বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কবলে বরকতময় শবে বরাত

প্রকাশিত: ৭:৩২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২০
বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ির শবে বরাত। ছবি : পাবলিক ভয়েস

পরিচয় :- শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রটির নাম ‘শবে বরাত’। শবে বরাত বা ﺷﺐ ﺑﺮﺍﺀﺓ শব্দ দুটি আরবী ও ফার্সি থেকে এসেছে। ﺷﺐ- ফাসি আর ﺑﺮﺍﺀﺓ আরবী শব্দ। ﺑﺮﺍﺀﺓ এর শুদ্ধ উচ্চারণ বারাআত। বাংলায় আমরা বরাত বলে থাকি । শব্দ দুটির একত্রে আরবীতে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিশব্দ নেই, তবে এর সময় নির্দিষ্ট।

হাদীস শরীফে বর্ণিত ليلة اﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎن- দ্বারা যেই রাত্রি উদ্দেশ্য শবে বারাআত দ্বারাও সেই একই রাত্রি উদ্দেশ্য। ﺷﺐ শব্দের অর্থ রাত বা রজনী ﺑﺮﺍﺀﺓ শব্দের অর্থ নাজাত বা মুক্তি। অপরদিকে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন ليلة اﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎن এর রাত্রিতে গোনাহগার বান্দাদেরকে নাজাত বা মুক্তি দেন। এজন্যই এই রাত্রিকে নাজাতের রাত্রি বা শবে বারাআত তথা শবে বরাত বলা হয়।

বাড়াবাড়ি ও বিশ্লেষণ :-
একটা সময় শবে বরাত নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি শুরু হয় যা অদ্যবদি পর্যন্ত চলছে। শবে বরাত এলে ঘরে ঘরে নাস্তা শিন্নি বানানোর বাধ্যতামূলক হিড়িক, মসজিদে মসজিদে লাল-নীল রঙের বাতি প্রজ্বলন থেকে শুরু করে নানা কর্মকাণ্ড চলে বরাত উদযাপনকে ঘিরে।

নফল ইবাদাতের বিভিন্নরকম বাধ্যতামূলক মনে করা তরিকা, বিশেষ উদযাপন উপলক্ষ্যে মিলাদ-কিয়াম, নামাজের ফাঁকে কিংবা অন্যসময় নির্দিষ্টকরণ যিকির-আযকারও রয়েছে এই তালিকায়।

আর ইদানিংকালে কিছু কিছু কুপমুন্ডুক প্রচন্ড রকম ছাড়াছাড়ি আরম্ভ করে দিয়েছে। বাড়াবাড়ি পর্যায়ের বন্ধুগন অনেকটা তর্কের খাতিরে পবিত্র কুরআনে কারীমে বর্ণিত ‘‘ﺇِﻧَّﺎ ﺃَﻧْﺰَﻟْﻨﺎﻩُ ﻓِﻲ ﻟَﻴْﻠَﺔٍ ﻣُﺒﺎﺭَﻛَﺔ -অর্থ: নিশ্চয়ই আমি এই কুরআন নাযিল করেছি এক বরকতময় রজনীতে’’। এই আয়াতের ليلة مباركة দ্বারা বরকতময় রজনী হিসেবে শবে বরাতকে উদ্দেশ্য নেয়। কিন্তু এর আসল বাস্তবতা হল ভিন্ন।

কেননা পবিত্র কুরআনের তাফসীরের কয়েকটি মুলনীতির মধ্যে প্রথম এবং প্রধান হলো تفسير القران با القران অর্থাৎ কুরআনের তাফসীরের জন্য প্রথম অনুসরণীয় কুরআন। অর্থাৎ কুরআনের তাফসীর প্রথমে কুরআন দিয়েই শুরু করতে হবে। সুতরাং আমাদের শুরুতেই দেখতে হবে ليلة مباركة দ্বারা পবিত্র কুরআন তথা আল্লাহ তাআলা কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন ৷

পবিত্র কুরআনের ত্রিশতম পারায় সূরাহ ক্বদরে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘ان انزلنه في ليلة القدر -নিশ্চয়ই এই আমি কুরআন নাযিল করেছি ক্বদরের রাত্রিতে’’। সুতরাং বুঝা গেলো কুরআন নাযিলের রাত্রি ليلة مباركة দ্বারা ليلة القدر উদ্দেশ্য। আর অধিকাংশ মুফাসিরে কেরামের অভিমত এটাই (ইবনে কাসীর, মাআরেফুল কুরআন)।

  • কুরআনে মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে একাধিকবার ليلة مباركة শব্দটি এসেছে যার তাফসীরে মুফাসসিরগন কখনো কখনো শবে বরাত উদ্দেশ্য নিয়েছেন। তবে এব্যাপারে পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। প্রশ্ন হতে পারে তাহলে কি শবে বরাতের কোনো ভিত্তি নেই? হ্যাঁ অবশ্যই আছে।

ইসলামী শরীয়তের প্রথম এবং প্রধান উৎস পবিত্র কুরআনে কারীমের পর দ্বিতীয় প্রধান উৎস হল রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ। সুন্নাহ হলো রাসূল সা. এর আমল, অনুমোদন এবং নির্দেশনা। আর শবে বরাতের ব্যাপারে হাদীস শরীফে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়।

যেমন :-
১. মাআজ ইবনে জাবাল রা. হতে বর্ণিত হাদীস:-

ﻋَﻦْ ﻣُﻌَﺎﺫِ ﺑْﻦِ ﺟَﺒَﻞٍ، ﻋَﻦِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻗَﺎﻝَ : ﻳَﻄْﻠُﻊُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺇِﻟَﻰ ﺧَﻠْﻘِﻪِ ﻓِﻲ ﻟَﻴْﻠَﺔِ ﺍﻟﻨِّﺼْﻒِ ﻣِﻦْ ﺷَﻌْﺒَﺎﻥَ ﻓَﻴَﻐْﻔِﺮُ ﻟِﺠَﻤِﻴﻊِ ﺧَﻠْﻘِﻪِ ﺇِﻟَّﺎ ﻟِﻤُﺸْﺮِﻙٍ ﺃَﻭْ ﻣُﺸَﺎﺣِﻦٍ

অর্থ : হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শা’বানের রাতে (শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতিত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।

সহীহ ইবনে হিব্বান-১২/৪৮১, হাদীস-৫৬৬৫, কিতাবুস সুন্নাহ-১/২২৪, হাদীস-৫১২, আল ইহসান-৭/৪৭, মাওয়ারিদুযযামআন-৪৮৬, হাদীস-১৯৮০, মাজমাউ যাওয়াইদ-৮/৬৫, সিলসিলাতুস সহীহা-৩/১৩৫, হাদীস-১১৪৪, শোয়াবুল ঈমান-৩/৩৮২, হাদীস-৩৮৩৩, আল মু’জামুল কাবীর-২০/১০৮,১০৯,আততারগীব-২/২৪২ ইত্যাদিসহ অসংখ্য কিতাবে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।

২. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. এর হাদীস:-
عن عبد الله بن ﻋﻤﺮﻭ، ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ – ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ علي ﻭﺳﻠﻢ – ﻗﺎﻝ : ﻳﻄَّﻠﻊُ ﺍﻟﻠﻪ ﻋَﺰَّ ﻭَﺟَﻞَّ ﺇﻟﻲ ﺧﻠﻘﻪ ﻟﻴﻠﺔَ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ، ﻓﻴﻐﻔﺮ ﻟﻌﺒﺎﺩﻩ، ﺇﻻ ﻻﺛﻨﻴﻦ : ﻣﺸﺎﺣﻦٍ، ﻭﻗﺎﺗِﻞِ ﻧﻔﺲٍ

অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ১৫ই শা’বানের রাত্রে আল্লাহ পাক তার বান্দাদের ক্ষমা করে দেন দুই ব্যক্তি ছাড়া। এক. পরশ্রীকাতর। দুই. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারী।

মুসলিম-১/৪৩৫, হাদীস-৬২৪, মুসনাদে আহমদ-৬/১৯৭, হাদীস-৬৬৪২, মাজমাউস জাওয়ায়েদ-৮/৬৫, হাদীস-১২৯৬১, আত তারগীব ওয়াত তারহীব লিল মুনজেরী-৩/৩০৮, হাদীস-৪৮৯২, ইত্যাদি।

৩· হযরত আবূ সা’লাবা রা. এর হাদীস:-
ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﺛَﻌْﻠَﺒَﺔَ ﺍﻟْﺨُﺸَﻨِﻲِّ، ﻋَﻦِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ
ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ، ﻗَﺎﻝَ : ” ﺇِﺫَﺍ ﻛَﺎﻥَ ﻟَﻴْﻠَﺔُ ﺍﻟﻨِّﺼْﻒِ ﻣِﻦْ ﺷَﻌْﺒَﺎﻥَ ﺍﻃَّﻠَﻊَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺇِﻟَﻰ ﺧَﻠْﻘِﻪِ ﻓَﻴَﻐْﻔِﺮُ ﻟِﻠْﻤُﺆْﻣِﻦِ، ﻭَﻳُﻤْﻠِﻲ ﻟِﻠْﻜَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ، ﻭَﻳَﺪَﻉُ ﺃَﻫْﻞَ ﺍﻟْﺤِﻘْﺪِ ﺑِﺤِﻘْﺪِﻫِﻢْ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺪَﻋُﻮﻩُ

অর্থ : হযরত আবূ সা’লাবা রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ১৫ই শা’বানের রাতে আল্লাহ পাক বান্দাদের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং মু’মিন বান্দাদের ক্ষমা করে দেন। অপরদিকে পরস্পর হিংসা বিদ্বেষপোষণকারীদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেন। অর্থাৎ যতক্ষণ না তারা তা থেকে বিরত হয়ে তওবা করতঃ ক্ষমা প্রার্থনা না করে।

শোয়াবুল ঈমান-৫/৩৫৯, হাদীস-৩৫৫১, কিতাবুস সুন্নাহ-১/২২৩, হাদীস-৫১১, আসসিলসিলাতুস সহীহাহ-৩/১৩৬, হাদীস-১১৪৪, আল মুজামুল কাবীর লিত তাবরানী-২০/ ২২৩, হাদীস-৫৯০, আননুযুল দি দারে কুতনী-১৫৯, হাদীস-৭৮ ইত্যাদি সহ অসংখ্য কিতাবে হাদীসটি উল্লেখ রয়েছে।

ছাড়াছাড়ি ও সমাধান :-
ইদানিংকালে কেউ কেউ বলে বেড়াচ্ছে কুরআন ও হাদীসে শবে বরাতের কোনো ভিত্তি নেই। তাদের দাবি কুরআন শরীফে কোনো স্পষ্ট বর্ণনা নেই এবং সহীহ হাদীসেও কোনো স্পষ্ট ধারনা নেই। যেই সমস্ত হাদীসগুলো শবে বরাতের ফযিলত হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে সেগুলো দূর্বল। সুতরাং শবে বরাত পালনীয় বেদাআত। এমনকি মারাত্বক গোনাহের কাজও বটে।

যেই সমস্ত ভাই ও বন্ধুগন- শবে বরাতের ফযিলত সম্পর্কিত হাদীসগুলোকে জয়ীফ বলে শবে বরাতকে অস্বীকার করেন তাদের জ্ঞাতার্থে উপরোল্লিখিত হাদীসগুলোর মান যাচাই করে হাদীস বিশারদগণ কী বলেছেন সেটা উল্লেখ্য করে আলোচনা শেষ করবো ইনশাআল্লাহ।

১. মুআজ ইবনে জাবাল রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদিস সম্পর্কে ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.-৩৫৪) বলেন, হাদীসটি সহীহ। সহীহ ইবনে হিব্বান-১২/৪৮১, হাদীস-৫৬৬৫।

শবে বরাত অস্বীকারকারী আহলে হাদীস দাবীদারদের ভাবগুরু শায়খ নাসীর উদ্দীন আলবানী (১৪২০হিঃ) রহ. বলেন:-

ﻳﻄﻠﻊ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﺒﺎﺭﻙ ﻭﺗﻌﺎﻟﻰ ﺇﻟﻰ ﺧﻠﻘﻪ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ، ﻓﻴﻐﻔﺮ ﻟﺠﻤﻴﻊ ﺧﻠﻘﻪ ﺇﻻ ﻟﻤﺸﺮﻙ ﺃﻭ ﻣﺸﺎﺣﻦ .” ﺣﺪﻳﺚ ﺻﺤﻴﺢ، ﺭﻭﻱ ﻋﻦ ﺟﻤﺎﻋﺔ ﻣﻦ ﺍﻟﺼﺤﺎﺑﺔ ﻣﻦ ﻃﺮﻕ ﻣﺨﺘﻠﻔﺔ ﻳﺸﺪ ﺑﻌﻀﻬﺎ ﺑﻌﻀﺎ ﻭﻫﻢ ﻣﻌﺎﺫ ﺍﺑﻦ ﺟﺒﻞ ﻭﺃﺑﻮ ﺛﻌﻠﺒﺔ ﺍﻟﺨﺸﻨﻲ ﻭﻋﺒﺪ ﺍﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﻋﻤﺮﻭ ﻭﺃﺑﻲ ﻣﻮﺳﻰ ﺍﻷﺷﻌﺮﻱ ﻭﺃﺑﻲ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﻭﺃﺑﻲ ﺑﻜﺮ ﺍﻟﺼﺪﻳﻖ ﻭﻋﻮﻑ ﺍﺑﻦ ﻣﺎﻟﻚ ﻭﻋﺎﺋﺸﺔ

উক্ত হাদীসটি সহীহ, যা সাহাবায়ে কেরাম রা. এর এক বড় জামাত বর্ণনা করেছেন এবং একটি হাদীস অন্য হাদীস এর সনদকে আরো মজবুত করে তোলে। সাহাবীদের থেকে বর্ণনাকারীগণ হলেন (০১) হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. (০২) আবূ সালাবা আল খাসানী রা. (০৩) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (০৪) আবূ মূসা আল আশআরী রা. (০৫) আবূ হুরায়রা রা. (০৬) আবূ বকর সিদ্দীক রা. (০৭) আউফ ইবনে মালেক রা. (০৮) হযরত আয়েশা রা.। সিলসিলাতুস সহীহা-৩/১৩৫, হাদীস-১১৪৪।

আল্লামা মুনজেরী রহ. (৬৫৬ হি.) বলেন উক্ত হাদীসটি সহীহ। আত তারগীব ওয়াত তারহীব-২/৭৩, হাদীস-১৫৪৬।

আল্লামা হায়সামী রহ. (৮০৭ হি.) বলেন- ﻣﺠﻤﻊ ﺍﻟﺰﻭﺍﺋﺪ ﻭﻣﻨﺒﻊ ﺍﻟﻔﻮﺍﺋﺪ ﺭَﻭَﺍﻩُ ﺍﻟﻄَّﺒَﺮَﺍﻧِﻲُّ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻜَﺒِﻴﺮِ ﻭَﺍﻟْﺄَﻭْﺳَﻂِ ﻭَﺭِﺟَﺎﻟُﻬُﻤَﺎ ﺛِﻘَﺎﺕٌ

এছাড়াও আলোচিত হাদীসটি ইমাম তাবরানী তার মু’জামুল কাবীর ও আওসাতে সংকলন করেছেন, এবং সংকলিত হাদীস এর সকল বর্ণনাকারীকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। মাজমাউজ যাওয়ায়েদ-৮/৬৫, হাদীস-১২৯৬০।

২. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি স্বয়ং ইমাম মুসলিম রহ. তার সহীহ মুসলিমে উল্লেখ্য করেছেন (মুসলিম হাদীস নং ৬২৪) মুসলিম শরীফের সকল হাদীস সহীহ এতে কোনো সন্দেহ নেই, কারো দ্বিমতও নেই।

এছাড়াও আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ., ইমাম আবূ হাফস ওমর ইবনে শাহিন রহ., আহমদ ইবনে সালেহ আল মিসরী রহ., উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারীকে সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব আল মিসরী, ইমাম আব্দুর রহমান ইবনে ইউসূফ ইবনে খেরাশ রহ., হফেজ যাহাবী, আল্লামা হায়সামী রহ. প্রমুখ হাদীস বিশারদগণও হাদীসটিকে হাসান বলে মন্তব্য করেছেন।

৩. সালাবা রাঃ কর্তৃক বর্ণিত হাদিসটি সহীহ হওয়ার ব্যাপারে ইমাম দারে কুতনী(আত তাহযীব ১/১৬৮) ইমাম আহমদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল ইজলী রহ. ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, ইমাম বুখারী (রহ.) এর উস্তাদ আলী ইবনে মাদানি, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আম্মার আল মাওসেলী রহ. অভিন্ন মত ব্যাক্ত করেছেন।

আলোচানা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় মাত্র তিনটি হাদীস নিয়ে আলোচনা করা হলো। আর শরীয়তে কোনো বিষয় প্রমাণিত হওয়ার জন্য একটি সহীহ হাদীসই যথেষ্ট। যেখানে একটি হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে শবে বরাত বর্জনকারীদের অনুসরণীয় নাসিরুদ্দিন আলবানী সাহেবর মতামত উল্লেখ্য করা হয়েছে।

এছাড়াও তিরমীযি শরীফে হযরত আয়েশা রা. হতে এবং রঈসুল মুহাদ্দিসীন হযরত আবু হুরায়রা রা. হযরত আবু বকর, আলী, আবু মুসা আশআরী আউফ ইবনে মালেক রা. সহ অসংখ্য সাহাবীদের থেকে শবে বরাতের ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে শবে বরাত তথা শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রি বরকতময় এবং ফযিলতপূর্ণ।

এরপরেও যারা ضعيف ضعيف যিকিরের করবেন তাদেরকে স্মরন করিয়ে দিতে চাই ضعيف হাদীসও আল্লাহ রাসূল সা. এর হাদীস। শরীয়তের আহকাম প্রমানের জন্য সহীহ হাদীস শর্ত কিন্ত ফযিলতের জন্য ضعيف হাদীসই যথেষ্ঠ। কেবলমাত্র موضوع তথা বানোয়াট বা জ্বাল হাদীস না হলেই হয়। এ কথাও স্মরনযোগ্য যে, কোনো একটি হাদীস দূর্বল হলে তার সমর্থনে এক বা একাধিক হাদীস পাওয়া গেলে সেটা আর দূর্বল থাকে না বরং সেটিও শক্তিশালী হয়ে যায়। আর শবে বরাতের ব্যাপারে দূর্বল বা ضعيف নয় একাধিক صحيح হাদীসই বিদ্যমান।

ফলাফল: উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা এটা স্পষ্ট প্রতিয়মান হল যে, শবে বরাত তথা শাবানের চৌদ্দতম দিবাগত রাত্র একটি বরকতময় এবং বান্দার জন্য নাজাত ও মুক্তির রাত্রি। সুতরাং এই রাত্রে বেশি বেশি নফল ইবাদাত ও আল্লাহ দরবারে মাগফেরাত কামনা করতে হবে।

এ রাতের আমল কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে আলী রা. থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেমন-

عن علي بن أبي طالب قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم ( إذا كانت ليلة النصف من شعبان فقوموا ليلها وصوموا نهارها . فإن الله ينزل فيها لغروب الشمس إلى سماء الدنيا . فيقول ألا من مستغفر لي فأغفر له ألا من مسترزق فأرزقه ألا مبتلى فأعافيه ألا كذا ألا كذا حتى يطلع الفجر )

হযরত আলী বিন আবু তালীব রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন-যখন শাবান মাসের অর্ধেকের রজনী আসে (শবে বারাআত) তখন তোমরা রাতে নামায পডড়ো, আর দিনের বেলা রোজা রাখো। নিশ্চয় আল্লাহ এ রাতে সূর্য ডুবার সাথে সাথে পৃথিবীর আসমানে এসে বলেন-কোনো গোনাহ ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি আমার কাছে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। কোনো রিজিকপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দিব। কোনো বিপদগ্রস্থ মুক্তি পেতে চায় কি? আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দিব। আছে কি এমন, আছে কি তেমন? এমন বলতে থাকেন ফজর পর্যন্ত। (সূনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৩৮৮, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৩৮২২)

মূলত, নফল ইবাদাত নির্দিষ্টকরণ না করে তেলাওয়াত, যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলিল, নফল নামাজ ও সর্বোপরি মহান রবের কাছে নিজেকে সমর্পন করে পাপমুক্তি চেয়ে কান্না-রোনাজারি করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দয়া ও রহমত লাভের আশা করা, মাগফেরাত কামনা করা, পাপ থেকে নাজাত চাওয়া এবং যাবতীয় কল্যাণ কামনা করাই এ রাতের করণীয় আমল।

হে রব্বে ক্বাবা আমাদের সকলকে সহীহ বুঝ দান করুন। এবং আমল করার তাওফীক দান করুন।

লেখক: শাহনূর শাহীন
কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মন্তব্য করুন