বাংলাদেশে তারাবী নামাজ : তিন আলেমের মতামত-প্রস্তাবনা

প্রকাশিত: ৮:০৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২০

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ৬ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক নির্দেশনা মোতাবেক দেশের সকল মসজিদ অঘোষিত লকডাউন করে দিয়ে এবং সীমিত জামাতে নামাজ আদায় হচ্ছে।

এ নিয়ে ওলামায়ে কেরামদের মধ্যেও পক্ষে-বিপক্ষে বেশ আলোচনা হয়েছে। কেউ সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে বললেও উলামায়ে কেরামদের অনেকেই মসজিদ উন্মুক্ত করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। উভয় পক্ষ থেকে মিডিয়াতেও একের পর এক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।

এর মধ্যেই আসন্ন রমজান মাসে তারাবী নামাজ এবং রমজানের ইবাদতের জন্য মসজিদ খোলা থাকবে নাকি সীমিত থাকবে তা নিয়ে জনসাধারণের মাঝে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আহবান জানিয়েছিলেন আসন্ন রমজানে সবাইকে ঘরে তারাবী  নামাজ পড়ার জন্য। এই পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ দেশের তিনজন প্রথম সারীর আলেমদের সাথে আলোচনা করে তাদের মতামত-প্রস্তাবনা প্রকাশ করেছে।

পত্রিকার প্রিন্ট ভার্সনে আজ এই তিন আলেমের মতামত প্রকাশ করা হয়েছে পাবলিক ভয়েসের পাঠকদের জন্য তাদের মতামত সমূহ এখানে তুলে ধরা হলো।

মসজিদে তারাবিহ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর ও চরমোনাইর পীর মুফতী সৈয়দ রেজাউল করীম বলেন-

মুসলমানদের জন্য রমজানে মসজিদে তারাবীর জামাত যেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তেমন বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ইসলামী শরিয়তে কোরআন ও হাদীসের পরে ওলামায়ে কেরামের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের গুরুত্ব সর্বাধিক।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের প্রস্তাব হলো, দেশের পাঁচজন দীনদার নামাজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং শীর্ষ আলেমদের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করুক। বাংলাদেশের আলেমরা অবিবেচক নন। বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে সরকার কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা না নিলে, অবশ্যই বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছা যাবে।

তিনি বলেন, দুঃখজনক বিষয় হলো, ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসনের একটি অতি উৎসাহী অংশ উসকানিমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করে ধর্মপ্রাণ মানুষকে উত্তেজিত করে তুলছে। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনদের হয়রানি করছে, গ্রেফতার করছে এবং মসজিদে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে এবং এসব কারা করে তা খুঁজে বের করতে হবে।

ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের প্রধান ইমাম প্রদেশের অন্যতম শীর্ষ আলেম আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ এ বিষয়ে বলেন-

‘বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসল্লিদের মসজিদের পরিবর্তে ঘরেই তারাবি নামাজ পড়া উত্তম। তাহলে প্রাণঘাতী করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে না। নিজে রক্ষা পাবে, অন্যরাও।’ তিনি বলেন, ‘শরীয়তের দৃষ্টিতে তারাবী মসজিদে জামাতে পড়া জরুরি নয়। বরং ঘরে পড়া বেশি সওয়াবের।

একা পড়তে পারলে আরও ভালো হয়। একসময় আমাদের অনেক জ্ঞানীগুণীকে দেখেছি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মসজিদে জামাতে এশার ফরজ নামাজ শেষ করে বাসায় ফিরে তারাবী পড়তেন। কিন্তু আমাদের যুগে অসুবিধা হলো, ঘরে ঘরে কোরআনে হাফেজ নেই। কোরআন শরিফও আমরা ঠিকমতো পড়তে পারি না। এ কারণে সবাই মসজিদে জামাতে নামাজ পড়তে চায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মসজিদে যাওয়া ঠিক হবে না।

’তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আগামী সোমবার সারা দেশে রোজা রাখা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি জানান, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোমবার রোজা রাখতেন।

এ বিষয়ে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতী ফয়জুল্লাহ বলেন-

দেশে মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরকার যে দিকনির্দেশনা দিয়েছে তা মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আমি এর সঙ্গে একমত। একইভাবে ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের সিদ্ধান্ত আমাদের মেনে চলতে হবে। এ কঠিন মুহূর্তে মুসলিমদের মসজিদে যাওয়া-না যাওয়ার বিষয়ে গত সোমবার দেওবন্দের পক্ষ থেকে জারি করা এক ফতোয়ায় দেশের মুসলিমদের প্রতি এক নির্দেশনায় বলা হয়, করোনাভাইরাস থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে সরকার যে লকডাউন জারি করেছে সেগুলো মেনে চলে দেশকে এ মহামারী থেকে বাঁচাতে সহযোগিতা করা আমাদের কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে নিজেরাও সতর্ক থাকবেন ও অন্যদেরও সতর্ক থাকতে বলবেন।

তিনি বুখারী শরীফের হাদীস উল্লেখ করে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহুি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ‘আমার জন্য পুরো পৃথিবীকেই মসজিদ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ । কাজেই প্রতিটি ঘর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষ্যানুসারে প্রয়োজনে মসজিদ হতে পারে।

তিনি বলেন, তারাবী নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। অনিবার্য কারণে অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মতো তারাবী নামাজের বিষয়েও আলেমওলামাদের সঙ্গে কথা বলে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে অনিবার্য কারণে বরকতময় তারাবী যদি ঘরে পড়তে হয় তবে তা কবুলের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদ : 

মসজিদে নামাজ নিয়ে সরকারকে আলেমদের সর্বসম্মত ৪ পরামর্শ

রমজানে তারাবীহর জন্য মসজিদ খুলে দিলো পাকিস্তান

করোনা পরিস্থিতি তারাবী নামাজ ঘরে পড়ুন : আরশাদ মাদানী

তারাবী ও ঈদের নামাজ বাড়িতে পড়া উচিত: সৌদির প্রধান মুফতী

মসজিদ নয়, রমজানে তারাবীহ ঘরেই পড়বো: আল্লামা ফজলুর রহমান

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস 

মন্তব্য করুন