করোনায় আলেমদের সমাজসেবা : ব্যাতিক্রমধর্মী চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ

প্রকাশিত: ২:২৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩১, ২০২০

বিশেষ প্রতিবেদন- করোনাভাইরাসে অঘোষিত লকডাউনে বাংলাদেশ এক স্থবির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দিনমজুর অসহায়রা পড়েছেন এক ভয়াবহ খারাপ অবস্থায়। অনেকের জন্য দৈনিকের খাবার জোগাড় করাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে বসে নেই দেশের আলেমরা। বিভিন্নভাবে আলেমরা মানুষদেরকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন দেশব্যাপী।

পাবলিক ভয়েস সারাদেশে আলেমদের সহযোগিতার চিত্র ধারাবাহিক প্রতিবেদন আকারে তুলে আনছে। প্রথম পর্বে থাকছে একজন ব্যাতিক্রমধর্মী আলেম চেয়ারম্যানের আলোচনা।

করোনাভাইরাসের এই লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যেই সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রম হয়ে ধরা পড়েছেন একজন আলেম সমাজসেবক। যিনি লক্ষিপুর জেলার, কমলনগরের ৮নং চরকাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি পরিচিত ইসলামী রাজনৈতিক দল ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র হাতপাখা প্রতীকে পরপর দু’বার মনোনিত হয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মের আইডল  হতে পারেন প্রচারবিমুখ এ জনদরদি মানুষটি।

করোনাভাইরাস ইস্যু আসার পর যখন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপি মন্ত্রী, আমলারা লাগামহীন কথাবার্তা বলে যাচ্ছিলো তখন এই আলেম চেয়ারম্যান সবার সামনে ধরা পড়লেন একজন মানবতাবাদী উচ্চ চিন্তার মানুষ হিসেবে।

মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহর অনেক পরিচয় আছে এর মধ্য একটি অন্যতম পরিচয় হলো তিনি বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির প্রাণপুরুষ মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর জামাতা অপরদিকে তিনি এদেশের বজ্রকন্ঠের ইসলামী রাজনৈতিক মুফতি ফজলুল হক আমীনি রহ. এর ভায়রা৷ তিনি একজন প্রতিথযশা আলেম, ইসলামী আলোচক এবং মাদরাসা শিক্ষক। এর মধ্যেই তিনি একজন চেয়ারম্যান। জনসেবায় তিনি সারাদেশে ব্যাতিক্রমধর্মী একজন মানুষ।

চলনে-ভূষণে অতি সাধারণ এই মানুষটির ব্যক্তিত্ব যেন আকাশসম উঁচু। করোনাভাইরাসের এই বিপর্যয়ের সময় তিনি দীপ্তকন্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘চর কাদিরা ইউনিয়নে অভাবের কারণে কেউ যদি না খেয়ে থাকতে হয়, আমি সাইফুল্লাহ সর্বপ্রথম না খেয়ে থাকবো। কারো ঘরে ভাতের চাউল না থাকলে, কারো পকেটে সদায় করার টাকা না থাকলে, সরাসরি আমার সাথে সাক্ষাত করবেন। আমার পকেটে টাকা থাকতে, আমার ঘরে একমুঠ চাল থাকতে, চর কাদিরায় কেউ না খেয়ে থাকবে না ইনশাআল্লাহ।’

মাওঃ খালেদ সাইফুল্লাহ। চেয়ারম্যান, ৮ নং চর কাদিরা ইউনিয়ন পরিষদ, লক্ষিপুর।

বলেই ক্ষ্যান্ত নন তিনি। চলতি করোনাভাইরাস এর সংকটময় মুহূর্তেও মানুষের ঘরে ঘরে তিনি ডাল-চাল ইত্যাদি পৌঁছে দিচ্ছেন।

মাওলানা খলেদ সাইফুল্লাহ ‘মিরপুরী হুজুর’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকাস্থ মাদানীনগর মাদরাসার সাবেক মুহাদ্দিস। মিরপুরের মুসলিম বাজার মাদরাসার মুহতামিমও ছিলেন তিনি। একই সাথে হাফেজ্জী হুজুর রহ. এবং আল্লামা আতহার আলী রহঃ এর খলিফা। আধ্যাত্মিকতার সবক রপ্ত করেছেন শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকীর কাছে। আমীরে শরীয়ত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর একান্ত স্নেহধন্য শিষ্যও তিনি। একজন চেয়ারম্যান হয়েও সবার কাছে ‘পীরসাহেব কমলনগর’ নামেই পরিচিত এই বিদগ্ধ আলেমে দ্বীন।

তিনি একজন সুবক্তা। দীনি মাহফিল করে বেড়াচ্ছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাঁর মাহফিল মানেই খোদাভীতির ক্লাস। প্রতিটি মাহফিলেই তিনি প্রভুর ভয়ে স্বজনহারা মানুষের মত, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মত ডুকরে ডুকরে কাঁদেন।

তিনি ঢাকাতেই সেটেল্ড ছিলেন। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে নিজ এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক সেবা প্রদানের জন্য লক্ষ্মীপুর চলে যান। এবং রাতদিন মানুষকে সেবা দিতে থাকেন। কর্মগুণে অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সর্বমহলে। তাকে বলা হয় ‘বিলাসীযুগে সাধারণ বেশের একজন সফল চেয়ারম্যান’।

পরণে চকচকে জামা নেই। দামি গালিচা আর মখমলের গদি নেই। যুগের ‘বিএমডব্লিউ ‘ বা ‘ফ্রাডো’ গাড়ী নেই। সম্বল আছে ২০০ টাকার কম্বলের গদি। সাধারণ একটি চেয়ার। চলাচলের জন্য একটি বাইসাইকেল। পরণের কাপড় ধূলামলিন। পায়ের মোজা ছেঁড়াফাটা। ৭০/৮০ টাকার একজোড়া স্যান্ডেল প্রায় পায়ে দেখি। অথচ ইনি আজকের বিলাসীযুগের একজন দাপুটে চেয়ারম্যান।

তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পরে তাঁর জীবনের নতুন অজানা অধ্যায় মানুষ জানতে পেরেছে। শাসক কেমন হয়? একটি ইউনিয়ন পরিষদ কীভাবে পরিচালনা করবে? এগুলো তিনি বাস্তবে রুপ দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সবাইকে। শোষণ-নিপীড়ন-উৎপীড়নের যুগে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন ‘খলিফা হযরত উমর রা.’র শাসনামল’ কিছুটা এমনই ছিল।

কিছুদিন আগে দেখেছি মানুষের সাথে কাঁধেকাঁধ মিলিয়ে মাটি কেটে জনগণের চলাচলের রাস্তা ভরাট করতে। দেখেছি তক্তা দিয়ে নির্মিত সাঁকো নিজ হাতে তৈরী করতে। চলার পথে কারো মালবাহীগাড়ী আটকে গেলে নিজহাতে ঠেলে দিতে। কি মানুষ পেলাম আমরা। কি চেয়ারম্যান পেলো জনগণ।

সাদামাটা পোশাক ও জুতা পরে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘরে ঘরে খাদ্য-সামগ্রী পৌঁছে দেয়াকে তিনি এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মনে করছেন। তার পুরো মনোযোগ করোনায় ঘরে আটকে পড়া গরিব অসহায় মানুষ।

চরকাদিরা ইউনিয়নের মানুষের কাছে শুধু চেয়ারম্যান হিসেবেই নয় প্রবীণ আলেম হিসেবেও তার অনেক খ্যাতি রয়েছে। তবে তার সম্পর্কে এলাকার মানুষের একটা বাড়তি বিশেষণ রয়েছে, যেটি মানুষের কাছে বড় সমস্যাও মনে হয়। তার ইউনিয়নের মানুষের ভাষায়- হুজুরের একটাই সমস্যা, তিনি মিথ্যা বলেন না। তাদের কথা হলো, ‘এ যুগে কি (দু-একটা) মিথ্যা না বললে হয়!’

প্রবীণ এ আলেম চেয়ারম্যান বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় অন্যান্য চেয়ারম্যানসহ সমাজের সব বিত্তবানদের জন্য হতে পারেন সুযোগ্য আইডল। সমাজসেবায় তিনি সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি, আলেম-ওলামা ও জনসাধারণের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি পুরো সমাজে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ‘চেয়ারম্যান হলেই আমল-ইবাদত ও সত্যবাদিতা থেকে দূরে সরে যেতে হয় না।

বরং সত্যবাদিতার সঙ্গেই সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সমাজের উন্নয়নে সত্যবাদী ও ন্যায়-নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদেরই জনপ্রতিনিধি হওয়া উচিত। আমরা যারা নিজ এলাকায় গ্রাম-গঞ্জে কাজ করতে চাই তাদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারেন সাদামাটা আলেম মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ।

এক নজরে মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহর চরকাদিরা ইউনিয়ন :

১৮৫৪ ইং সনে দেশের বৃহত্তম নদী মেঘনার বুক থেকে জেগে উঠে এই চরাঞ্চল। নতুন এই চরে মেঘনা ও ভুলুয়া নদীর ভাঙ্গনে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) জেলার দৌলতখান থানা ও তৎকালীন শাহবাজপুরের (ভোলা) এবং নোয়াখালীর জেলার লক্ষ্মীপুর থানাধীন ফরাশগন্জ, কুশাখালী থেকে আসা কিছু পরিবার কৃষিকাজ ও বসতিস্থাপন করে।

১৯০৫ সালে থাক সার্ভে তৎকালিন বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) জেলাধীন দৌলতখান থানা এবং ১৯১০ সালে ডিস্ট্রিক্ট স্যাটেলম্যান্ট (ডি.এস) জরীপে নোয়াখালী জেলার উত্তর হাতিয়া ১৯১৭ সালে রামগতি থানার অধীনে চর কাদিরা মৌজা গেজেটভূক্ত করা হয়।

১৯৫৫ ইং সনে চর কাদিরা ইউনিয়ন বোর্ড,১৯৭২ ইং সনে চর কাদিরা ইউনিয়ন কাউন্সিল, ১৯৮৩ ইং সনে ৫নং চর কাদিরা ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়। ২০০৬ ইং সনে ৫নং চর কাদিরা ইউনিয়নকে বিভাজন করে ইউনিয়নের দঃ পূর্ব অংশকে ৮ নং চর কাদিরা ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ অংশকে ৯ নং তোরাবগঞ্জ ইউনিয়ন হিসেবে দুটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়।

সংগ্রহ ও সম্পাদনা : হাছিব আর রহমান, নির্বাহী সম্পাদক, পাবলিক ভয়েস।

সূত্র : নকিব রেজওয়ান, নূর মোহাম্মদ ও সরকারী ওয়েবসাইট।

আরও পড়ুন :

করোনা পরিস্থিতিতে দিনমজুর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ইকরামুল মুসলিমীনের বিশেষ উদ্যোগ

করোনা মহামারিতে এ পর্যন্ত ৩০০ পরিবারকে সহায়তা প্রদান করেছে যুব আন্দোলন

মন্তব্য করুন