৪৯ বছরে লাল সবুজের স্বাধীনতা

প্রকাশিত: ২:৪৭ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০২০

আজ ৪৯ তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনটিতেই আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। ডাক এসেছিল হানাদারদের কবল থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার। ওই ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানি শোষকের হাত থেকে প্রিয় দেশকে মুক্ত করতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলার দামাল ছেলেরা।

যেদিন শুরু হয়েছিল এক সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। ২৬৬ দিনের সেই রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের সফল পরিণতিতে বিশ্বের বুকে জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন রাষ্ট্র, আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, প্রিয় বাংলাদেশ।

৪৯ বছর আগে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নেওয়া লাল সবুজের বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস প্রতি বছর বিভিন্ন আঙ্গিকে পালন করা হলেও করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকে এ বছর এ দিনটি পালন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে এবার স্বাধীনতা দিবস নতুন আবহ নিয়ে আসায় প্রস্তুতিও ছিল অনেক। কিন্তু মুজিববর্ষের উদ্বোধন অনুষ্ঠান স্থগিতের পর কভিড-১৯ রোগের ব্যাপক বিস্তার ঠেকাতে গোটা দেশকে অবরুদ্ধ করে রাখার মধ্যেই এবারের স্বাধীনতা দিবস এলো।

দিনটির প্রাক্কালে বুধবার জাতীয় উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “এ পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে আমরা এবারের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ভিন্নভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। “জনসমাগম হয়, এমন ধরনের সব অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মানুষকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা।”

স্বাধীন বাংলাদেশে এবারই প্রথম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান এমন কাটছাঁট করতে হল। সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধা জানানোর যে কর্মসূচি হয়, সেটা এবার হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে শিশু কিশোর সমাবেশ কিংবা প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজও হচ্ছে না। বাতিল করা হয়েঠেছ বঙ্গভবনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানও।

২৩ বছরের শোষণ থেকে বাঙালির মুক্তির আন্দোলনের শ্বাসরোধ করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হানাদার সেনাবাহিনী, চলেছিল গণহত্যা। এই আক্রমণ বাংলাদেশের প্রতিরোধ যুদ্ধের পথ তৈরি করে দেয়; পাকিস্তানের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২৬ মার্চ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধে নামে বাংলাদেশের জনগণ।

অপরদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানিরা বন্দি করে নেয় কিন্তু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বীর বাঙালি মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মুজিবনগর সরকারের পরিচালনায় নয় মাসের সশস্ত্র সেই সংগ্রামে আসে বিজয়। প্রশিক্ষণহীন নিরস্ত্র বাঙালিরা যেভাবে একটি সুশৃঙ্খল অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে তেমন সংগ্রামের দৃষ্টান্ত বিরল। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের আত্মদান, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম আর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয়। বাঙালি লাভ করে চিরকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।

স্বাধীনতার ইতিহাসে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরুর পর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের আগ মুহূর্তে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করতে দেশবাসীকে নির্দেশ দেন। তৎকালীন ইপিআরের ওয়্যারলেস থেকে সে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের সর্বত্র। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণায় সেদিনই ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে গোটা জাতি।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ। প্রথমে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হান্নান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পাঠ করেন।

এরপর ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন। তাই এই ঘোষণা দেশের জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একাত্মতার বার্তা হিসেবে দেশবাসীকে উজ্জীবিত করে এবং স্বাধীনতাযুদ্ধকে তরান্বিত করে।

এরপর ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার নিভৃত এক আমবাগানে শপথ নেয় নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, তার অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত এই সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে। তাদের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করে।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, “স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে আরও অনেক দূর যেতে হবে। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করাই হোক মুজিববর্ষে সকলের অঙ্গীকার।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, “২৬ মার্চ আমাদের জাতির আত্মপরিচয় অর্জনের দিন। পরাধীনতার শিকল ভাঙার দিন। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। “প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমরা আজ বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো বাস্তবায়ন করছি…বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।”

স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশবাসীসহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান।

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন