ভুল ধরিয়ে দেয়াই আলেমদের দায়িত্ব

প্রকাশিত: ১:০০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০
আলেমরা খালি ভুল ধরেন

বিজ্ঞানে আলেমদের অবদান কি ?

চিকিৎসাশাস্ত্রে আলেমদের অবদান কি ?

অর্থনীতিতে আলেমদের অবদান কি ?

জ্যোতিঃর্বিজ্ঞানে আলেমদের অবদান কি ?

সমাজ বিজ্ঞানে আলেমদের অবদান কি ?

রাষ্ট্র বিজ্ঞানে আলেমদের অবদান কি ?

নাস্তিক-আস্তিক বিজ্ঞানে আলেমদের অবদান কি ?

আধুনিক সমাজ নির্মানে আলেমদের অবদান কি ?

(এক) এমন শত প্রশ্ন প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বাতাসে ভেসে বেড়ায় !পত্রপত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিজ্ঞদের গোলটেবিল বৈঠক, অজ্ঞদের চা দোকানের আড্ডা সব সব জায়গাতেই স্রেফ একই প্রশ্ন ! আলেমরা কেন ভুল ধরে__এতো ভুল ধরে ? তারা কি করেছে এই জাতির জন্য ? জাতির বিনির্মানে তাঁদের অবদান কি ? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হননি এমন আলেম খুঁজে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । শিক্ষিত অশিক্ষিত, শহুরে গেঁয়ো, উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত দরিদ্র, ছাত্র শিক্ষক সবারই একই জিজ্ঞাসা! একই কৌতুহল!!

আমরা প্রতি মুহুর্তে, প্রতি কামেকাজে, প্রতিটি বলায়, প্রতিটি লেখায় ভুল করবো তো আলেমরা ভুল ধরবেন না তো কি করবেন আপনারাই বলুন? বলবেন আপনার আমার চোখেতো ভুল ধরা পড়ে না ! আপনি ঠিকই বলেছেন, আপনার আমার চোখে ভুল ধরা পড়ার কথাও না । আলেমদের চোখে পড়ে এজন্যই উনারা আলেম। আপনি আমি বুঝতে অক্ষম এর জন্যতো আলেমরা ভুল ধরা ছেঁড়ে দিতে পারেন না। শুকরিয়া আদায় করুন যে, আলেমরা এখনো ভুল ধরে দেয়, সঠিক পথ প্রদর্শন করে। যে দিন আলেমরা ভুল ধরা ছেঁড়ে দিবেন সেদিন পৃথিবীতে শুধু গোমরাহিই ছড়াবে। হেদায়েতের আলো কোনোদিন জ্বলে উঠবে না। আমরা ছোট ছোট কুপী জ্বালিয়ে কোনোদিন সূর্যে পরিণত করতে পারবো না আলেমদের সহযোগীতা ছাড়া।

প্রিয় ভাইয়েরা, সব জায়গাতেই যদি আলেমদের অবদান রাখতে হয় তবে আলেমদের কাজের আনজাম কে দিবে?

আসুন দেখে নেই আলেমদের কাজ কী ?

আলেমদের মূল কাজ হচ্ছে ভুল ধরা । আপনি বিশ্বাস করুণ আর নাই করুণ__মানুন আর নাই মানুন আলেমদের মূল কাজই হচ্ছে ‘ভুলধরা’ ও সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া। ডাক্তার যেমন চিকিৎসা করবেন তেমনি আলেমরা দীনের পথে চলবেন-চালাবেন, চলার পথে কোথাও ইসলামের বিপরীত কিছু করলে আলেমরা ভুল ধরবেন। সঠিক পথ দেখিয়ে দিবেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানিরা রাষ্ট্র চালাবেন, সমাজবিজ্ঞানিরা সমাজ নির্মান করবেন, অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতি ঠিক করবেন, আলেমদের কাজ হচ্ছে কোনটা হালাল কোনটা হারাম বলে দিবেন। সামগ্রিক মনিটরিং করবেন এবং ভুল করলে ভুল ধরবেন এবং হারাম পথ থেকে ফিরিয়ে হালাল পথের দিশা দিবেন।

(দুই) সোনালী যুগে একজন আলেম একই সাথে চিকিৎসা করতেন, ব্যবসা বাণিজ্য করতেন, দরস-তাদরিস দিতেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন, বিচার করতেন, তাযকিয়া করতেন এবং পাশপাশি ইমামতির কাজও করতেন! কিন্তু বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে আলাদা আলাদা ফন (বিষয়) প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় একজন আলেমের পক্ষে সব কিছু একসাথে করা রীতিমত অসম্ভব কাজ । আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত প্রাপ্ত ১/২ জন এমন বহুমুখী যোগ্যতাসম্পন্ন পাওয়া সম্ভব তবে এই একদুইজন দিয়েতো দুনিয়া চলবে না!

বর্তমান আলেমদের বড় একটা অংশ দরস-তাদরিসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। স্বাভাবিকের চাহিদার তুলনায় যা খুবই নগণ্য সংখ্যক! ইলমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শুধুমাত্র এই একটা সেক্টরেই অসংখ্য মানসম্মত আলেমের প্রয়োজন । দরস-তাদরিসের পাশাপাশি অধিকাংশ আলেমকেই ইমামতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ইমামতির দায়িত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খ পালনের পাশাপাশি ওয়াজ নসিহতের কাজও আনজাম দিতে হচ্ছে। ওয়াজ নসিহতের পাশপাশি দাওয়াত তাবলীগের অন্যান্য পথ ও পদ্বতি যেমন বই পত্র লিখা, ব্যবসা বাণিজ্য করা, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ ও সিয়াসাতি কর্মকান্ড পরিচালনা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আনজাম দিতে হচ্ছে, তাসাওফ তাজকিয়ার ময়দানে সময় দিতে হচ্ছে এবং এতসব করার পাশাপাসি যে কাজটা করতে হচ্ছে সেটা হলো মুসলমানদের সঠিক পথপ্রদর্শণ করা। নানা দিকদিয়ে নানা ইসলাম বিরুধী বিষয়াদি প্রতিনিয়ত ফুলে-ফেঁপে উঠছে। ইসলাম প্রিয় সাধারন মানুষদের নিয়ে তা প্রতিহত করতে হচ্ছে। কাদিয়ানী ফিতনা, শিয়া ফিতনা, মিশনারি ফিতনা, মাজার ও পীর পূজার ফিতনা ইত্যাদি ইসলামের রূপ নিয়ে ইসলামকে গ্রাস করে নিচ্ছে শুধুমাত্র আলেমরাই সাধারন মুসলমানদের নিত্য প্রতিরোধ করে চলেছেন। জানতুর মেহনত করছেন ইমান ধ্বংসী সব সয়লাব রুখে দেয়ার। আর কি কি দায়িত্ব পালন করতে হবে আপনারাই বলুন?

আলেমদের অবদান কী জানতে চান ! আপনি আমি আজকে নামাজ পরছি, কোরআন পড়ছি-শিখছি, রোজা রাখছি, হজ করছি, যাকাত দিচ্ছি, হালাল হারাম মেনে চলছি, পর্দা পুশিদার উপর আলম করছি, দাওয়াত দিচ্ছি, বিদআত মুক্ত ইসলাম পেয়েছি, শিরক মুক্ত থাকছি সর্বোপরি ইসলাম ব্যাপক কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি এসবই আলেমদের অবদান। আলেম হজরতরা শতাব্দীর শতাব্দীর, যুগের পর যুগ আমাদের জন্য প্লাটফর্ম তৈরি করে গেছেন আল্লাহর তাওফিকে আর আপনারা আমরা আরামসে ফল ভোগ করছি। শুধু একবার কল্পনা করুন, ইসলামের স্বকিয়তা , সৌন্ধর্য্য নিখুঁত রাখার বিনিময়ে গতশতকেই হাজার হাজার আলেমকে গাছে ঝুলিয়ে শহীদ করেছে বৃটিশরা। ভারতবর্ষের এমন কোন বৃক্ষ ছিলনা যেখানে কোন আলেমকে ঝুলানো হয়নি !এমন অসংখ্য ইতিহাস আপনাদের শুনানো যাবে যার ব্যাপ্তি এই ছোট লেখা কখনই ধারণ করতে সক্ষম নয়। ইসলামকে আজকে পর্যন্ত পৌঁছে দিতে আলেমদের ত্যাগ তিতিক্ষা অবদানের ইতিহাস রচনা করতে কয়েকশ স্বতন্ত্র কিতাব প্রয়োজন । তাঁদের আপরাধ কি ছিল জানেন ? ভুল ধরা । আজকে যেমন কোথাও ভুল দেখলেই ভুল ধরেন সেদিনও ভুলই ধরেছিলেন। সৌভাগ্য, উনারা সেদিন ভুল ধরেছিলেন, নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন নইলে আজ বড়োজোর ধুতি ফতোয়া পরে সরকারী অফিসে চাপরাশির কাজ করতে হত। বাপের দয়ার কল্যাণে পাওয়া নামটাই সুধু ইসলাম ও মুসলমানের নিদর্শন বয়ে বেড়াতো আর কোথাও ইসলাম পাওয়া যেতো না।

(তিন) আলেম বিদ্বেষ মানে ইলমের সাথে শত্রুতা । এটা বড় ভয়াবহ রোগ। খতরনাক প্রক্রিয়া। ইসলামকে মিটিয়ে দেয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। জনগণকে আলেমদের থেকে যত দূরে সরিয়ে দেয়া হবে, তাঁদের মনে যত বেশি ও দ্রুত “আলেম বিদ্বেষ” তৈরি করে দেয়া হবে ইসলামকে তত দ্রুত মিটিয়ে দেয়া সম্ভব হবে। আলেমদের কথার প্রতি অনাস্থা, নসিহার প্রতি অবজ্ঞা, ফতোয়ার বিরুদ্ধাচারণ, নির্দেশনার বৈপরীত্য, মতামতের প্রতি কটূক্তি যখন সমাজে সয়লাব হবে তখন ইলম আস্তে আস্তে উঠে যাবে। আলেমরা হয়ে যাবেন একঘরে। বিদআত, শিরক, কুফুর, বাতিল, ফিতনা ফ্যাসাদ দ্রুত সমাজে জায়গা করে নিবে। ইসলাম তার মৌলিকত্ব ও সৌন্ধর্য্য হারাবে। বিকৃত ইসলাম সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আলেমদের মর্যাদা দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে কোরআনের কতিপয় আয়াত ও হাদিস –

আল্লাহ তাআলা বলেন,‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহ যাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন তাদেরকে উচ্চমর্যাদায় উন্নীত করবেন। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত।’ (মুজাদালাহ ৫৮/১১)।

অন্য হাদিসে এসেছে, আবু উমামা আল-বাহিলি (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সামনে দু’জন লোকের কথা উল্লেখ করা হলো। যাদের একজন আলিম অপরজন আবিদ। তখন তিনি বলেন, আলিমের মর্যাদা আবিদের ওপর। যেমন আমার মর্যাদা তোমাদের সাধারণের ওপর। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, নিশ্চয়ই তার প্রতি আল্লাহ রহমত করেন এবং তার ফেরেশতামন্ডলী, আসমান-জমিনের অধিবাসী, পিপীলিকা তার গর্তে থেকে এবং এমনকি মাছও কল্যাণের শিক্ষা দানকারীর জন্য দোয়া করেন। ( তিরমিজি হা/২৬৮৫; মিশকাত হা/২১৩, সনদ হাসান।)

মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং এমন কেন হয় না যে, তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে এক একটি ছোট দল বের হবে, যাতে তারা দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করতে পারে। আর যাতে তারা নিজ কওমকে ভয় প্রদর্শন করতে পারে যখন তারা ওদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে, যেন তারা সতর্ক হয়।’ (সূরা তওবা ৯/১২২)

প্রিয় ভায়েরা আমার, আমরা আমাদের পরিসরে থেকে যতটুকু সম্ভব দ্বীনের খেদমতের আনজাম দিয়ে যাবো__আলেমদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রাখবো এবং প্রতিটি কাজেই উনাদের পরামর্শ গ্রহণ করবো। উনারা যতটুকু আগাতে বলবেন ততটুকুই আগাবো আর উনারা যখন থেমে যেতে বলবেন বিনা প্রশ্নে সেখানেই থেমে যাবো। দীনের কল্যাণে উনারাই আমাদের পথপ্রদর্শক, রাহবার। নিজেদের মনে আলেমদের প্রতি বিদ্বেষ লালন করে নিজেদের দুনিয়া ও আখেরাত বরবার করবো না।

আরও পড়ুনঃ ইন্টারনেটে ইসলাম প্রচার : তরুণ আলেমরা এগিয়ে আসুক

সাকিব মুস্তানসির, ইসলামী লেখক, তরুণ আলেম

মন্তব্য করুন