তালেবানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ন্যাটো জোটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:৪৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৪, ২০২০

বিশেষ প্রতিবেদন –

আফগান তালেবানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক জোট ন্যাটোর (North Atlantic Treaty Organisation) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ।

১৯৪৯ সালের এই দিনে গঠিত হয় আধুনিকোত্তর সময়ের এই সর্ববৃহত সামরিক জোটটি। প্রায় ৭০ বছরের অধিককাল পার করেছে ইউরোপ আমরিকার সমন্বয়ে গঠিত এই জোট।

এ বছর (২০২০ সাল) ন্যাটো জোটের জন্য একটি ভিন্ন রকম বছর। এ বছরই তারা লিখিত এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের তালেবানের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের রাজধানী দোহায় ‘শান্তিচুক্তির’ আদলে এই পরাজয় স্বীকার করে নিলো মার্কিন আধিপত্যে থাকা এই সামরিক জোট। একই সাথে শর্তহীনভাবে তারা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিতে হয়েছে।

ন্যাটোর প্রতিষ্ঠা : উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো (ইংরেজি: North Atlantic Treaty Organisation বা NATO দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি একটি সামরিক জোট।

ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা প্রদানে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ে অবস্থিত উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই জোটের সদস্য। এছাড়া মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে তুরস্কও এই জোটের প্রভাবশালী সদস্য। তবে ন্যাটো জোটে তুরস্ক অনেকটাই স্বায়ত্বশাসনের মত সুযোগ গ্রহণ করে থাকে।

“জোটের মূল চালিকাশক্তি ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রকে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই ন্যাটোবাহিনীকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ নিয়ে উইকিলিকস একবার বেশ কিছু নথি প্রকাশ করেছিল। বর্তমানে প্রায় ৩০ টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত এই বৃহত্তর সামরিক জোট বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ স্থায়ী ও বৃহত সামরিক জোট হিসেবে পরিচিত। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে প্রধান কার্যালয় অবস্থিত এই সামরিক জোটের।”

প্রাথমিক কার্যক্রম : প্রতিষ্ঠার প্রথম দুই বছর ন্যাটো একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ছিল, কিন্ত কোরিয় যুদ্ধের পর ন্যাটো সদস্যরা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুই জন সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডারের অধীনে একটি সমন্বিত সামরিক কাঠামো গড়ে তোলেন। ন্যাটোর প্রথম মহাসচিব ছিলেন লর্ড ইসমে। তিনি ১৯৪৯ সালে বলেন যে, “এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হল রাশিয়ানদের দূরে রাখা, আমেরিকানদের কাছে আনা এবং জার্মানদের দাবিয়ে রাখা”।

১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হলে ন্যাটো যুগোস্লাভিয়ার দিকে মনোনিবেশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত বসনিয়ায় ন্যাটো মধ্যস্ততামূলক সামরিক অভিযান চালায় এবং পরে ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়ায় অভিযান চালায়। বসনিয়ায় ন্যাটো জোট অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত।

আফগান ইরাক আক্রমনের কলংক : মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের উপর আফগান-ইরাকে অন্যায়ভাবে হামলা করা এবং লাখো সংখ্যার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে।

২০০১ তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তুলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নিয়ন্ত্রণে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের পতন ঘটাতে হামলা চালায়। এরপর আফগানিস্তানে এই ন্যাটো বাহিনী প্রবেশ করে এবং প্রায় ১৮ বছর ধরে তারা আফগানিস্তানকে ধ্বংশ করার দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু তালেবান ও ন্যাটো বাহিনীর এই ১৮ বছরের যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী পরাজিতই হয়েছে। রয়টার্স এক রিপোর্টে লিখেছে, “তালেবান যোদ্ধাদের চাপে রাখতে একদিকে যেমন বিমান হামলা চালাচ্ছিলো ন্যাটো বাহিনী অন্যদিকে তেমন আফগান সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণও দিচ্ছিলো। এতো কিছুর পরও সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের অধরাই রয়ে গেছে।”

তালেবানের এক নেতা ঘোষণা দিয়ে বলেছিলো, মার্কিনিদের সেনা না সরালে সোভিয়েত বাহিনীর পরিণতি হবে: তালেবান

তালেবান যোদ্ধারা বরং গত তিন চার বছর ধরে কাবুল ও জালালাবাদের মতো বড় শহরগুলোতে প্রতিরোধ চালিয়ে গেছে এবং একে একে দখল করে নিয়েছে পুরো আফগান অঞ্চল। নগরকেন্দ্রগুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হলেও আফগানিস্তানের গ্রামীণ এলাকার বড় অংশ তারাই নিয়ন্ত্রণ করে এখন। বিবিসি এক জরিপে জানিয়েছিলো, আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ অঞ্চলে তালেবানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং বাকি অঞ্চলগুলোতে রয়েছে প্রচ্ছন্ন প্রভাব।

আফগান-ন্যাটো শান্তি আলোচনা : ২০১১ সাল থেকেই আফগানিস্তানের সাথে আমেরিকার শান্তি আলোচনার তোড়জোড় শুরু হয়েছিলো। এ লক্ষে মধ্যস্থতা করেছিলো তেলসমৃদ্ধ শান্তিপ্রিয় দেশ কাতার। ২০১১ সালে আফগানিস্তানে শান্তি নিয়ে তালেবান নেতারা কাতারে আসেন। সেখানে ২০১৩ সালে তালেবানের একটি কার্যালয় চালু করা হয়, তবে পতাকা নিয়ে বিরোধে সেই বছরই সেটা বন্ধ করে দেয়া হয়।

গুয়ান্তানামো কারাগারে বন্দি থাকা সেই ৫ তালেবান নেতাও আছেন শান্তি আলোচনায়

পরবর্তিতে ২০১৮ সালে তালেবান বাহিনী ঘোষণা করে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বসবে যাতে শান্তির একটি রোডম্যাপ তৈরি করা যায়। তবে তারা আমেরিকার পুতুল সরকার তথা আফগান সরকারের সঙ্গে কোন আলোচনায় বসতে অস্বীকার করে। এবং ন্যাটো জোটের প্রধান আমেরিকার সাথে আলোচনার জন্য কিছু শর্ত জুড়ে দেয়।

তালেবানের শর্ত অনুযায়ী মার্কিন সেনারা তালেবানের সাথে বৈঠকে বসতে রাজি হয় এবং প্রাথমিকভাবে দু দফা বৈঠকও চালায়। কিন্তু কয়েক দফায় মার্কিন সেনারা তালেবানের সাথে বৈঠক চালালেও তেমন কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌছতে পারেনি তারা। কিন্তু আলোচনার অগ্রগতি হতে থাকে। এই শান্তিচুক্তির মধ্যেও ন্যাটো বাহিনী কয়েকবারই চেষ্টা করে তালেবানের শক্তিমত্তা ভেঙ্গে দিতে। কিন্তু প্রত্যেকবারই তালেবান প্রবলভাবে ন্যাটো বাহিনীকে পর্যদুস্ত করে ছাড়ে এবং বিপুল সংখ্যক ন্যাটো সৈন্য নিহত হয়।

কোন উপায়ন্তর দেখে শেষ পর্যন্ত কাতারের রাজধানী দোহায় নয় দফা আলাপ-আলোচনার পর গত ফেব্রুয়ারীর ২৯ তারিখে তালেবান-ন্যাটোর মধ্যে শান্তিচুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিমতে ২৯ ফেব্রুয়ারীর পর কোন শর্ত ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো সহযোগীরা আফগানিস্তান থেকে আগামী ১৪ মাসের মধ্যে সব সৈন্য সরিয়ে নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়।

বিশ্ব গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুসারে এটি হলো ন্যাটোবাহিনী কেবলমাত্র সম্মানজনক একটি “এক্সিট প্ল্যান”। যে প্ল্যানের আওতায় তারা নিজেদের পরাজয় লুকাতে চাইলেও বাস্তবে তা সম্ভবপর হয়নি।

তালেবান আমেরিকা চুক্তি : বৈশ্বিক জিহাদের ঐতিহাসিক বিজয়

তালেবান আমেরিকা চুক্তি : জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া

আমেরিকা তালেবান চুক্তি : তালেবান প্রধানের বিশেষ বার্তা

তালেবানের সঙ্গে একান্তে বসতে চান ট্রাম্প

ইরাকে ন্যাটো বাহিনীর আগ্রাসন : আফগান হামলার দুই বছর পরই ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য তথা বুশ-ব্লেয়ার মিলে হামলা চালায় ইরাকে। ইরাকের প্রেসিডেন্ট লৌহ মানব সাদ্দাম হোসেনের উপর সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তুলে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী।

তবে ইরাকেও ন্যাটো বাহিনীর পরিস্থিতি কিছুটা আফগানিস্তানের মতই। ইরাকে একটি কার্যকরী সরকার ব্যাবস্থা থাকলেও এখনও ইরাকে ন্যাটো বাহিনীর অবস্থান রয়েছে। কথিত আইএস দমনের দাবি তুলে ন্যাটো বাহিনী এখনও ইরাকে অবস্থান করছে। ন্যাটোর সাবেক প্রধান জেনস স্টলটেনবার্গ বলেছেন ইরাকের অনুরোধের কারণেই দেশটিতে অবস্থান করবে ন্যাটো সেনারা।

স্টলটেনবার্গ বলেন, ইরাকের অনুরোধের কারণেই ন্যাটো বাহিনী সেখানে অবস্থান করছে। ইরাকের আমন্ত্রণ এবং সম্মতি ছাড়া আমরা ইরাকে থাকছি না। যতদিন প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি সময় আমরা ইরাকে থাকব না। আমরা ইরাকের সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি যেন তারা আইএস এর হুমকি মোকাবিলা করতে পারে। আইএস যেন আবার ফিরে না আসতে পারে।

সম্প্রতি ইরাক থেকেও জোড়ালো দাবি উঠেছে ন্যাটো বাহিনীর সরে যাওয়ার। এমনকি ইরাকের পার্লামেন্ট সরকারকে কবে নাগাদ ন্যাটো বাহিনী ইরাক থেকে প্রত্যাহার করা হবে তার একটি সময়সীমা নির্ধারণ করতে বলেছে। পার্লামেন্ট যে সকল দেশ আইএস বিরোধী যুদ্ধে সাহায্য করেছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ইরাকের প্রেসিডেন্ট হায়দার আল আবাদি আইএস বিরোধী যুদ্ধে নিজেদেরকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। তিন বছর আইএস সমর্থকরা ইরাকের এক-তৃতীয়াংশ দখল করে রেখেছিল। ইরাকে অবস্থান করা ন্যাটোর সদস্য সংখ্যা পাঁচ হাজার বলে ধারণা করা হয়।

তবে ইরাক হামলা যে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ছিলো তা যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনেও প্রকাশিত হয়েছে। ইরাকে হামলায় যুক্তরাজ্যের যৌক্তিকতা অনুসন্ধান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সরকারের ভূমিকা তদন্তে স্যার জন চিলকটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২০০৯ সালে গঠিত ওই কমিটি দীর্ঘ সাত বছর পর তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো। স্যার জন চিলকটের নাম অনুসারেই এ প্রতিবেদনকে ‘চিলকট রিপোর্ট’ বলা হয়েছিল।

সোখানে চিলকট লিখেছেন, ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মিলে যুক্তরাজ্য ইরাকে যে হামলা চালিয়েছে, তা কোনো যৌক্তিক বিবেচনার ভিত্তিতে ছিল না।চিলকট রিপোর্টে বলা হয়, অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে এবং বিস্তারিত পরিস্থিতি অনুধাবন ছাড়াই ইরাকে হামলা চালানোর ঘটনা, ব্রিটিশ সৈন্য ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করেছে। সেই সঙ্গে ইরাকসহ ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করেছে। যুক্তরাজ্য ভবিষ্যতে কোনো দেশে হামলা কিংবা বড় ধরনের যুদ্ধে লিপ্ত হতে গেলে এই প্রতিবেদনের প্রাপ্তিগুলো বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে। এছাড়াও সে রিপোর্টে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল এ বিষয়ে।

পরিশিষ্ট : আফগান ইরাকের মত দুটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র ও চেচনিয়া, বসনিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের রক্তে লাল হয়ে আছে ন্যাটোর হাত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সরকারের ক্রিড়নক হয়েই কাজ করছে এই ন্যাটোবাহিনী। তবে এ বাহিনীতে তুরস্কের মত দেশের এখনও থাকার বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলে থাকেন।

প্রতিষ্ঠার এই ৭০ বছরের অধিক সময়কাল পর বিশ্বব্যাপী কোনো সন্ত্রাসবাদের মদদ দেয়ার কাজেই কী বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী সামরিক জোট এই ন্যাটো বাহিনী থাকবে না কি শান্তির বার্তা নিয়ে ফিরবে তা দেখার জন্য অপেক্ষমান আছে বিশ্ব।

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন