নওগাঁয় খাবার না পেয়ে নষ্ট ভাত শুকানো বৃদ্ধার বাড়িতে ডিসি

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি

প্রকাশিত: ৬:১৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৪, ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদক নওগাঁ: ৭০ বছরের বৃদ্ধা সাবিয়া বেগম। থাকেন নওগাঁ শহরের বাঙ্গাবাড়িয়া বিহারি কলোনি মহল্লার ছোট যমুনা নদীর গাইড ওয়াল-সংলগ্ন সরকারি জমিতে। সেখানে ঝুপড়ি ঘরে গত কয়েক বছর ধরে বসবাস করছেন তিনি।

স্বামী নুরু মিয়া মারা গেছেন ২৫ বছর আগে। মেয়ের বয়স যখন আট মাস তখন স্বামী মারা যান। বিভিন্ন জনের বাড়িতে কাজ করে জীবন চলত তার। মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর এখন একা থাকেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর কাজ করতে পারেন না। ভিক্ষা করে দিন চলে তার।

শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) দুপুরে উত্তপ্ত রোদে বিহারি কলোনি মাঠে একটি টিনের ওপর নষ্ট ভাত শুকাচ্ছেন তিনি। এমন দৃশ্য দেখে নওগাঁ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রিয়াজ খান মোবাইলে ছবি তুলে নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেন। বিষয়টি দেখে অনেকেই মর্মাহত হন।

বিষয়টি নজরে আসে জেলা প্রশাসক হারুন অর রশীদের। এরপর তিনি রাতের আঁধারে ওই কলোনির ২৫টি কর্মহীন পরিবারকে ঘর থেকে ডেকে ডেকে ত্রাণসামগ্রী দিয়েছেন। গভীর রাতে এসে ওসব পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিরতণ করেছেন তিনি।

ত্রাণ পেয়ে ভীষণ খুশি বৃদ্ধা সাবিয়া। তিনি বলেন, তাঁর বাড়িতে এখন এক মাসের চাল–ডাল আছে। আপাতত আর খাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না।

সারা দেশের মতো নওগাঁয়ও চলছে অঘোষিত লকডাউন। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দিনমজুরসহ নিম্ন আয়ের মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী দিলেও তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেকেই পাচ্ছেন না। সাবিয়া বেগম ছিলেন ত্রাণ না পওয়াতের দলে। ভিক্ষা করে জীবনধারণ করতেন সাবিয়া।

শুক্রবার সাবিয়া বেগমের ভাত শুকানোর দৃশ্য মোবাইলে ধারণের পর ফেসবুকে পোস্ট করে নওগাঁ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রিয়াজ খান লিখেছেন, ‘ফেসবুকে ঢুকলেই দেখি ওখানে-সেখানে ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে। তবুও আজ এমন দৃশ্য দেখতে হলো।

বৃদ্ধাকে ভাত শুকাতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম কি করবেন এগুলো দিয়ে? উত্তরে বৃদ্ধা বললেন, ‘কাজ নেই, তাই বাজার করতে পারিনি। ঘরে তরকারি নেই, চালও শেষ। তাই নষ্ট হয়ে যাওয়া ভাত শুকাচ্ছি।

ভাত শুকিয়ে চাল হলে আবার রান্না করে খাব। এগুলো নষ্ট ভাত। তবুও এই মুহূর্তে জীবন ধারণের জন্য বিকল্প পথ নেই। বাঁচতে হলে এগুলোতেই খেতে হবে। কারণ কেউ আমাদের ত্রাণ দেয় না’।

রিয়াজ খান আরো লিখেছেন, যারা ত্রাণ বা বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী বিতরণে নিয়োজিত আছেন তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেছি; আপনারা এই অসহায় মানুষটার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন।

রাতে বৃদ্ধার বাড়িতে গিয়ে খাবার পৌঁছে দেন ডিসি হারুন অর রশিদ

বৃদ্ধা সাবিয়া বেগম জানান, গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে এক প্রতিবেশী ভাত দিয়েছেন। রাতে কিছু খেয়ে রেখে দিয়েছি। সকালে দেখি ভাত নষ্ট হয়ে গেছে। ওই নষ্ট ভাত পানিতে পরিষ্কার করে রোদে শুকাতে দিয়েছি। ভাত শুকিয়ে চাল হলে পরে রান্না করে খাব। গত কয়েকদিন থেকে ঘরে বাইরে যেতে পারিনি। ঘরে কোনো খাবার নেই আমার। খুব কষ্ট করে চলছি। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।

শুধু সাবিয়া বেগম নন, ওই কলোনির প্রায় ২০-২৫টি পরিবারের একই অবস্থায় দিন কাটছে। করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তাদের জীবন ধারণ। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের।

একই কলোনির বিলকিস, চেলি ও নাইচ বেমগ বলেন, কলোনিতে যারা বসবাস করে এদের কেউ স্বামীহারা, কারো স্বামী অসুস্থ, কেউ রিকশা ও ভ্যানচালক। করোনা আসার পর থেকে আমাদের গজব শুরু হয়েছে। মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবন চলত।

এই কলোনীর সাবিয়া, বিলকিস, চেলিসহ সবাইকে রাতের আঁধারে ঘরে গিয়ে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক হারুন অর রশিদ।

হারুন অর রশীদ বলেন, অনেক পরিবার যারা কর্মহীন হয়ে ঘরে বসে আছেন। কারো কাছে চাইতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট বরাদ্দ আছে এবং বরাদ্দ আসছে। আমরা সবাইকে খাবার দেব।

তিনি বলেন, কেউ সাহায্য দিতে চাইলে একই ব্যক্তিকে না দিয়ে যিনি মূলত কর্মহীন হয়েছেন তাকে দেবেন। জেলার বিত্তবান মানুষ, দফতর বা সংস্থা, এনজিও অথবা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন যারা সহায়তা দিতে চান, সবাইকে অনুরোধ করব একই ব্যক্তি যাতে বার বার সহায়তা না পায় তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে তালিকা করুন।

তিনি আরও বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে অনুগ্রহ করে আপনারা সকলে নিজ নিজ বাড়িতে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। করোনার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করুন। কারও ঘরে খাবার না থাকলে আমাদেরকে অবহিত করুন। আমরা খাবার পৌঁছে দেয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান।

প্রতিবেদনের তথ্য ও চিত্র পাঠিয়েছেন, মোঃ খালেদ বিন ফিরোজ এবং সাজ্জাদ তুহিন

/এসএস

মন্তব্য করুন