সিটি নির্বাচন : শিরদাড়া টান করে কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলনের নেতারা

প্রকাশিত: ৭:৩৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০২০

পলাশ রহমান : ভোটের হাল-হকিকত দেখে অনেকের মনে হতে পারে- এ সরকারের অধিনে অন্য কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা আর ঘোড়ার ঘাস কাটা একই কথা। কারণ এ সরকার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী একতরফা নির্বাচন করে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কোমড় ভেঙ্গে দিয়েছে।

এর পরেও দেশপ্রেমিক বিরোধী দলগুলো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। সরকারকে বার বার সুযোগ করে দিয়েছে। বিশেষ করে গত সাধারণ নির্বাচনে দেশের সব বিরোধী দল অংশগ্রহণ করে সরকারকে ‘কাঁচা দুধ’ দিয়ে গোসল করার সুযোগ করে দিয়েছিল। সরকার তা গ্রহণ করেনি।

সরকার ও মেরুদন্ডহীন নির্বাচন কমিশন একের পর এক প্রহশনের নির্বাচন করে দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিস্ক্রীয় করে ফেলেছে। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দমন নিপিড়ন করে নির্বাচন বা রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে দুরে রাখার চেষ্টা করেছে এবং সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে যাতে জনগণ ভোট দিতে না যায়।

ঐতিহাসিক ভাবে শান্তিপ্রিয় মানুষের দেশে জনগণকে যদি ভোটবিমূখ করা যায় তবে সরকারের স্বৈর-ইচ্ছা পুরণে বিশেষ কোনো বেগ পেতে হয় না। সুতরাং বিরোধী দল দমন এবং জনগণকে ভোটবিমূখ করার ষড়যন্ত্র সরকার প্যারালাল চালিয়েছে।

কোনো ভোটার যদি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শোনেন তার ভোট আগেই দেয়া হয়ে গিয়েছে বা ভোটকেন্দ্রে গেলে যদি টোকাই গোছের কেউ অপমানসূচক কথা বলে তবে এমনিতেই ভদ্রপাড়ার মানুষরা ভোট দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে নারীরা তো ভোট দিতে যায়’ই না। তাছাড়া ভোটাররা যদি বিশ্বাস করে নেয় ভোট দেয়া হোক বা না হোক ফল পূর্বনির্ধারিত, তাহলেও ভোটের আগ্রহ হারিয়ে যায়।

বর্তমান সরকার অত্যাধিক সফলতার সাথে এখন পর্যন্ত এই কাজগুলো বিনা-বাধায় করে যেতে সক্ষম হয়েছে, হচ্ছে। যা তাদের মনোবল বাড়াবাড়ি রকম বাড়িয়ে দিয়েছে।

পড়ুন : পদত্যাগের কথা শুনে সিইসি বললেন আলহামদুলিল্লাহ (ভিডিও)

প্রশ্ন উঠতে পারে এর থেকে কী পরিত্রাণের কোনো পথ নেই? অবশ্যই আছে। এর জন্য ভালো নেতা দরকার। ভালো রাজনৈতিক দল দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভালো নেতা, ভালো রাজনৈতিক দলের সংকট শুরু হয়েছে সেই স্বাধীনতার পরে থেকে।

বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নেতারা জনগণের কাছে বার বার পরিক্ষীত। এসব নেতা এবং দলকে ভোট দিয়ে জনগণ বার বার প্রতারিত হয়েছে। কেউই সুশাসন দেয়নি, দিতে পারিনি। যে ধারাবাহিকতার চূড়ান্তরুপ এখন দেখছে দেশ বিদেশের মানুষ।

এদিকে দেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো কোনো দিনই গণমানুষের আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারেনি। জনগণ ইসলামপন্থী কোনো দল বা নেতার উপর আস্থা করতে শেখেনি। ইসলামপন্থী দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামি কিছুটা অগ্রসর হলেও এখন তাদের মাজা ভেঙ্গে গেছে। আসপাশ দিয়ে যে যতোই ফুসফাস করুক না কেনো জামায়াত এত দক্ষ যোগ্য দল হলে তার প্রতিফলন দেশবাসী দেখতে পেতো। সুতরাং গালগপ্পে কান দিয়ে লাভ নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতা বিরোধী কোনো শক্তি রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নজির নেই। সাময়িক মোচড়ামুচড়ি দেখে মনে হতে পারে তারা প্রতিষ্ঠিত বা জনগণ তাদের মেনে নিয়েছে। আসলে তাদের ভেতরটা হয় উঁই এর ঢিবির মতো ফাকা।

জামায়াতে ইসলামিকে দেশের গণমানুষ কখনোই গ্রহণ করেনি। তারা যতোটুকু আনুকুল্য পায় তা ‘ইসলামের’ জন্য। ইসলামি আদর্শের কথা বাদ দিয়ে তারা রাজনীতিতে নেমে দেখুক, এক মিনিটও টিকতে পারবে না। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের টিকতে দেবে না।

জামায়াতের বাহ্যিক অগ্রগতি যেটুকু হয়েছে তা ‘ইসলাম’ কে ব্যাবহার করে। তারা ইসলামের আদর্শের কথা বলে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মন কিছুটা নরম করতে পেরেছে। আর সেটার উপর ভরকরেই তাদের এতদিন টিকে থাকা।

দেশের রাজনীতিতে জামায়াতের টিকে থাকার পেছনে অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর ব্যাপক দায় আছে। কারণ জামায়াতের পরে দেশের আর কোনো ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল শক্ত ভাবে দাঁড়াতে পারেনি। নির্ভর করার মতো জননেতা তৈরী হয়নি। আর এই সুযোগটা খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে জামায়াত। অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর ব্যার্থতার কারেণ দেশের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েছে জামায়াতের প্রতি মন নরম করতে। এ দায় ইসলামপন্থী দলগুলোর সম্মিলিত।

ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জনআস্থা অর্জনকারী দল না থাকার সুযোগটা ব্যাবহার করেছে, করছে জামায়াত। তাদের এই একক আধিপত্যে কিছুটা হানা দিয়েছে ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’। দলটি নিরবে নিভৃতে বেশ খানিকটা এগিয়েছে। গত নির্বাচনে তারা সকল জোট উপেক্ষা করে একক ভাবে তিনশ আসনে প্রার্থী ঘোষনা করেছে। প্রতাপের সাথে ঢাকাসহ দেশের সব কটি সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করেছে।

রাজনীতির মূলশ্রোতে হভায় এক্সেস পাওয়া এই দলটিতে এখন দক্ষতা অর্জনের লড়াই চলছে। তাদের রাজনৈতিক আইডিয়া মানুষের কাছে পৌছে দেয়ার সংগ্রাম চলছে। এসব লড়াই সংগ্রামে তারা যদি টিকে থাকতে পারে, নেতৃত্বের কারিশমা দেখাতে পারে দেশের মানুষ রাজনীতির তৃতীয় শক্তি হিসাবে তাদের গ্রহণ করতে এখনি প্রস্তুত আছে। যার প্রতিফলন অতীতের নির্বাচনগুলোয় দেখা গিয়েছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখন রাজনীতির যে ট্রাকে আছে এটাকে ধরে রাখতে পারলে জামায়াত অটোমেটিক নিস্ক্রীয় হয়ে যাবে। তাদের বিরোধীতার জন্য আলাদা করে সময় ব্যায় করার দরকার হবে না। ইতমধ্যেই তাদের দুয়ারে কড়া নাড়তে শুরু করেছে মুসলিমলীগের ভাগ্য।

ইসলামী আন্দোলন যদি টিকে থাকতে না পারে, নেতৃত্বের কারিশমা দেখাতে না পারে, জনআস্থা ধরে রাখতে না পারে তখন কী হবে? অভিজ্ঞজনরা মনে করেন, দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির চরম ক্ষতি হয়ে যাবে। নতুন করে কাউকে জনআস্থায় আসতে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। প্রচুর তেল-খড়ি পোড়াতে হবে। সুতরাং ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন হিসাব করে ফেলা দরকার।

ঢাকা সিটির নির্বাচনে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের জালিয়াতির বিরুদ্ধে বেশ গোছালো এবং স্মার্ট প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে। দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা গাজী আতাউর রহমানের নেতৃত্বে আন্দোলনের প্রতিনিধিরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে দেখা করেছেন এবং নির্বাচনী ব্যার্থতার কারনে তার সরাসরি পদত্যাগ দাবি করেছেন।

পড়ুন : আপনি ইজ্জতের সাথে পদত্যাগ করুন: সিইসিকে ইসলামী আন্দোলন (ভিডিও)

নির্বাচন কমিশনে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্য ছিল অত্যান্ত সাহসী এবং স্পষ্ট। তারা শিরদাড়া টান করে কথা বলেছেন। যেমনটা প্রত্যাশা করে দেশের মানুষ। এখন আগামীর প্রস্তুতি গ্রহণ করার সময়। ভোটের মাঠে সরাসরি কাজ করা নেতাকর্মীদের অভিজ্ঞাতা সংগ্রহ করা জরুরী। তাদের কথা শোনা জরুরী। তথ্য উপাত্ত সংরক্ষণ করা জরুরী। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ণ করা জরুরী। তাদের কাজের প্রশংসা করা জরুরী।

ভোটের কাজ করতে গিয়ে কারো মধ্যে মান-অভিমানের সৃষ্টি হলে তা বুদ্ধিমত্তার সাথে নিরসন করা বড় নেতাদের দায়িত্ব। তাছাড়া আন্দোলনের দুই মেয়র প্রার্থী প্রহসনের নির্বাচনে খরচের ক্ষতিপূরণ চেয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। নির্বাচনের পরদিন একটা বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়া যেতো। জনমত এমনটাই ভেবেছিল।

আমি মনে করি, প্রহসনের নির্বাচনে বিচলিত হওয়ার বিশেষ কোনো করণ নেই। বর্তমান সরকারের কাছে এর থেকে ভালো নির্বাচনের আশা সবাই ছেড়ে দিয়েছে। দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে একজন ভালো নেতার অপেক্ষায়, একটি দেশপ্রেমিক যোগ্য দলের প্রতিক্ষায়।

লেখকঃ প্রবাসী সাংবাদিক, সমালোচক

মন্তব্য করুন