় সেটা দেয়া হয় না। একারণেরই প্রায়শ কওমী নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ও বোঝাপোড়ায় বড় ধরনের ভুল করেন।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো, কওমী সনদের স্বীকৃতির পরে শোকরানা মাহফিল এবং সেখানে মাননীয়র স্থুল স্তবক গাওয়া।

আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে এতোবছর বঞ্চিত করা কারণে যেখানে কতৃপক্ষের বিনীত ক্ষমা চাওয়া উচিৎ সেখানে আয়োজন করে শোকরানা আদায় করা হয়েছে। যারা করেছেন তারা এই রাষ্ট্র-ব্যক্তি সম্পর্ক নিয়ে বোঝাপড়া না থাকার কারণেই করেছেন। তারা মালিক-কর্মচারীর সম্পর্কের বদলে রাজা-প্রজার সম্পর্ক বিবেচনা করে স্বীকৃতিকে রাজার অনুগ্রহ ভেবে রাজার কৃতজ্ঞতা আদায় করেছেন। একইভাবে যারা বিরোধিতা করেছেন তারাও এই সম্পর্কের ভিত্তিতে নয় বরং ইসলামের একটি ফিকহি বিধান লংঘনের অভিযোগে বিরোধিতা করেছেন। তাদের বিরোধিতা ঠিক থাকলেও তারাও রাষ্ট্র-ব্যক্তি সম্পর্ক না বুঝে বিরোধিতা করেছেন। এতে বিরোধিতা হয়েছে বটে কিন্তু মুল প্রশ্ন আড়াল হয়ে গেছে।

অতিসাম্প্রতিক কওমী মাদ্রাসায় সরকারের দেয়া “অনুদান” নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের পক্ষ-বিপক্ষ উভয়ই রাষ্ট্র-ব্যক্তির সম্পর্ক নাবুঝে পক্ষ-বিপক্ষ নিচ্ছেন। এর ফল অতি মারাত্মক। এতে করে “শাসকগোষ্ঠী” (আধুনিক রাষ্ট্রে এই শব্দের ব্যবহারও শুদ্ধ না) দিন দিন নিজেকে রাজা বা সম্রাজ্ঞী ভাবা শুরু করে এবং সেরকমই আচরন করে।

সাম্প্রতিক “অনুদান” বিতর্কে সর্বপ্রথম প্রশ্ন তোলার দরকার ছিলো যে, “অনুদান” শব্দ নিয়ে।

দান বা অনুদান শব্দের অর্থ হলো স্বত্ব ত্যাগ করে কাউকে কিছু দেয়া। সরকার অনুদান দিয়েছে এটা শুদ্ধ হওয়ার জন্য তো আগে সম্পদের ওপরে সরকারের স্বত্ব প্রমানিত হবে। বাংলাদশের কোন সম্পদের মালিক সরকার না। সকল সম্পদের মালিক জনগণ। তাহলে সরকার “অনুদান” দেয় কি করে?

এবং সেই “অনুদান” পেয়ে সেটা গ্রহণ করা বা না করার তর্কের আগে দরকার ছিলো এই শব্দ নিয়ে প্রশ্ন করা। এই প্রশ্ন না করার অর্থ হলো, হয় রাষ্ট্র-ব্যক্তি সম্পর্ক নিয়ে বোঝাপড়ার তীব্র অভাব অথবা সরকার বা মাননীয়কে রাজতন্ত্রের রাজা বা সম্রাজ্ঞী হিসেবে মেনে নেয়া এবং দেশের সকল সম্পত্তির তিনিই মালিক বাকী সবাই প্রজা এটা মেনে নেয়া।

এই নেয়াটা বড় ধরনের অপরাধ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত একটি গণপ্রজাতন্ত্রী দেশকে রাজতান্ত্রিক দেশে পরিনত করার মানসিক স্বীকৃতি এটা।

পরের প্রশ্ন হলো, দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো দেওবন্দের এক শীর্ষ তাত্ত্বিকের ভাষায় “দারুল হরবে”। একটি ঔপনিবেশিক শাসনামলে। যে শক্তির সাথে দেশের জনগণের সম্পর্ক ছিলো বৈরিতার সম্পর্ক।

আর বর্তমান বাংলাদেশ এদেশের মুসলিম জনগণের নিজস্ব স্বাধীন একটি দেশ। ঔপনিবেশিক শক্তির অধিনে থাকা দেওবন্দের তৎকালীন আচরন স্বাধীন দেশে অনুসৃত হতে হবে কেন? নাকি বাংলাদেশকেও তারা দারুল হরব মনে করেন এবং বর্তমান শাসকদেরকে ঔপনিবেশিক শাসকদের হুকুমে মনে করেন?

যদি বাংলাদেশকে দারুল হরব মনে করেন এবং শাসকদেরকে ঔপনিবেশিক শাসকদের হুকুমে মনে করেন তাহলে এর প্রতিফলন অন্যক্ষেত্রেও তো হওয়া দরকার। আর যদি এরকম মনে না করেন তাহলে সমস্যার মুহুর্তে রাষ্ট্রের সাহায্য নেয়ার মধ্যে খারাপ কিছু নাই বরং সমস্যাকালে রাষ্ট্র সহায়তা করবে বলেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এজন্যই বছরের পর বছর রাষ্ট্রকে কর দেয়া হয়, মান্য করা হয়।

বছরের পর বছর নিরাপত্তারক্ষী পোষা হয় বিপদে সাহায্য করবে বলেই। বিপদের মুহুর্তে নিরাপত্তারক্ষী সাহায্য করা নিরাপত্তারক্ষীর দায়িত্ব আর আপনার অধিকার এটা। এটাকে ভুল করে নিরাপত্তারক্ষীর অনুদান ভাবা যেমন মুর্খতা তেমনি নিরাপত্তারক্ষীর সাহায্য নিলে আপনার স্বাতন্ত্রতা নষ্ট হবে বলে ধারনা করাও ভুল।

তাই কওমী মাদ্রাসার জন্য বরাদ্ধকৃত অর্থ নেয়া না নেয়ার প্রশ্ন অবান্তর। বরং এখানে প্রশ্ন উঠা উচিৎ, এটাকে ” অনুদান” বলা হলো কেন? এই শব্দ প্রত্যাহার করতে হবে এবং এই মানসিকতাও পরিহার করতে হবে।

এই অর্থ বরাদ্দের জন্য আবেগে গদগদ হয়ে কাউকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ছ্যাবলামিও বন্ধ করতে হবে।

এবং কতজনের জন্য কতটাকা বরাদ্দ করা হলো, কোন নীতিতে বরাদ্দ করা হলো, অন্য খাতগুলোর সাথে এখানে বরাদ্দকৃত টাকার আনুপাতিক হার কত, সেটা কম বা বেশি হলে সেটা কেন ইত্যাদি প্রশ্ন তুলে তার যৌক্তিক জবাব দিতে বাধ্য করতে হবে।

মুলকথা হলো, রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে সুষ্ঠু বোঝাপড়া থাকতে হবে। এবং তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাষ্ট্রের ধরন পরিবর্তন হয়। তাই কোন কালের কোন সিদ্ধান্তকে স্বতসিদ্ধ ধরে নেয়ার যেমন কোন কারণ নাই তেমনি কাউকে রাজা-রানীর পর্যায়ে উঠিয়ে তার বন্দনা গীত করারও কোন কারণ নাই।

আমার যা প্রাপ্য তা আমি বুঝে নেবো। আমার অধিকার আমি আদায় করে নেবো। কাউকে যদি যৌক্তিক কারণে আমার সরকার হিসেবে পছন্দ না হয় তাহলে প্রথাসিদ্ধ পন্থায় তা বদলে নেবো। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রাপ্য তা আমি বুঝে নেবোই।

বিষয়টা বোঝাপড়ার ও অধিকারের। আবেগ বা অনুদানের না।

লেখক : বিশ্লেষক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক

সংশ্লিষ্ট সংবাদ :

৬,৯৫৯ কওমী মাদরাসায় ৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা অনুদান প্রধানমন্ত্রীর

সহায়তা পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করলেন কওমী শিক্ষকরা

কওমী মাদরাসায় অনুদান দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আল্লামা মাসউদের

কওমী মাদরাসা কোনো সরকারি অনুদান নেবে না : ৭১ আলেমের বিবৃতি

মন্তব্য করুন