শাবান মাস, শবে বরাত : যা করতেন নবীজী (সা.)

প্রকাশিত: ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৩, ২০২০

আবু জোবায়ের –

আল্লাহ তা’আলা মানুষদের তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই সর্বদা দুনিয়ার পেছনে ব্যস্ত সময় পার করে। তাদের চিন্তা-চেতনা ও দৌড়-ঝাঁপ দুনিয়ার সাথেই জড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে আল্লাহ তা’আলার ইবাদত ও নৈকট্য থেকে তারা বহু দূরে সরে পড়ে। এমন বান্দাদের জন্য আল্লাহ তা’আলা কিছু বিশেষ দিন ও মাসে তার ক্ষমা ও নৈকট্য লাভের অফার রেখেছেন। সেই অফার চলাকালীন সময়কে কাজে লাগিয়ে যেন একজন বান্দা রবের সাথে দূরত্ব কমিয়ে তার কাছাকাছি আসতে পারে।

শাবান মাসের ফজিলত : শাবান মাস ফজিলতপূর্ণ মাস। এ মাসেই আমাদের আমলগুলো আল্লাহ তা’আলার দরবারে পেশ করা হয়। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মাসে ইবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

উসামাহ বিন যায়দ (রাঃ) বলেন, ‘একদা আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনাকে শাবান মাসে যত সিয়াম রাখতে দেখি তত অন্য কোন মাসে তো রাখতে দেখি না, (এর রহস্য কী)?’ উত্তরে তিনি বললেন, “এটা তো সেই মাস, যে মাস সম্বন্ধে মানুষ উদাসীন, যা হল রজব ও রমযানের মাঝে। আর এটা তো সেই মাস; যাতে বিশ্ব জাহানের প্রতিপালকের নিকট আমলসমূহ পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, সিয়াম রাখা অবস্থায় আমার আমল (আল্লাহর নিকট) পেশ করা হোক। (আহমাদ: ২১৭৫৩, নাসাঈ: ২৩৫৭, সহীহ তারগীব: ১০০৮, তামামুল মিন্নাহ: ৪১২পৃঃ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের বরকত কামনায় এ দোয়া বেশি বেশি পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজব ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান’। অর্থ: ‘হে আল্লাহ! রজব মাস ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন; রমজান আমাদের নসিব করুন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২৫৯, বায়হাকি: ৩৭৫)

শাবান মাসের বৈশিষ্ট্য : রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসে সবচেয়ে বেশি নফল ইবাদত, নফল রোজা পালন ও নফল নামাজ আদায় করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রজব হলো আল্লাহ তা’আলার মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান হলো আমার উম্মতের মাস। রজব মাস হলো ইবাদতের মাধ্যমে মনের ভূমি কর্ষণের জন্য, শাবান মাস হলো আরও বেশি ইবাদতের মাধ্যমে মনের জমিতে বীজ বপনের জন্য; রমজান হলো সর্বাধিক ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সফলতার ফসল ঘরে তোলার জন্য।

নবীজি (সা.) এর আমল : রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্বের অন্যান্য মাসের তুলনায় শাবানে ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন এবং রমজানের প্রস্তুতি নিতে অধিক সংখ্যায় রোজা রাখতেন। তিনি এক হাদিসে বলেছেন, ‘রমজানের রোজার পরেই শাবানের রোজার শ্রেষ্ঠত্ব, যে রোজা রমজানের প্রস্তুতির জন্য রাখা হয়।’

আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শাবান মাস চাইতে বেশি নফল সিয়াম অন্য কোন মাসে রাখতেন না। নিঃসন্দেহে তিনি পূর্ণ শাবান মাস সিয়াম রাখতেন।’ অন্য বর্ণনায় আছে, ‘অল্প কিছুদিন ছাড়া তিনি পূর্ণ শাবান মাস সিয়াম রাখতেন।’ (বুখারী: ১৯৭০, মুসলিম: ২৭৭৮)

আয়েশা (রাঃ) আরো বলেন, ‘আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে রমযান ছাড়া অন্য কোন মাস সম্পূর্ণ সিয়াম রাখতে দেখিনি। আর শাবান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসের অধিকাংশ দিনগুলিতে তাঁকে সিয়াম রাখতে দেখিনি।’ (বুখারী: ১৯৬৯, মুসলিম: ২৭৭৭)

সাহাবাদের (রাজি.)-দের আমল : হজরত আনাস (রাজি.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রিয় সাহাবারা শাবান মাসের চাঁদ দেখে নিম্নোক্ত কাজগুলো করতেন—

– পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করতেন।
– তাদের সম্পদের যাকাত বের করে দিতেন, যেন গরিব-মিসকিনরা স্বাচ্ছন্দ্যে রমজানের রোজা রাখতে পারে।
– বিচারকরা জেলখানার কয়েদিদের হাজির করে আপরাধী ব্যতিত বাকি লোকদের মুক্তি দিয়ে দিতেন।
– ব্যবসায়ীরা এ মাসে তাদের ঋণ পরিশোধ করে দিতেন এবং অন্যদের কাছে যা পাওনা তা আদায় করে নিতেন।
– রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেলে তারা গোসল করে ইতিকাফে বসে যেতেন।

শাবান মাসে অধিক রোজা রাখা প্রিয়নবী (সা.) এর বিশেষ আমল হিসেবে প্রমাণিত। এছাড়া এ মাসে প্রিয়নবী (সা.) বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত ও দান-সাদকা করতেন। সাহাবায়ে কেরাম (রাজি.)-রাও প্রিয়নবী (সা.) এর আমলগুলোর অনুসরণ করতেন।

শবে বরাত নিয়ে কিছু কথা : শবে বরাতের ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম তাকী উসমানী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) শবে বরাতের ফজিলত বর্ণনা করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম (রাজি.)-দের যুগেও এ রাতের ফজিলত থেকে উপকৃত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। সে যুগের লোকেরা এ রাতের ইবাদতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকতেন। সুতরাং এটা ফজিলতপূর্ণ রাত। এ রাতে জাগরণ করা, ইবাদত করা পূণ্য লাভের মাধ্যম এবং এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যও রয়েছে।

এ রাতে ইবাদতের কোন বিশেষ পদ্ধতি নেই যে, অমুক পদ্ধতিতে ইবাদত করা হবে। কেউ কেউ নিজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার করে নিয়েছে, শরীয়তে যার কোনো প্রমাণ নেই। এসব একেবারেই ভিত্তিহীন কথা। নফল ইবাদত তা যেভাবেই হোক আদায় করা যাবে। নফল নামাজ পড়বে। কুরআন তেলাওয়াত করবে। যিকির করবে। তাসবীহ পড়বে। দোয়া পড়বে। এ জাতীয় সকল ইবাদত এ রাতে করা যেতে পারে। কিন্তু এসবের বিশেষ পদ্ধতি নেই।

রাসূলুল্লাহ (সা.) শবে বরাতে সারা জীবনে একবার জান্নাতুল বাকীতে গিয়েছিলেন। তাই অনেক মুসলমানরাও এটার অনুসরণে এ রাতে কবরস্থানে যায়। কোনো মুসলমান যদি এই দৃষ্টিকোণ থেকে কবরস্থানে যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) গিয়েছিলেন, তাই আমিও তার অনুসরণ করে কবরস্থানে যাচ্ছি, তাহলে ইনশাআল্লাহ সওয়াবের অধিকারী হবে। কিন্তু প্রতি বছর যাওয়াকে গুরুত্ব প্রদান করবে না। কেউ যদি এটাকে জরুরী মনে করে এবং এ রাতের বিশেষ কাজ মনে করে, তাহলে তা বাড়াবাড়ি হবে।

রমজানের প্রস্তুতি শুরু করে দিন : রমজান আল্লাহ তা’আলার মাস। কুরআন নাজিলের মাস। সর্বশ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত দামি ও গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা’আলা এ মাসে প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। তাই এ মাসের একটি মুহূর্তও যেন নষ্ট না হয়, ইবাদতগুলো যেন পরিপূর্ণভাবে আদায় হয় এবং অর্জিত সওয়াব যেন বরবাদ না হয়ে যায়; সেজন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। রমজানের প্রস্তুতিমূলক কয়েকটি কাজ এখানে উল্লেখ করছি—

১. আল্লাহর নাফরমানি ছেড়ে দিন। ২. ফরজের পাশাপাশি ওয়াজিব, সুন্নাত ও মোস্তাহাবের প্রতি যত্নশীল হোন। ৩. সময়ের হেফাজত করুন এবং সময় থেকে সর্বোচ্চ উপকৃত হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখুন। ৪. সহজ নেকীর কাজগুলো কী? তা বিশদভাবে জানুন এবং বেশি বেশি আমল করুন। ৫. অনর্থক ও ফায়দাহীন কাজ থেকে বেঁচে থাকুন। ৬. ইবাদত ও আমল মনোযোগ, অভিনিবেশ ও নিষ্ঠার সাথে আদায় করুন। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিয়ত রাখুন। ৭. কৃত নেক আমল হেফাজতের প্রতি লক্ষ্য রাখুন। কিছু কাজ আছে যেগুলোর কারণে আমল নষ্ট হয়ে যায় কিংবা আমলের সওয়াব ও ফায়দা শেষ হয়ে যায়। যেমন— রিয়া, খোটা দেওয়া, হিংসা-বিদ্বেষ, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করা; ইত্যাদি।

কিছু বিষয় আছে যেগুলোর কারণে আল্লাহর দরবারে দুআ ও ইবাদত কবুল হয় না। সেগুলো থেকে বেঁচে থাকুন। যেমন— খাবার, বাড়ি, নিত্য ব্যবহার্য জিনিস হারাম উপার্জনের হওয়া ও বিদআতে লিপ্ত হওয়া।

কিছু গুনাহ এমন আছে যেগুলোর কারণে হাশরের ময়দানে সওয়াবের পাহাড় নিয়ে উপস্থিত হলেও নিংস্ব হয়ে যেতে হবে। সেই গুনাহগুলো হয়ে থাকে আল্লাহর মাখলূক ও আল্লাহর বান্দাদের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদির ক্ষেত্রে। যেমন— কারো গীবত করা, কারো উপর অপবাদ আরোপ করা, কাউকে গালি-গালাজ করা, কাউকে কষ্ট দেওয়া, কারো হক না দেওয়া, এতিমের সম্পদ গ্রাস করা, হকদারকে মীরাছের সম্পদ না দেওয়া, নিরীহ পশু-পাখিকে কষ্ট দেওয়া। এইসব গুনাহ থেকে বেঁচে থাকুন।

শাবান মাসে বেশি বেশি ইবাদত করুন এবং রমজান মাসের প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করে দিন। বেশি বেশি দোয়া করুন— হে আল্লাহ, আমাদের জন্য শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদেরকে রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন!

লেখক : শিক্ষার্থী, দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী

এই লেখকের আরও লেখা পড়ুন : 

রজব মাস : ভিত্তিহীন আমল এড়িয়ে চলুন

ভালোবাসা দিবস, ইসলাম কী বলে : তরুণ দুই আলেমের ভাবনায়

মন্তব্য করুন