মানবতার বন্ধু গাজী ইয়াকুব : করোনায় আলেমদের সমাজসেবা

প্রকাশিত: ৭:০৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২০

করোনায় আলেমদের সমাজসেবা : ব্যাতিক্রমধর্মী চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ (১ম পর্ব)

বিশেষ প্রতিবেদন- করোনাভাইরাসে অঘোষিত লকডাউনে বাংলাদেশ এক স্থবির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দিনমজুর অসহায়রা পড়েছেন এক ভয়াবহ খারাপ অবস্থায়। অনেকের জন্য দৈনিকের খাবার জোগাড় করাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে বসে নেই দেশের আলেমরা। বিভিন্নভাবে আলেমরা মানুষদেরকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন দেশব্যাপী।

পাবলিক ভয়েস সারাদেশে আলেমদের সহযোগিতার চিত্র ধারাবাহিক প্রতিবেদন আকারে তুলে আনছে। দ্বিতীয় পর্বে থাকছে একজন আলেম সমাজকর্মীর আলোচনা।

গাজী ইয়াকুব। এ নামেই পরিচিত তিনি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করে অনেকের সাথে তিনিও হিরোর খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। সেই ২০১৬ সাল থেকে প্রকাশ্যে মানবসেবায় কাজ করে যাচ্ছেন ধারাবাহিকভাবে। ঢাকায় সৃষ্ট যে কোন দুর্যোগে গাজী ইয়াকুব সবার আগে জনসেবায় নেমে আসেন। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতিতেও তিনি বসে থাকবেন না এটাই স্বাভাবিক।

করোনা পরিস্থিতিতে গাজী ইয়াকুব বেশকিছু কাজ করেছেন যা প্রশংসাযোগ্য। সরেজমিন অনুসন্ধান ছাড়াও আমরা পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে মুঠোফোনে মুখোমুখি হয়েছিলাম ‘মানবতার সেবক এই আলেমের’। তিনি করোনাভাইরাসের এই সময়ে এসে তাঁর কাজ এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন পাবলিক ভয়েসের নির্বাহী সম্পাদক হাছিব আর রহমানের সাথে।

‘করোনা পরিস্থিতিতে কী কী কাজ করছেন’ জানতেই চাইলে গাজী ইয়াকুব বলেন তাঁর কাজের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

সচেতনতামূলক কার্যক্রম :

১. ঢাকাব্যাপী করোনাভাইরাস বিষয়ে সতর্কতাস্বরুপ লিফলেট বিতরণ করেছিলাম সেই শুরু থেকেই। বিশেষ করে মসজিদগুলোতে লিফলেট দিয়ে মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি করোনা প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই।

২. প্রতিদিন প্রায় দুইশত মসজিদে হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং ডেটল দিয়ে মানুষের হাত পরিষ্কার করানো সহ তাদের মাঝে স্যানিটাইজার বিতরণ করা হয়েছে।

৩. প্রায় আড়াইশো মেশিন দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে হেমায়েতপুর এবং বসিলা, মোহাম্মদপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় একযোগে জীবাণুনাশক স্প্রে করেছি আমরা।

খাবার বিতরণ :

১. ছিন্নমূল ও পথশিশুদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৭০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন তিনি এবং তাঁর টিম। এছাড়াও বিভিন্ন বাস স্টপিজ এবং ছিন্নমূল মানুষদের বসবাস যেখানে সেসব এলাকায় পাউরুটি সহ শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে গাবতলী বাসস্টান্ড, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

২. প্রতিদিন প্রায় ২০০ পরিবারকে এক সপ্তার খাবারসহ কিছু নগদ টাকা তাদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাবস্থা করেছেন এবং এই কার্যক্রম এখন থেকে ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এই প্রজেক্টের আওতায় তিনি মিরপুর, রূপনগর, কামরাঙ্গীরচর, হেমায়েতপুর, যাদুরচর, বসিলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সহযোগিতা করেছেন। অসহায় দিনমজুরদের খুঁজে খুঁজে খাবারের প্যাকেট, চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, লবণ, তেল, সাবানসহ বিভিন্ন জিনিস তিনি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

বিশেষ কার্যক্রম :

১. নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তদের জন্যও তিনি সহযোগিতার ব্যবস্থা করেছেন। কোন মধ্যবিত্ত যারা তাদের সমস্যার কথা বলতে পারে না তারা যদি ফোনে বা কোন মাধ্যমে তাকে সমস্যার কথা জানায় বিশেষ করে কোন আলেম তাহলে তিনি তাদের কাছে সহযোগিতা পৌঁছে দিয়ে থাকেন।

২. এ ছাড়াও যে কোন কেহই যদি তাদের কাছে সহযোগিতার কথা জানায় তাহলে তারা সেখানে সহযোগিতা পৌঁছে দিয়ে থাকেন। প্রয়োজনে হোন্ডায় করে গভীর রাতেও সহযোগিতা পৌঁছাতে প্রস্তুত তিনি বলে জানিয়েছেন।

শুরু সময় :

‘কবে থেকে মানবসেবামূলক এসব কাজ করছেন’ এমন প্রশ্নের জবাবে গাজী ইয়াকুব বলেন, প্রায় সাত বছর ধরেই আমি এসব কাজ করছি কিন্তু প্রকাশ্যে কাজটা এসেছে রোহিঙ্গাদের সময় থেকে। ২০১৬ সালে যখন প্রথম রোহিঙ্গারা আসে তখন আমি কিছু কাজ করেছিলাম এরপরে ২০১৭ সালে যখন ব্যাপক হারে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা শুরু হয় তখন ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আমি কাজ করেছিলাম।

এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমার প্রায় ৯ টা মাদরাসা এবং ৮ টা মসজিদ আছে। যেখানে মুহাজির বাচ্চারা পড়াশোনা করে এবং আমার মাধ্যমে তাদের নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করেন। যেখানে প্রায় ১১০০ বাচ্চারা আছে।

এছাড়াও তারপর ঢাকায় বিভিন্ন সমস্যা যেমন, চিকনগুনিয়া, আগুন লাগাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে আমি ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছি। এর আগে চুড়িহাট্টায় ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও ভাসানটেকে একটি মাদ্রাসায় আগুন লাগার পর সেখানে ত্রাণ বিতরণ করেছেন তিনি। এবং আল্লাহ চাইলে এটা আমি করে যেতে চাই বলেন তিনি।

‘অর্থ সংগ্রহ হয় কোথা থেকে :

‘এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বেশ বড় অর্থনৈতিক সাপোর্ট লাগে, এই টাকা কোথা থেকে সংগ্রহ হয়?’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজী ইয়াকুব বলেন,

‘অর্থগুলো এককভাবে আমিই খরচ করি বিষয়টা এমন নয়। তবে কিছু খরচ তো আমি অবশ্যই করি। সাধারণত আমার ব্যবসার নিয়ম হলো যা লাভ হয় তার ৫০ পার্সেন্ট আমি জনসেবামূলক কাজে খরচ করি। এছাড়াও আমার কিছু বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয় স্বজন আছেন যাদের যাকাতের টাকা নিয়মিত আমার মাধ্যমে তারা দেন।

এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমেরিকা ভিত্তিক একটি এনজিও ‘বাসমাহ ফাউন্ডেশন’ আমার পরিচালিত মাদ্রাসাগুলো দেখাশোনা করে এবং তাদের খরচের বড় একটা অংশ তারা বহন করে থাকেন।

করোনা পরিস্থিতির এই সময়ে এসেও আমার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী একজন আত্মীয়, এবং আরও অনেক আত্মীয় স্বজন যারা প্রবাসে থাকেন তারা বেশকিছু অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। যাদের মাধ্যমেই আমি কাজগুলো চালিয়ে যেতে পারছি।

গাজী ইয়াকুব বলেন, এছাড়াও কেউ যদি আমার ব্যবস্থাপনায় নিজে উপস্থিত থেকে অসহায় গরিবদের সাহায্য করতে চায় তাদেরকে আমি স্বাগত জানাই। এমন অনেকেই আছেন যারা আমার সাথে নিজে উপস্থিত থেকে মানুষকে সহযোগিতা করে থাকেন।

আলেমদের প্রতি পরামর্শ :

‘আলেমদের মধ্যে যারা সামাজিক কাজ করতে চায় তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী থাকবে’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আলেমদের প্রতি আমার পরামর্শ হচ্ছে আপনারা নিজেরা বসে না থেকে বরং যার যার অবস্থান থেকে কাজ শুরু করে দিন। সামাজিক কাজে আলেমদের অনেক দায়বদ্ধতা আছে। আপনি যখন আল্লাহর জন্য কাজ শুরু করবেন তখন আল্লাহ তায়ালাই বিত্তশালীদের মনে এই চিন্তা দিয়ে দিবেন যে উনার মাধ্যমে আমার কাজটা করানো উচিত। তাছাড়া এমন পরিস্থিতিতে আলেমদের অবশ্যই যথাযোগ্য ভূমিকা রাখা উচিত। কাজ না করে শুধু শুধু ঘরে বসে না থেকে বরং জনসেবামূলক এসব কাজে আলেমদের সবার আগে এগিয়ে আসা উচিত।

আরও পড়ুন :

করোনা পরিস্থিতিতে দিনমজুর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ইকরামুল মুসলিমীনের বিশেষ উদ্যোগ

করোনা মহামারিতে এ পর্যন্ত ৩০০ পরিবারকে সহায়তা প্রদান করেছে যুব আন্দোলন

প্রতিবেদনটি করেছেন পাবলিক ভয়েসের নির্বাহী সম্পাদক হাছিব আর রহমান।

মন্তব্য করুন