করোনাভাইরাসে মুহ্যমান বিশ্ব ও ৭০ তম বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

প্রকাশিত: ৭:২৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৭, ২০২০
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ও করোনাভাইরাস। ছবি : পাবলিক ভয়েস

আজ ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার। ৭০ তম বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। শারীরিক সুস্থতার নামই স্বাস্থ্য। সুস্থ স্বাস্থ্য সুখের একটি অনুসঙ্গ। অসুস্থ শরীর যার, তার পক্ষে সুখ লাভ অসম্ভব। স্বাস্থ্য এক অমূল্য সম্পদ।

এ বছরের স্বাস্থ্য দিবসের এই মুহুর্তে মানুষ তার স্বাস্থ্য নিয়ে ভয়ানক এক দুঃসময় পার করছে। পৃথিবী আক্রান্ত হয়েছে করোনাভাইরাস নামে এক ভয়ানক মহামারিতে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশ থেকে সংক্রামন শুরু হয়ে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে।

ইতোমধ্যে প্রায় ১৮৫ টি দেশে আক্রমন করেছে এই নভেল করোনা ভাইরাস। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হিসেবমতে বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ৭৬, ৩৪০ জন মানুষ। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১৩,৬২,১০৫ জন। একই সাথে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ২,৯৩,৬৫৫ জন। (৭ এপ্রিল ২০২০, সন্ধ্যা ৮ টা আপডেট)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বর্তমানে কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসকে মহামারি আকারে ঘোষণা করেছে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের এই দিনে করোনা ভাইরাস প্রতিরক্ষায় কী কী করণীয় আমাদের তা আলোচনা হওয়া উচিত :

করোনার লক্ষণ সমূহ : ১. জ্বর ও কাশি। ২. শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া। ৩. অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া। ৪. ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট।

ভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে যা যা করতে হবে : ১. বেশি বেশি আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করা ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা। ২. ডাক্তারদের পরামর্শ অনুসারে আক্রান্ত ব্যক্তি হতে কমপক্ষে দুই হাত দূরে থাকা। ৩. বারবার প্রয়োজনমতো সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা, বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে কিংবা সংক্রমণস্থলে ভ্রমণ করলে। ৪. জীবিত অথবা মৃত গৃহপালিত/বন্যপ্রাণী থেকে দূরে থাকা। ৫. ভ্রমণকারীগণ আক্রান্ত হলে কাশি শিষ্টাচার অনুশীলন করতে হবে (আক্রান্ত ব্যক্তি হতে দূরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, হাত ধোয়া, যেখানে-সেখানে কফ কাশি না ফেলা)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস :

বিশ্ব স্বস্থ্য দিবসের বিভিন্ন তথ্যাদি ও পরামর্শ নিয়ে পাবলিক ভয়েসে লিখেছেন হিউম্যান রাইটস রিভিউ সোসাইটি কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ডাঃ এম এইচ মাজেদ হোসাইন-

ভাল স্বাস্থ্যই সুস্থ ও সতেজ জীবনের চাবিকাঠি। এ কথা আমরা ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছি। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সাধারণ মানুষের ভাল স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা যেমন দারিদ্র, তেমনই আর একটি প্রধান বাধা সচেতনতার অভাব।

স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতা এমন একটি বিষয়, যার উপর একটি দেশের মানব সম্পদ অনেকাংশে নির্ভরশীল। নাগরিকের সুস্বাস্থ্যের অভাব দেশের উৎপাদনশীলতা কমে, কমে যায় উন্নয়নের গতি। বিশ্ব স্বস্থ্য দিবসের গুরুত্ব এখানেই।

৭-ই এপ্রিলের এ দিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতি বছর সংস্থাটি এমন একটি স্বাস্থ্য ইস্যু বেছে নেয়, যা বিশেষ করে সারা পৃথিবীর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সে দিন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে পালিত হয় এ দিবসটি।

১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রসংঘ অর্থনীতি ও সমাজ পরিষদ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের সম্মেলন ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৬ সালের জুন ও জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাংগঠনিক আইন গৃহীত হয়, ১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রথম সম্মেলনটি হয়েছিল প্রতিষ্ঠার দুই মাসের মাথায়, ১৯৪৮ সালের ২৪ জুন। নির্ধারিত দিনে জেনেভায় সংস্থাটির প্রথম সম্মেলনে ৪৬টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই সংগঠন আইন আনুষ্ঠানিক ভাবে কার্যকর হয়। এই দিন “বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস” বলে নির্ধারিত হয়।

১৯৫০ সাল থেকে নিয়মিত ভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্থার সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে প্রতি বছর যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্যপদ পাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালন করে আসছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোরালোভাবে প্রস্তাব করেছে, পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র অবশ্যই সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নীতি  চালু করবে, যাতে করে বিশ্বের একজন মানুষও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে না থাকে।

প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পেতে গিয়ে বছরে বিভিন্ন দেশে কমপক্ষে এক কোটি মানুষ ১.৯ ডলারের কম উপার্জনক্ষম মানুষের বলয়ে ঢোকে, অর্থাৎ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। গড়ে ৮ কোটি মানুষ তার প্রাত্যহিক মোট খরচের ১২ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যসেবার জন্য খরচ করে। এটি একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। উন্নত দেশগুলোর নাগরিকরা ব্যক্তিগতভাবে অথবা রাষ্ট্রীয় পলিসির কারণে এ স্বাস্থ্যসেবাটুকু নিতে সমর্থ হয়।

কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা- এসব মহাদেশের রাষ্ট্রগুলো বা এদের জনগণ এ সুবিধা দিতে বা পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বলতে সব মানুষের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বোঝায়, যাতে করে তাকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে না হয়। একই সঙ্গে এটি সব মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসাপ্রাপ্তির বিষয়টি বোঝায় না। এটি আসলে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা নীতিকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে উৎসাহ দেয়, যাতে করে যে কোনো রাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে সব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। এখানে স্বাস্থ্যসেবা বলতে শুধু ওষুধ প্রদানকে বোঝায় না।

স্বাস্থ্যসেবা বলতে আরও বোঝায়- ক. সব রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, খ. সম্ভাব্য সব অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা, গ. মৌসুমভিত্তিক সংক্রামক রোগের সময়োচিত প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, ঘ. জীবনব্যাপী সব মানুষের আদর্শ সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সব প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে স্বাস্থ্য বিষয়ক কিছু পরামর্শ :

১. একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা নির্বাচন করুন এবং ধীরে ধীরে সেটার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। ২. শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়াম বা শারীরিক কসরত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিকভাবে কর্মক্ষম এবং সক্রিয় থাকার চেষ্টা করুন। ৩. নানা ধরনের খাবার খান, তবে সেগুলো যেন স্বাস্থ্যকর হয় সেদিকে নজর দিন। অতিরিক্ত ক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবার বর্জন করে চলুন। যাতে অযথা ওজন বেড়ে না যায়।

৪. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ৫. কখনো কোনো খাবার বাদ দিয়ে যাবেন না। সময় মতো প্রাতঃরাশ-মধ্যাহ্নভোজ এবং রাতের খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। উপবাসে শরীরের ক্ষতি হয়। ৬. প্রক্রিয়াজাত এবং প্যাকেটজাত খাবার বর্জন করুন। এর মধ্যে উপকারের থেকে বেশি ক্ষতিকারক উপাদান থাকে।

৭. মৌসুমী সবজি এবং ফল দিনে এক থেকে দু’টো করে খাওয়ার চেষ্টা করুন। ৮. নুন এবং চিনি খাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ রাখুন। এর থেকে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ৯. শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখুন। ১০. দুশ্চিন্তা এবং হতাশাকে দূরে রাখুন। এবং যে কোনও স্ট্রেসফুল পরিস্থিতিকে এড়িয়ে চলুন।

লেখক : ডাঃ মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ। সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য। কো-চেয়ারম্যান হোমিওবিজ্ঞান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ।

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন