করোনায় মসজিদ ভিত্তিক ত্রাণ কার্যক্রম : নামাজের ইমাম হোক সমাজের ইমাম 

প্রকাশিত: ১১:২৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৪, ২০২০

মুহাম্মদ জিয়াউল হক

মসজিদ কেবল উপাসনালয় নয় । একই সাথে এটি সামাজিক মিলনমেলা  এবং একটি Mass communication centre বা গণযোগাযোগ কেন্দ্র  হিসেবেও স্বীকৃত। এখানে একজন সম্মানিত ইমাম সাহেবকে যেমন নামাজে ইমামতি করতে হয়; তেমনি সময়ের প্রয়োজনে সমাজের ইমাম হিসেবেও  আবির্ভূত হতে হয় ।

ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে মসজিদ সামষ্টিক কল্যাণে নাগরিক পরামর্শশালা  হিসেবে বহু আর্থ-সামাজিক  কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু ছিল । জাতীয় ক্রান্তিকালে গুরুত্বপূর্ণ রাজ ফরমান ও প্রয়োজনীয় গণসচেতনতা সৃষ্টি  হত মসজিদ থেকে । একটা সময় শিশু শিক্ষার হাতেখড়ি হত মসজিদের আঙিনা থেকেই। এর বাইরে জনসেবা ও সমাজকল্যাণে মসজিদের  মুসল্লিরা সম্মিলিত উদ্যোগে কাজ করতেন । নামাজে মুসল্লীরা ধনী- দরিদ্রের তফাৎ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একত্রে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে যে মানবিক সাম্যের দৃষ্টান্ত তৈরি করতেন , সমাজে সেই সাম্য ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় একে অন্যের আপদে পাশে এসে দাঁড়াতেন ।

কালক্রমে মসজিদ তার সেই বহুমাত্রিক আবেদন ও ঐতিহ্যগত জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমানে  দৈনন্দিন উপাসনার বাইরে মসজিদকেন্দ্রিক কল্যাণ ও সেবা তৎপরতা এবং বৈচিত্র্যময় কর্মমুখরতা বিরলদৃষ্ট । একটা সময়  মক্তব শিক্ষা যখন বহুল প্রচলিত ছিল ;  ভোরবেলায় মসজিদের আঙিনা শিশুদের কল-কাকলিতে মুখরিত হতো । নগর সভ্যতায় গ্রামীন সেই মনোরমা স্নিগ্ধ সকাল এ প্রজন্মের অচেনা ।

দৈনন্দিন ধর্মাচারের বাইরে সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার ফলে মসজিদের মধ্যমণি ইমামগণ সমাজের মূল জীবনপ্রবাহের বাইরে অবস্থান করেন । চলতি সমাজ সংকট উত্তরণে ইমামগণ তাই অতটা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হতে পারেন না । অথচ একটা সমাজে একজন ইমাম হলেন সর্বজন গ্রহণযোগ্য , বরেণ্য ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব । এই আস্থা ও বিশ্বাসের সুবাদে তার সামনে বিশাল সুযোগ ছিল , সমাজে নানা ইতিবাচক ভূমিকা রাখার । দুর্যোগে, মহামারীতে , ক্ষুধায় , দারিদ্র্যে , অভাবে – অনটনে মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থেকে জনকল্যাণে অতি সহজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারতেন একজন ইমাম।

কোভিড ১৯ সৃষ্ট করোনা মহামারি ইমামকে তার সেই ঐতিহাসিক ও প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখার পরিবেশ- পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে ।

বৈশ্বিক এ মহামারির আর্থ- সামাজিক ধাক্কা অনেক প্রলম্বিত ও বিস্তৃত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন । আলহামদুলিল্লাহ! বাংলাদেশে এখনো খুব নাজুক পরিস্থিতি তৈরি না হলেও ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অচলাবস্থা ও প্রাণহানির প্রভাবে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহে সুদূরপ্রসারী একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নিঃসন্দেহে ।  সরকারের রূপকল্প ২১ , প্রেক্ষিত পরিকল্পনা , শতবর্ষী ব দ্বীপ পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন লক্ষ মাত্রা অর্জনে এ দুর্যোগ আমাদের বেশ বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে এটা সুনিশ্চিত । তাই এর মোকাবেলায় প্রস্তুতি ও সম্পৃক্ততা হওয়া চাই ব্যাপক এবং অংশগ্রহণ মূলক । জাতিসংঘের ভাষায় “Leaving no one behind” বা কাউকে পেছনে রেখে নয় ।

মসজিদ  যেহেতু আমাদের সমাজের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র ; তাই করোনার প্রাদুর্ভাবের  কর্মযজ্ঞে তার সম্পৃক্ততা জরুরী । একই কথা মন্দির, প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ।  বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ । যেটি বেকারত্ব , দারিদ্র্য এবং অভাব-অনটনের সমস্যায় আগে থেকেই জর্জরিত । সেখানে ইমামদের উদ্যোগে এই দুর্যোগকালীন সময়ে মসজিদ কেন্দ্রিক ত্রাণ তৎপরতা সময়ের অপরিহার্য দাবী ।

ব্যয় পদ্ধতি অনুযায়ী, দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে হলে একজন ব্যক্তিকে দৈনিক ২১২২ ক্যালরি খাদ্য খেতে হয় । বর্তমান বাজারে একজন ব্যক্তিকে এই ক্যালরি কিনতে মাসে কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা আয় করতে হবে । অন্যদিকে হতদরিদ্র বলতে যে ব্যক্তি দৈনিক ১৮০৫ ক্যালরি খাদ্য কেনার অর্থ সংস্থান করতে পারেন না তাঁকে  বোঝানো হয়। বাজার দরে  যিনি  মাসে ১ হাজার ৬০০ টাকার কম আয় করেন , তিনি হতদরিদ্র ।

এই দুই প্রকারের দারিদ্র্য মিলে বাংলাদেশে এখন সার্বিক দারিদ্র্য হার ২০.৫  শতাংশ । লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি । প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার ।

বিবিএসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সাড়ে চার কোটি মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে আছে। এর অধিকাংশই নারী। প্রায় তিন কোটি ৫২ লাখ নারী শ্রমশক্তির বাইরে । আমাদের আর্থ- সামাজিক বাস্তবতায় অনেক সময় নারীর অভাব অজানায় থেকে যায় ।

বলাই বাহুল্য এসব দারিদ্র্য , বেকারত্ব , শ্রমহীনতা করোনার প্রাদুর্ভাবকে আরো প্রকট ও দীর্ঘমেয়াদে সংকটাপন্ন করে তুলবে। একান্নবর্তী পারিবারিক কাঠামোয় অনেক ক্ষেত্রে একজনের উপর বাকি সদস্যরা নির্ভরশীল । একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিও এ সময় যদি বেকার হয়ে পড়েন হতে পারেন তিনি দিনমজুর , কৃষক , শ্রমিক , ক্ষুদ্র দোকানী , প্রবাসী কিংবা  কারিগর ; তাহলে সে পরিবারকে হয়তো ঋণ করতে হবে অথবা গচ্ছিত সঞ্চয় ভাঙতে হবে নতুবা অনাহারে থাকতে হবে ।

যারা দিন আনে দিন খায় , তাদেরতো নুন আনতেই পান্তা ফুরায়। সঞ্চয় থাকবে কোত্থেকে ? নিশ্চিত আয়ের উৎস না থাকায় সহজে তারা ঋণও পান না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দরিদ্রদের  জামানত ছাড়া ঋণ দেয় না । কিছু অর্থলগ্নিকারী সংস্থা আছে যারা এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে উচ্চ সুদে ঋণের ব্যবসা করে থাকে ।

দেশে খাত  ভিত্তিক শ্রমশক্তির পূর্ণাঙ্গ ড্যাটাবেইজ নাই । প্রথম আলোর এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, পরিবহন খাতের সাথে জড়িত শ্রমিক রয়েছেন ৭০ লাখ । লকডাউন  পরিস্থিতিতে যারা বর্তমানে বেকার বসে আছেন । গাড়ির চাকা না ঘুরলে , তাদের মুখে আহারও জোটে না ।

দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ । অর্থাৎ প্রতি ৫ জনে ১ জন মানুষ দরিদ্র। এতে ধরা যায় সমাজে প্রতি ৫০০ পরিবারের ১০০ টি পরিবার এমনিতেই দরিদ্র ।  লকডাউনের কারনে শ্রম আয় , প্রবাসী আয় , সর্বপরী স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেমে যাওয়ায় সাময়িক দারিদ্র্য বা আপদকালীন দরিদ্র পরিবারের সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে যাবে । উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির থাকায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা ও যোগানের ফারাক হবে । কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এবং পণ্যদর নিয়ন্ত্রিত না থাকলে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের ক্রয় ক্ষমতাও হ্রাস পাবে । তাই আশংকা থেকে যায়‌ , মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো একটা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে ।‌

এই পরিস্থিতিতে সরকারি বেসরকারি বহু পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে।  আইন‌শৃংখলা বাহিনী ও‌ মাঠ‌ প্রশাসন হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্য বিষয়গুলোও যথাসম্ভব মনিটরিং করছে । প্রয়োজনীয় স্থানে সেনাবাহিনীও মোতায়েন রয়েছে । সুতরাং, সরকার তার সর্বাত্মক সামর্থ্য নিয়ে কাজ করতে সচেষ্ট ।  তদুপরি সমস্যার সমাধানে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসা উচিত ।

সরকার প্রধান ইতোমধ্যে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “দুর্যোগের সময়ই মনুষ্যত্বের পরীক্ষা হয়। এখনই সময় পরস্পরকে সহায়তা করার; মানবতা প্রদর্শনের। ” তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী তাদের সদস্যদের একদিনের বেতন সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে । রেল কর্তৃপক্ষও তাই করেছে ।  বিদ্যানন্দ সহ বিভিন্ন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অনেক প্রশংসনীয় কাজ করছে ।

কাজেই সামাজিক এই দায়বদ্ধতা থেকে মসজিদের ইমামগণও  যদি উদ্যোগী হন, তাহলে সমাজের সচ্ছল মানুষজনের সহায়তায় ছোট ছোট “সামাজিক তহবিল” গঠন করা যেতে পারে । এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তহবিল দিয়ে একজন ইমাম তাঁর মসজিদ এলাকার অন্তত: ৫ টি অভাবী পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারেন ; যেন পরিবারগুলো মোটামুটি মাস দুয়েক তাদের খাদ্য সংকট কাটাতে পারে ।

সংসদে ধর্মমন্ত্রীর প্রদত্ত তথ্য মতে সারাদেশে মসজিদের সংখ্যা আড়াই লাখের বেশী । এই গৃহবাস কালীন সময়ে একজন‌ ইমামের উদ্যোগে প্রত্যেক মসজিদকেন্দ্রিক যদি অন্তত: পাঁচটা পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করা সম্ভব‌ হয় , উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা দাঁড়াবে সাড়ে ১২ লক্ষ । এটা একটা অনুমান মাত্র । এই উদ্যোগে যদি ধারণার ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন হয় , সেটাও মহামারির সংকট মোকাবেলায় কম গুরুত্বপূর্ণ নয় । করোনার দীর্ঘস্থায়ী আশু প্রাদুর্ভাব কাটিয়ে তুলতে বিশাল সামাজিক দায়বদ্ধতায় শ্রদ্ধাভাজন ইমামগণও অগ্রণী ভূমিকায় শামিল হয়ে ঐতিহাসিক অবদান রাখতে পারেন ।

শিক্ষক ও বিতার্কিক , প্রাক্তন সভাপতি, ঢাকা আলিয়া ডিবেটিং ক্লাব 

এই লেখকের আরও লেখা পড়ুন 

ইসলামী শরিয়ায় নারী : তরুণ দুই বিশ্লেষকের মতামত

ড. ইউসুফ আবদুল্লাহ আল কারযাভী : ইসলামী পুনর্জাগরণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি 

মন্তব্য করুন