ইতালির গির্জায় কি সত্যিই মোহাম্মদ সা.-কে ব্যাঙ্গ করা হয়েছে?

প্রকাশিত: ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩১, ২০২০

পলাশ রহমান, ইতালি থেকে

ইতালির মুসলিম কমিউনিটিতে এখন সব থেকে বড় আলোচনার বিষয় হলো ব্লোনিয়া শহরের একটি গির্জা। সংখ্যাগুরু ক্যাথলিকদের ওই গির্জার ভেতরে স্থাপিত একটি চিত্রকর্মকে কেন্দ্র করে কমিউনিটিতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

মুসলিম কমিউনিটির অনেকে দাবি করেছেন, ব্লোনিয়ার সান পেত্রোনিয় গির্জায় স্থাপিত চিত্রকর্মটিতে নবী হযরত মোহাম্মদ সা.-কে ব্যাঙ্গ করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে। ইতালির করোনা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করার কারন হিসাবেও কেউ কেউ ওটাকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তারা বলার চেষ্টা করছেন, গির্জার ভেতরে নবী সা.-কে ব্যাঙ্গ করে ছবি প্রদর্শনের কারনেই ইতালিতে ঐশী গজব হিসাবে করোনা সংক্রমণ মহামারি আকার ধরণ করেছে।

ইতালির একাটা জাতীয় দৈনিক এ বিষয়ক এক প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই মূলত এই বিতর্কের পালে হাওয়া লাগে। মুসলিম কমিউনিটির পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয় অতিসত্বর ওই চিত্রকর্মটি অপসারণ করতে হবে।

উল্লেখ্য, এর আগেও একাধিকবার ওই চিত্রকর্মটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হতে দেখা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় ব্লোনিয়া শহরের প্রধান ক্যাথলিক গির্জায় স্থাপিত চিত্রকর্মটি প্রায় ৫শ বছরের পুরনো। জোভান্নি দা মোদেনার পরকাল বিষয়ক ওই চিত্রটিতে দেখা যায় বিশাল আকৃতির ‘শয়তান’ মানুষ চিবিয়ে খাচ্ছে। ছবিতে আঁকা একজন মানুষের নিচে এমন কিছু অক্ষর লেখা রয়েছে যেগুলোকে কেন্দ্র করে ধারণা করা হচ্ছে নবী মোহাম্মদ সা.-কে ব্যাঙ্গ করা হয়েছে। যদিও এর সত্যতা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে।

ইতালির ক্যাথলিক গির্জাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। এগুলো স্বায়িত্বশাসনের সুবিধা ভোগ করে। স্বাধীন ধর্মরাষ্ট্র ভ্যাটিকান থেকে গির্জাগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়। এর সর্বসর্বা হিসাবে পোপকে বিবেচনা করা হয়। ভ্যাটিকান থেকে প্রণীত আইন কানুনের মাধ্যমে গির্জাসহ ক্যাথলিকদের অন্যান্যা ধর্ম প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। সুতরাং কোনো গির্জার অভ্যন্তরের চিত্রকর্ম নিয়ে ইতালিয় সরকারকে দোষারোপ করা যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মনে করেন কমিউনিটির সচেতন মহল।

ব্লোনিয়া শহরের ওই গির্জার চিত্রকর্ম নিয়ে যদি মুসলিমদের কোনো আপত্তি থাকে তা গির্জা কর্তৃপক্ষকে বা ভ্যটিকানের প্রধান এবং ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু পোপকে জানানো যেতে পারে। কিন্তু ইতালির এই মহাসংকটকালে উদ্দেশ্যপ্রণদিত বিতর্ক সৃষ্টি করা কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রবাসী আলেম মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুন বলেন, সত্যিই যদি ওই চিত্রকর্মে আমাদের নবীকে সা.-কে ব্যাঙ্গ করা হয় তা যে কোনো বিবেচনায় জঘন্য কাজ হয়েছে। কিন্তু ইতালির এই সংকটকালে অনিশ্চিত একটা বিষয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম এমন আন্দাজপ্রসূত বিতর্ককে অনুমোদন করে না।

তিনি বলেন, যারা এসব নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করছেন তারা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়েছেন। আমাদের সকলের উচিত এই সংকটকালে বেশি বেশি দোয়া করা। গুনাহ থেকে মাফ চাওয়া এবং সাধ্যমতো ইতালিয় সরকারকে সহযোগিতা করা। যে সব বয়স্ক মানুষরা অসুবিধার মধ্যে আছেন, ঘরবন্দি হয়ে আছেন সম্ভব হলে তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া।

মাওলানা ইউনুস বলেন, ইসলাম মানবতার ধর্ম। বিতর্ক বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ধর্ম নয়। মানুষের বিপদের সময়ে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সহযোগিতার হাত বাড়ানোই নবী মোহাম্মদ সা. এর আদর্শ।

অভিবাসী সংগঠন গ্লোবাল পিচ মুভমেন্টের আহবায়ক হাফেজ আল ইসলাম বলেন, ইসলাম কোনো অবস্থাতেই বিশৃঙ্খলা অনুমোদন করে না। সুতরাং সত্যিই যদি এমন কোনো ঘটনা থেকে থাকে তার জন্য গির্জা কর্তৃপক্ষকে জানানো যেতে পারে, ভ্যাটিকানে প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের আইন অমান্য করা, গুজব সৃষ্ট করা, নৈরাজ্য করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা ভয়াবহ অন্যায় কাজ হবে।

এদিকে ইতালির করোনা সংকট দিনে দিনে আরো বেশি রুদ্ররুপ ধারণ করছে। এ পর্যন্ত ৫১ জন চিকিৎসকসহ প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে।

ইতালিসহ গোটা বিশ্বের করোনা সংকট থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় গত শুক্রবার ক্যাথলিকদের ধর্মনেতা পোপ ফ্রানসেসকো ভ্যাটিকানে বিশেষ প্রার্থনা করেন। ইতালির সকল টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ওই প্রার্থনায় দেখা যায় পোপ ভ্যাটিকানের সান পিয়েত্র চত্ত্বরে স্থাপিত প্রার্থনা মঞ্চের দিকে একা একা হেটে যান। ক্যাথলিক ধর্মীরীতি মতো তিনি প্রার্থনা করেন। এ সময় তুমুল বৃষ্টিতে ভ্যাটিকান চত্ত্বর ভিজে যায়। মনে হচ্ছিল গোটা ইতালি কাঁদছে।

ইতালির রাষ্ট্রপতি সিনোর সেরযো মাত্তারেল্লা জাতীর উদ্দেশ্যে এক দীর্ঘ ভাষন দেন। এ সময় তাঁকে খুব বেশি মর্মাহত দেখাচ্ছিল। তিনি সকল চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ যারা এই সংকটকালে নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে কাজ করছেন তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

যারা এই সংকটকালে ইতালির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ইতালির জনগণ আপনাদের আজীবন মনে রাখবে। হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে ধারণ করবে।

উল্লেখ্য, চিন, ইন্ডিয়া, আলবেনিয়া, রাশিয়া, সোমালিয়াসহ অনেক দেশ ইতালির করোনা সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার হাত বাড়িছেয়ে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অভিবাসী কমিউনিটি থেকে করোনা ফান্ড সংগ্রহ করে সরকারকে সহযোগিতা করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন