নিরানন্দ রমযানের প্রথম জুম’আ: কেমন কাটলো খতিব-ইমাম ও মুসুল্লিদের?

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি

প্রকাশিত: ১০:৫৫ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০২০

১৪৪১ হিজরি সনের রমযান এর আজ সপ্তম দিন। দেখতে দেখতে চলে চলে ৭টি রোজা। রোজার সপ্তম দিনে এসে বাংলাদেশের মুসুল্লিরা পড়েছে পবিত্র রমযানের প্রথম জুম’আ ।

প্রতি রমযানের শেষ জুমআ তথা বিদায়ী জুমআ’র ন্যায় প্রথম জুমআও মুসুল্লিদের ব্যাপক গূরুত্ব এবং উৎসবের বার্তা দেয়। কিন্তু এবারের জুমআ ছিলো অন্যান্যবারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এই রমযানের আজকের প্রথম জুম’আ কেমন কাটলো সীমিত জুমআয়।

ইমাম, খতিব ও মুসুল্লিদের এই রমযানের প্রথম জুমআ আদায়ের অনুভূতি জানতে আমার কথা বলেছিলাম আলেম, ইমাম, খতিব ও মুসুল্লিদের সাথে। পাবলিক ভয়েসকে তারা জানিয়েছেন উৎসবহীন, নিরানন্দ জুমআ’র দিনে ঘরে নামাজ পড়ার অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা।

শুরুতেই কথা বলি ‘জামেয়া দারুল হিকমাহ, ঢাকা’ এর আমীনুত তা’লীম মুফতী আব্দুর রহমান কোব্বাদীর সাথে। তিনি আমাদেরকে বলেন, বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনাভাইরাসে ঘরবন্দি হয়ে গেছে সব মানুষ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সব দেশেই লকডাউন বা ঘরবন্দি একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বা মানুষের চলাচলে পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সব দেশেই সব ধরণের জমায়েত নিষিদ্ধ ও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

সেই আলোকে মসজিদগুলোতেও প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। মসজিদে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা বা নামাজ পড়তে না পারা যে কতোটা যন্ত্রণার হতে পারে সেটা পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই লিপিবদ্ধ করা যাবে না। যদিও মানুষজন বাজারে-ঘাটে যাচ্ছে। কিন্তু মসজিদ একটা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় হয়তো এখানে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাধ্য করা যায়। কিন্তু বাজারে লোকজন জমায়েত কিন্তু বাধ্য করা যায় না।

কিন্তু আমরা বলবো, মসজিদে কিছু ব্যাপার নিয়ে বাড়াবাড়ি হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। সংঘর্ষের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এটা অত্যান্ত দুঃখজনক। স্থানীয় মসজিদগুলোতে যেখানে আশংকা নেই বা কম সেখানে বিষয়টার শিথিলতা থাকা উচিত।

এ বিষয়ে কথা হয় রাজধানী ‘তানযীমুল মিল্লাত আল ইসলামিয়া, ঢাকা’ এর শিক্ষা সচিব মুফতী এইচ এম আবু বকর এর সাথে। তিনি আমাদেরকে জানান তার ব্যক্তিগত অনুভূতি।

মুফতী আবু বকর বলেন, লকডাউন ঘোষণার আগে গ্রামে এসেছিলাম। এরপর ঢাকায় যেতে পারিনি। আজকে প্রথম জুম’আ চলে গেলো রমযানের। গ্রামের মসজিদে অল্প মুসুল্লি নিয়ে নামাজ পড়েছি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ জুম’আর নামাজে মসজিদে মুসুল্লি সংখ্যা বেঁধে দিয়েছে সরকার। কোথাও কোথাও লঙ্ঘন হলে প্রশাসন কঠোর প্রতিক্রিয়া নিচ্ছে। হয়তো তারা বাস্তবতার নিরিখেই কঠিন পদক্ষেপ নেয় কিন্তু কিছু কথা তো থেকে যায়।

যাই হোক, মসজিদে গেলে কেমন যেন দিল টা খা খা করে ওঠে। প্রাণহীণ লাগে। এইটুকু জীবনে প্রথমবার এমন করুণ অভিজ্ঞা লাভ করছি। আমরা প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করি- তিনি আমাদেরকে এর থেকে মুক্তি দেন।

শরীয়তপুরের গোসাইরহাটস্থ তৃণমূলের একজন ইমাম সাহেব (মাওলানা আল আমিন) জানালেন, গ্রামের কিছু কিছু মসজিদে স্থানীয় ‍মুসল্লিরা নিয়মিত নামাজ পড়তে আসেন। আজকেও জুম’আ পড়তে এসেছিলেন।

‘সরকারি নির্দেশনা মানছেন না মুসুল্লিরা, কিন্তু কেন?’ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে গ্রামে মসজিদগুলো শহরের মতো তালাবদ্ধা করে রাখা হয় না। এটা উচিতও না। হ্যাঁ, আমরা লোকজনদেরকে সরকারি নির্দেশনা জানিয়ে দিয়েছি কিন্তু মুসুল্লিরা আসলে তো বের করে দিতে পারি না। আল্লাহর ঘর থেকে কাউকে বের করে দেয়ার অধিকারও আমাদের নেই বলে মনে করি।

তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক দেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে সত্যিই কারো মন ভালো নেই। বিশেষ করে মসজিদে আসতে না পারাটা অত্যান্ত বেদনাদায়ক। যদিও সংখ্যায় কিছুটা কম, তবুও আমাদের মসজিদে মুসুল্লি ছিলো কিন্তু আগের মতো সেই প্রাণ নেই। নামাজে, মুসুল্লিদের মনে, কোথাও কোনো  প্রাণচাঞ্চল্য নেই।

মসজিদে যেতে না পারা রাজধানীর এক মুসুল্লি শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি ঘরেই নামাজ পড়েছেন। একা একাই জোহর নামাজ পড়েছেন তিনি। মসজিদে যেতে না পারা নিয়ে কিছুটা ক্ষোভও প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাজারে যাচ্ছি, ব্যাংকে যাচ্ছি, গার্মেন্টসে শ্রমিকরা কাজ করছে। অথচ সেখানে সবাই কমবেশি অসতর্ক। অন্যদিকে মসজিদে যারাই নামাজের জন্য যায়- অবশ্যই অবশ্যই তারা অযু করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। অথচ কেউ মসজিদে প্রবেশ করতে পারছে না। ‘এটা এক প্রকার তামাশা মনে হচ্ছে’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তরুণ আলেম ও সংবাদকর্মী মাহিন মুহসিনের দাবি সামজিক দূরত্ব বাস্তবায়নে সরকারি নির্দেশনা সবক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। কিন্তু মসজিদের বেলায় আগ বাড়িয়ে কঠোরতা দেখা যায়। কিন্তু মসজিদের পরিবেশ, মুসুল্লিদের সচেতনতার কথা ভেবে মসজিদে একেবারে উন্মুক্ত না হলেও নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতা রাখা যায়। এবং সেটা করা উচিত।

শনিরআখড়া এলাকার এক মসজিদের খতিব মাওলানা মুফতী মোহাইমিনুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বলেন, এই রমযানের প্রথম জুম’আ শুধু নিরানন্দই না, চরম বেদনাদায়কও বটে। শুধু মাত্র জুমআ নয়, পুরো রমযান এবং প্রত্যেক নামাজের সময়টা মুমিন হৃদয়ে চরমভাবে আঘাত করে। আমরা এই সময় থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহ তাআল দরবারে প্রার্থনা করি।

খতিব সাহেবের কন্ঠেও কিছু আক্ষেপ শোনা যায়। তিনি জানান, ইচ্ছে না থাকা সত্তেও মসজিদের গেট আটকে রাখতে হয়। কেউ কোনো নির্দেশনা না দিলেও এটা করতে হয়। বুকটা ফেটে যায় কষ্টে। কিন্তু উপায় নেই কোনো।

তিনি বলেন, আমার মনে হয় না, আর কোথাও এরকম কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা হয়। আমরাও পারি না। গেট খুলে রাখলে মুসুল্লিরা আসলে পড়ে তারাও আবার পরবর্তীতে বিড়ম্বনায় পড়বেন। আমরা চাই না কাউকে বিড়ম্বনায় ফেলতে।

তবে যাই হোক, আমরা অন্য কিছুর সাথে তুলনা করে মসজিদ আমভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলবো না। আমরা বলবো সর্বক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। সেই সাথে মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করা হোক। রাষ্ট্র চাইলে এটা কোনো কঠিন কাজ নয়।

/এসএস

মন্তব্য করুন