জন্মলগ্ন থেকেই পালন করছি শ্রমিক দিবস, ফলাফল কী?

প্রকাশিত: ২:১১ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০২০

একবছর পেরিয়ে আবারো আমাদের মাঝে এসেছে বিশ্ব শ্রমিক দিবস। বিভিন্ন দেশে এর গুরুত্বের সাথে সাথে আমাদের দেশেও এই দিবসের রয়েছে দারুণ গুরুত্ব। তবে এবারের শ্রমিক দিবস যেন হতাশার এক দিবস।

বাংলাদেশের শ্রমিকরা একদিকে যেমন করোনায় ঘরবন্দী হয়ে কষ্টে জীবন যাপন করছে, অন্যদিকে তাদের নিয়ে হচ্ছে তামাশার পর নগ্ন তামাশা। অথচ আজ অবস্থা ভালো থাকলে লম্বা গলায় তাদেরই বলা হতো রাষ্ট্রের সেরা সম্পদ।

১৮৮৬ সালের ১লা মে। সেদিন ছিলো পুরো বিশ্বের শ্রমিকদের জন্য একদি ভয়ংকর দিন। শ্রমিকের ওপর মালিকপক্ষের নির্মম অত্যাচারের এক ভয়াল অন্ধকার দিন ছিলো ১লা মে। সেদিন আমেরিকায় মেহনতী শ্রমিকশ্রেণী তাদের কর্মের দৈনিক ৮ ঘণ্টা দাবীসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যায্য দাবী এবং অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ধর্মঘটের ডাক দেয়।

সেদিনের করা শ্রমিকদের ধর্মঘটের পূর্বে বিশ্বের কোথাও কোনো শ্রম আইন ছিলো না। শ্রমিকদেরকে তখন মনে হয় মানুষ ভাবারও সুযোগ পেতো না সভ্য মালিকপক্ষ। তখন শ্রমিকদের মানবিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বলতেও কিছু ছিল না। তারা ছিল মালিকদের হুকুমের গোলাম মাত্র।

ছিলো না তাদের কাজের কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা। চাকরীর স্থায়ীত্ব এবং ন্যায়সঙ্গত বেতনও ছিলো না শ্রমিকদের। কোনো সাপ্তাহিক ছুটিও ছিলো না তাদের। মালিকরা দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করাতেন শ্রমিকদের।

১লা মে‘তে হওয়া আমেরিকায় এই আন্দোলন একদিনের না। এই আন্দোলন তুুষের আগুনের মতো ধীরে ধীরে জলে ওঠা একটি গণ আন্দোলন।

যার চূড়ান্ত রুপে ১৮৮৬ সালের ১লা মে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজসহ আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে ঢালাই শ্রমিক নেতা এইচ সিলভিসের নেতৃত্বে আমেরিকা ও কানাডার প্রায় তিন লক্ষাধিক শ্রমিক শিকাগোর ‘হে’ মার্কেটে বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে প্রথম তাদের শ্রমিক ধর্মঘট পালন করেন।

শ্রমিকদের এই আন্দোলন চলাকালীন সমাবেশে মালিকপক্ষের ভাড়া করা পুলিশ ও কতিপয় মাস্তান সম্পূর্ণ বিনা কারণে শ্রমিক ধর্মঘটের গণজমায়েতের উপর অতর্কিতভাবে গুলী বর্ষণ করতে থাকে। ৬ জন শ্রমিককে তারা এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে এবং শতাধিক শ্রমিককে আহত করে।

  • কিন্তু এই হত্যা আর আহত হওয়া দেখেও শ্রমিকরা দমে যায়নি। শ্রমিকরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকলে কিছু কিছু মালিক পক্ষ তাদের ৮ ঘণ্টার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।

এতে করে শ্রমিকরা আরো উৎসাহী এবং নিজ অধিকার আদায়ে আত্মপ্রত্যয়ী হতে থাকে। তারা সব জায়গায় ৮ ঘণ্টা কর্ম সময় প্রতিষ্ঠা এবং সাপ্তাহিক ছুটির দাবিতেও তাদের আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তুলে।

১লা মে’তে শ্রকিদের ওপর মালিকপক্ষের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ এবং ভাড়াটে মাস্তান দ্বারা হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ৪ঠা মে আবারো বিক্ষোভে নামে শ্রমিকরা। সেই আন্দোলনেও মালিক পক্ষের পুলিশ এবং ভাড়াটে মাস্তানগণ অতর্কিত হামলা করে ৪ জন শ্রমিককে হত্যা করে। রক্তে রঞ্জিত হয় ‘হে মার্কেট’ চত্বর। গ্রেফতার করা হয় শ্রমিক নেতা স্পাইজ ও ফিলডেন’সহ আরো অনেক গুরুত্বপুর্ণ শ্রমিক নেতাকে।

মালিকপক্ষ এই শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার করে তাদের সমন্বয়ে ‘জুরি’ গঠন করে ১৮৮৬ সালের ২১ জুন বিচারের নামে করা হয় প্রহসন। একপক্ষীয় বিচারের নামে ১৮৮৬ সালে ৯ অক্টোবর রায় হয় আটককৃত শ্রমিক নেতাদের। রায়ে সেই শ্রমিক নেতাদের ফাঁসির রায় হয়। আর রায় কার্যকরা করা হয় ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর।

শ্রমিক নেতা ও কর্মী হত্যার এ দিবসটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে প্রতিবছর ১লা মে ‘শ্রমিক হত্যা দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দৈনিক ৮ ঘণ্টা কার্যসময় ও সপ্তাহে এক দিন সাধারণ ছুটি প্রদানের ব্যবস্থা করে প্রথম শ্রম আইন করা হয়।

অন্যদিকে এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ বিশ্বের শ্রমিকদের এনে দেয় নতুন গতি। শিকাগো শহরে সৃষ্ট এ আন্দোলন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে। পৃথিবীর সকল শ্রমজীবী মানুষ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে স্লোগান তুলেন ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

সেই থেকে শুরু হয় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার রুপ। তথাপি এখনো নিরবে নিভৃতে চলছে শ্রমিকদের ওপর মালিক পক্ষের মানিসক এবং আর্থিক নির্যাতন। বাংলাদেশে দেখা যায় এখনো অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানে ৯-১২ ঘণ্টা কাজ করাচ্ছে মালিকপক্ষ।

বেতন নিয়েও করছে তামাশার হলিখেলা। শুরুতেই করোনভাইরাস প্রেক্ষাপটে পুরো বাংলাদেশে অঘোষিত লকডাউনে অফিস-আদালত বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি মালিকপক্ষ পেয়ে গেছে এতে মহাসুযোগ। বেতন দেওয়া লাগবে না শ্রমিকদের। চিন্তামুক্ত হওয়ার অসাধু বাসনা জেঁকে বসে মনে। অথচ বকেয়া বেতন আদায়ের কোনো সুরাহা না করেই এমনটি করা শ্রমিকের সাথে কতটা উপহাস তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এরপর যা হচ্ছে, একবার বলে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চালু হবে। শ্রমিকদের ঢাকায় জড়ো করে আবার বলে চলেও যাও তোমরা গার্মেন্টস চলবে না। এরপর আবারো তা চালু করার ঘোষণা দেয়। যা দূরের শ্রমিকদের দুঃসহ দূর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি।

অন্যদিকে দেশ এবং দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য সরকারে পদক্ষেপ প্রশংসনীয় বটে। তবে পানি ছেড়ে দিয়ে বাঁধ দিতে বলা যেমন ঠিক হয়নি, তেমনি হুটহাট লকডাউন করে শ্রমিকদের ঘরবন্দী করাও ঠিক হয়নি।

সরকার ২৬ মার্চ থেকে যখন সকল সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত, স্কুল প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলো; তখন কি মালিক পক্ষের সাথে সুরাহা করে শ্রমিকদের বেতনের একটা ব্যবস্থা করা যেতোনা ! ? !

অপরদিকে এই অসহায় মানুষগুলো জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামলে প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রতিনিধিরা হতেন তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ। অথচ সেই স্থানীয় প্রতিনিধির কি উচিত ছিলো না যে, ‘এই অসহায়দের আগে পেটে ভাত দিই, তারপর না হয় পিঠে লাথি দেওয়া যাবে’।

আজকের এই উন্নত সময়ে দেখি শ্রমিকরা তাদের বেতনের জন্য বিক্ষোভ করছে। করোনা চলাকালীন সময়টাতেও যা থেমে নেই। শ্রমিকরা তাদের বেতনের জন্য বিক্ষোভ করবে এটা তো আশ্চর্য হওয়ার কোনো বিষয় না। অথচ আজ মাইক পেলে সেই মালিকপক্ষ গলা উঁচু করে বলবে মালিক শ্রমিক ভাই ভাই।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় বাংলাদেশে প্রথম শ্রমিক দিবস পালন করা হয়। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নের শুরু থেকেই শ্রমিক দিবস পালন হয়ে আসছে। অথচ সেই দেশে এখনো শ্রমিকরা মালিকদের দ্বারা সদা নির্যাতিত হচ্ছে।

সরকারি একজন কর্মকর্তা যদিও ৮ ঘণ্টা কাজ করেন; একজন সাধারণ শ্রমিকের ক্ষেত্রে হচ্ছে চিত্রটা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো মারাত্মকভাবে রয়ে গেছে শ্রমিক বৈষম্যের বিষবাষ্প। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তির ‍মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা।

এই সময়ে এসে প্রশ্ন উঠছে, মুক্তিযুদ্ধের পেছনে শ্রমিক অধিকার আদায়ের যেই গূরুত্বপূর্ণ দাবি ছিলো; স্বাধীনতার ৫০ বছরের সামনে দাঁড়িয়ে সেই দাবির ৫০ভাগও বাস্তবায়ন হয়ছে কিনা। অথচ বঙ্গবন্ধুর ৬৬’র ছয় দফার অন্তত তিনটে দফা শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ছিলো।

স্বাধীনতার ৪৯ বছর কিংবা শ্রমিক আন্দোলনের সোয়াশো বছর পেরিয়েও এখনো নির্দিষ্ট সময়ে শ্রমিকরা পাচ্ছে না তাদের নির্ধারিত বেতন। অথচ বিশ্বনবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘তোমরা শ্রমিককে তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও’ (মিশকাত)।

রাসূল সা. আরো বলেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। তাদের মধ্যে একজন হলো- ‘যে শ্রমিকের নিকট থেকে পূর্ণ শ্রম গ্রহণ করে অথচ তার পূর্ণ মজুরী প্রদান করে না’ (বুখারী)।

পরিশেষে বলবো, এ সুন্দর পৃথিবীর রূপ-লাবণ্যতায় শ্রমিকদের কৃতিত্বই বেশি। কিন্তু সভ্যতার এই কারিগররা সর্বদাই অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত। উষ্ণ ঘামের গন্ধ নিয়ে খেটে যাওয়া শ্রমিকরা তার মালিকের অর্থযন্ত্রটি সচল রাখে, আর সেই মালিকেরই অবিচারে শ্রমিকদের অচল জীবনটি আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এর থেকে শ্রমিকদের পরিত্রাণ জরুরি।

আজ আবার শপথ হোক, শ্রমিক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হোক ‘মালিক- শ্রমিক নো দ্যাটস দাস-মালিক’। বরং মালিক শ্রমিক হোক পিতা আর সন্তানতুল্য সম্পর্কের বন্ধন।

  • লেখক: সুলতান মাহমুদ আরিফ
    শিক্ষার্থী ও সংবাদকমী

মন্তব্য করুন