লকডাউনের এক রাত

প্রকাশিত: ২:৩৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০২০

কুকুরগুলো পেছন পেছন আসছিলো। হাতে ১৪ প্যাকেট রুটি আমার। পকেটে ১২০ টাকাই ছিলো। ১২ প্যাকেটের বেশি কিনতে পারিনি। দুই প্যাকেট দোকানী ফ্রি দিছেন। কুকুর প্রায় ৩০ টা। প্রথমে দুইটা ছিলো। কিভাবে যেন ওরা দুইটা ডাক দিয়েই বাকিদের জড়ো করে ফেলেছে। একটু উচু জায়গায় দাড়িয়ে কুকুরগুলোকে রুটি ছিড়ে ছিড়ে দিচ্ছিলাম আর সুনসান নিরব বাজারটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে মনে হলো চোখ ভারি হয়ে আসছে। এমন দৃশ্যে বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকা মুশকিল।

সুনসান নিরব বাজারটাতে গিয়ে কলিজাটা যেন হু হু করে উঠলো। চিরচেনা এই বাজারে রাত ৯ টায় এমন রুপ আর দেখিনি আমি। এমন দিনে বাজার থেকে বাসায় যেতাম রাত কমপক্ষে ১২ টায়। বাড়িতে থাকাকালীন প্রতিদিন ইফতার হতো কোন না কোন উপলক্ষ আয়োজনে। তারাবী পড়তাম মসজিদে। মাঝে মাঝে। ৮/২০/১২/৪ রাকায়াত। ইচ্ছামত। এরপরই জেলা পরিষদ মার্কেট বা ফ্যাসন স্কয়ারে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গল্প উল্লাসে মেতে উঠতাম আমরা। ঈদের পরিকল্পনা। ব্যাচের ইফতার কবে করবো এসব নিয়ে গল্প আর চিন্তার ভাগাভাগি হতো। অথচ সেই স্কয়ারটুকু ঘুরতে আজ গা ছমছম করে উঠেছে আমার। একটা মানুষ কোথাও নেই। ভয় হচ্ছিলো কেউ পেছন থেকে এসে খামচি মেরে ধরে কি না। কোন অশরীরি এখানে বাসা বেঁধেছে কি না। ছমছমে এক পরিবেশ এখানে এখন।

স্কয়ারের চির পরিচিত চায়ের দোকানগুলো বন্ধ। মেঘনাথ দা সেলুন খুলেননি। আল আমিন বাজারে এসে ফোন দিয়ে বলেনি_ হাছিব, কই তুমি? সান আজ হোন্ডা নিয়ে আসেনি। হামিমও স্কয়ারে নেই। নেই নাদিম, মাহবুব, নীল কেহই। চলছে না স্কয়ারের বিশাল পর্দার টিভিটাও। জ্যাকব টাওয়ারের লাল নীল বাতিগুলোও বন্ধ। টিমটিম করে টাওয়ারের উপরের একটা বাতি জ্বলছে আর শেখ রাসেল বিনোদন পার্কের রঙ্গীন বাতি আলো ছড়াচ্ছে শুধু। কোন মানুষের ছিটেফোটাও নেই এই গমগমে জায়গাটাতে।

এমনদিনে এই দৃশ্য স্বপ্নেও কল্পনা ছিলো না কোনোদিন।

লকডাউনের পর থেকেই সন্ধ্যার পর বাজারে খুব একটা যাই না। একটা রুটিনে জীবন বেঁধে ফেলেছি। বাসা, রুম, ছাদ আর মাঝে মাঝে খামারে। এই জীবন। প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাসাতেই থাকছি। প্রথম প্রথম কয়েকদিন একটু একটু বের হলেও এখন আর তাও হচ্ছি না। প্রিয় সব বন্ধুদের সাথে খুব একটা যোগাযোগও হচ্ছে না। অথচ কত কাছাকাছি বসবাস আমাদের।

আজকে মন চাইলো চিরচেনা সেই খাসমহল মসজিদে যাই একটু। কয়েক রাকায়াত তারাবী পড়ে আসি। বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই মনটা হু হু করে উঠছে একটা অজানা কষ্টে। এই বাজারের এমন রুপ রাত ৮ টায়। কিভাবে সম্ভব? পুরো জনতা রোডটা হেটে এসেছি একজন মানুষ চোখে পড়েনি। একটা ট্রাকের সামনে বসে একজন ড্রাইভার গান শুনছে কেবল।

ডাক দিলাম।

বললাম, চলেন মসজিদে যাই। উনি গান বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ হয়ে গেলেন।

আমি সামনে বাড়লাম।

সদর রোডে গিয়ে দেখি দুটো দোকান খোলা। মেডিসিনের। আর সব বন্ধ। রাস্তার মাঝে, সাইডে কুকুরগুলো শুয়ে আছে। হালকা আলোতে ওদের চোখের দিকে তাঁকিয়েই বুঝলাম চরম ক্ষুধার্ত ওরা। আফসোস হলো। টাকা নিয়ে বের হলাম না কেন। খুঁজে টুজে পকেটে ১২০ টাকা পেলাম। তখনই চিন্তা করে রেখেছিলাম নামাজ পড়ে বের হয়েই ওদেরকে ১২০ টাকার রুটি খাইয়ে দেবো।

নামাজ পড়ে বের হয়েই চিন্তা করলাম রুটি কোথা পাবো? আগের বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি একটা দোকান একটুখানি খোলা। রুটি আছে কিনা জিগেশ করার পর বললো; আছে, তবে ডেট অভার! খেতে পারবেন না।

বললাম ; কুকুরকে খাওয়াবো।

উনি অবাক ভাবে তাকালেন। কিছু না বলে চাহিদামত রুটির প্যাকেট দিলেন। দুই প্যাকেট বেশিও দিলেন।

১০ প্যাকেট ছিড়ে ছিড়ে খাইয়ে চার প্যাকেট একসাথে রেখে দিয়ে আমি হুট করে চলে এলাম। ওই চার প্যাকেট খেতে খেতে আমি কুকুরের চক্ষু আড়াল। কারণ এরা ছাড়তো না আমায়। কামড়াতো না এটুকু বিশ্বাস কুকুরের প্রতি আছে কিন্তু প্রায় ৩০ টা কুকুরের জন্য ১৪ প্যাকেট রুটি কিছুই না। তাই ক্ষুধার জ্বালায় তারা আরও চাইতো হয়ত। খাওয়া শেষে ওরা খুঁজবে আমায়। জানি আমি।

পৃথিবী এক ভয়ানক সময় পার করছে। জানি আমরা সবাই। কিন্তু এই সময়ের গল্গগুলো আরও ভয়ানক। নির্মম। এই বাজারে এমন দোকানী আছে শত শত যারা একদিন বিক্রি-বাট্টা না হলে চুলায় আগুন জ্বলে না। তারা এখন অনেকটাই হাত পাতে গোপনে। চোখের পানি ঝড়ায় নিরবে।

শক্তি নেই, সামর্থ্য নেই কারো কিছু করার। একজন মহাপরাক্রমশালী যে আছেন এবং তাঁর কাছে আমরা সবাই অসহায় তা খুব সহজে বুঝে যাওয়ার কথা এই মুহুর্তে আমাদের। তিনিই আমাদের বাঁচাতে পারেন। তিনিই আমাদের রক্ষা করতে পারেন।

পৃথিবী এক অবশেষ পর্যায়ে চলে এসেছে হয়ত। আমরাই নিয়ে এসেছি। এখন অন্তত অবশেষের সময়গুলো ভালো হয়ে উঠুক। প্রভুর দরবারে ফিরে যাক সবার আন্তরাত্মা। এটাই কামনা এই নিরব নিস্তব্ধ পৃথিবীর অধিবাসীদের কাছে। মহান আল্লাহ তায়ালাই আমাদের রক্ষাকর্তা। তিনিই আমাদের রক্ষা করতে পারেন।

লকডাউনের এক রাত/২৮ এপ্রিল, ২০২০

মন্তব্য করুন