ভোট ও ভোটার; ইসলামের নির্দেশনা

প্রকাশিত: ৬:২০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০২০

মুফতী এইচ এম আবু বকর সিদ্দীক

ঢাকা সিটি নির্বাচন ভোটারদের দরজায় করাঘাত করছে। বিভক্ত ঢাকা সিটির দ্বিতীয় নির্বাচন এটি। ২০১১ সালে বিল পাশ হয়ে ২০১৫ সালে প্রথম ঢাকা উত্তর সিটি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মেয়র নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যত বিভক্ত হয় মেগা সিটি ঢাকা।

আগামী ১লা ফেব্রুয়ারী উভয় সিটিতেই একযোগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থীরা ঘামঝরানো পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকর্ষণ করতে চাচ্ছেন তারা। এইসব প্রতিশ্রুতি অনেকাংশেই রাজনৈতিক হয়ে থাকে। সাবেক মেয়ররা তাদের প্রতিশ্রুত এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করলে এতোদিন পরে প্রতিশ্রুতি দেয়ারও তেমন কিছু বাকি থাকতো না।

এজন্যই ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে যারা কথায় বিশ্বাসী তাদের প্রতিশ্রুতিতে প্রতারিত না হয়ে আল্লাহভীরু, ন্যায়পরায়ন ও সত্যবাদী প্রার্থীকে ভোট দেয়া।

ইসলামে ভোট বা মতামত প্রদানকে ছোট করে দেখা হয়নি। ভোটের তাৎপর্য অনেক বেশি। সর্বসাধারণের জন্য বক্ষমান আলোচনায় ইসলামি শরীয়তে ভোটের বিধান ও গুরুত্ব তুলে ধরার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।

ভোট কী?

পাকিস্তানের গ্রান্ড মুফতী হযরত মুহাম্মাদ শফী রাহ. এ সংক্রান্ত একটি পুস্তিকায় লিখেছেন যে, ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট হচ্ছে তিনটি বিষয়ের সমষ্টি। ১. সাক্ষ্য প্রদান ২. সুপারিশ ও ৩. প্রতিনিধিত্বের অথরিটি প্রদান।

কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন এমন সকলেরই জানা রয়েছে যে, শরীয়তে উপরোক্ত তিনটি বিষয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্র বা নগরীর নীতিমালা তৈরির এবং তা পরিচালনার জন্য প্রতিনিধিত্বের সনদ দেওয়ার মানে হচ্ছে প্রতিনিধিত্ব দানকারী (ভোটার) তার ভবিষ্যত সকল কার্যকলাপের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিচ্ছে। এমনিভাবে সুপারিশের বিষয়টিও প্রনিধানযোগ্য। কুরআনুল কারীমের ভাষায় ‘যে ভালো সুপারিশ করবে সে তার নেকীর ভাগী হবে। আর যে মন্দ সুপারিশ করবে সেও মন্দের হিস্যা পাবে।’ -সূরা নিসা, আয়াত ৮৫

১. ভোট ও সাক্ষ্য

ভোটের মধ্যে যে তিনটি বিষয় রয়েছে তথা, সাক্ষ্য প্রদান, সুপারিশ, প্রতিনিধিত্বের সনদপ্রদান এর মধ্যে ‘শাহাদত’ বা সাক্ষ্যের বিষয়টি মৌলিক। অর্থাৎ কাউকে ভোট দেওয়ার অর্থ হল, তার ব্যাপারে এ সাক্ষ্য প্রদান করা যে, লোকটি ভালো এবং যোগ্য। এখন যদি যথাযথ জায়গায় সীল দিয়ে এ সাক্ষ্য প্রদান করা হয় তবে সে হবে সত্য সাক্ষী অন্যথায় হবে মিথ্যা সাক্ষী। আর মিথ্যা সাক্ষ্য যে কত বড় কবীরা গুনাহ ও হারাম কাজ তা কি কারো অজানা রয়েছে? অবশ্য বর্তমান বে-দ্বীনি ও বস্তুবাদিতার যুগে অনেকের কাছেই মিথ্যা কোনো বিষয়ই নয়। কথায়, লেখায়, ক্ষমতায়, আদালতে, বই-মিডিয়ায়, বক্তৃতা-ভাষণে সব জায়গাতেই মিথ্যার সয়লাব। অথচ মানবতার মুক্তির দূত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠিন ভাষায় মিথ্যা ও মিথ্যা সাক্ষ্যের নিন্দা করেছেন।

সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় হযরত আবু বকর রা. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ একদা এক জায়গায় হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় তিন তিনবার সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহগুলোর মধ্যে বড় কবীরা গুনাহের কথা বলব? সাহাবীগণ হ্যাঁ সূচক উত্তর দেওয়ার পর তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা (এ দুটি কথা বলার পর তিনি সোজা হয়ে বসলেন) এবং বললেন, শুনে নাও! মিথ্যা সাক্ষ্য অনেক বড় কবীরা গুনাহ।

সুনানে তিরমিযীর একটি হাদীসে মিথ্যা সাক্ষ্যকে শিরকের সমান অপরাধ বলা হয়েছে।সু-বিখ্যাত হাদীস বিশারদ শামসুদ্দীন যাহাবী রাহ. মিথ্যা সাক্ষ্যকে চারটি বড় গুনাহের সমষ্টি বলে আখ্যা দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে : ১. নিজে মিথ্যা ও অপবাদ আরোপ করছে। ২. যার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছে তার উপর যুলুম করছে। ৩. যার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছে তার উপরও প্রকৃতপক্ষে যুলুম করছে কারণ, সে যা কিছু পাওয়ার যোগ্য ছিল না এ ব্যক্তি মিথ্যা সাক্ষীর মাধ্যমে তাকে এর অধিকারী করে তুলছে এবং এভাবে তাকে করছে জাহান্নামী। ৪. মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার একটি হালাল কাজকে হারাম বানিয়ে নেওয়া।

মিথ্যা ও অবাস্তব সাক্ষ্যের ক্ষতি ও খেসারত বলে শেষ করার মতো নয়। হকদার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, অযোগ্য ও অপদার্থের উত্থান, দুর্নীতিবাজ ও শোষকশ্রেণীর লোকদের ক্ষমতায়ন- এসবই মিথ্যা সাক্ষ্যের ক্ষতি। এর কারণে ইনসাফপছন্দ এবং যোগ্য ও সৎ-আমানতদার ব্যক্তিগণ নিরবতা পালন করে রাষ্ট্র ও জনগণের খেদমত থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে বাধ্য হন।

২. ভোট ও সুপারিশ

ভোটের দ্বিতীয় অবস্থান হল তা সুপারিশ। অর্থাৎ কেউ কোন প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অর্থ হল সে উক্ত প্রার্থীকে নির্বাচিত হওয়ার এবং যোগ্য হওয়ার সুপারিশ করছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
অর্থঃ যে লোক সৎকাজের জন্য কোন সুপারিশ করবে তা থেকে সেও একটি অংশ পাবে। আর যে লোক সুপারিশ করবে মন্দ কাজের জন্য সে তার বোঝারও একটি অংশ পাবে।- সূরা নিসা,আয়াত -৮৫

সৎকাজের সুপারিশ হল,যোগ্য দ্বীনদার লোকের জন্য সুপারিশ করা। যে আল্লাহ এবং বান্দার হক যথাযথভাবে আদায় করে। মন্দ কাজের সুপারিশ হল অযোগ্য কোন ফাসেক বা জালেমকে ভোটের মাধ্যমে জাতীর উপর বোঝা ও যন্ত্রনা হিসাবে চাপিয়ে দেওয়া। উপরোক্ত আয়াত স্পষ্ট বুঝে আসে যে, আমাদের ভোটের দ্বারা নির্বাচিত প্রার্থী ভালো মন্দ যা কিছু করবে তা আমাদের আমল নামায় যুক্ত হবে। এবং আমরাও তাতে শরীক গন্য হব।

৩. প্রতিনিধিত্বের অথরিটি প্রদান

ভোটের তৃতীয় আর একটি দিক হল প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান অর্থাৎ কেমন যেন ভোটার, প্রার্থীকে জাতীর সেবার প্রতিনিধি বানাচ্ছে। আর এই প্রতিনিধিত্ব যদি ব্যক্তিবিশেষে সীমাবদ্ধ থাকে তবে তার দায়ভার ব্যক্তির উপর বর্তায়। অথচ এখানে বিষয়টি ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এখানে তার প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি পূরো জাতীর সাথে সম্পৃক্ত। কাজেই সে যখন কোন অযোগ্য জালেম পাপাচারীকে প্রতিনিধিকে বানাবে তথা ভোট দিবে তখন উক্ত প্রতিনিধি দ্বারা যাদের হক নষ্ট হবে, তার গোনাহের একটি অংশও তার উপর বার্তাবে।

ভোট অবশ্যই দিতে হবে

উপরোক্ত আলোচনা পড়ে প্রশ্ন আসতে পারে যে, তা হলে তো বর্তমান সমাজে কোনো কোনো আসনের লোকদের ভোট দেওয়াই সম্ভব হবে না। কারণ, এমন লোক তো পাওয়া যাবে না, যার সপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করা যায় এবং এ কারণে অনেকে ভোট দেওয়া থেকে বিরতও থাকেন, এমনকি বহু লোক ভোটার হতেও আগ্রহী হন না। সাধারণ বিবেচনায় এ চিন্তা যুক্তিযুক্ত মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট না দেয়া গোনাহ। সুতরাং ভালো, মন্দের ভালো বা তুলনামূলক কম ক্ষতিকে বেছে নেওয়া এবং অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করাটা উত্তম পন্থা।

অবশ্য যেখানে আল্লাহভীরু, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী আছেন সেখানে কোনো ফাসেক কিংবা ইসলাম বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী দলের প্রতিনিধিকে কিছুইতে ভোট দেয়া যাবেনা, নচেৎ ভোটের খেয়ানত হবে।

বরং কারো ব্যাপারে যদি খোদাদ্রোহিতা, ইসলামবিরোধীতা, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ-বিরোধী হওয়ার সুস্পষ্ট আলামত থাকে তবে ঐ অসৎ ব্যক্তির বিজয় ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর পক্ষে ভোটারাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে।

সবশেষে বলছি, যেহেতু ভোট একটি রায় বা সাক্ষ্য তাই এ ভোট প্রদানের ব্যাপারে প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে। কেননা, অন্যায় করা আর অন্যায়কে সমর্থন করা একই অপরাধ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কল্যাণকর কাজ এবং তাকওয়ার ব্যাপারে (একে অপরের) সহযোগিতা করো। আর গোনাহ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে সাহায্য-সহযোগিতা করো না।’ -সূরা আল মায়েদা : ২

ভোট প্রদান বা সমর্থনের মাধ্য দিয়ে একটি দেশ ও জাতির ভবিষ্যদ্ভাগ্য নির্মিত হয়। সুতরাং প্রকৃত সৎ, যোগ্য, নিষ্ঠাবান, মানবদরদী, সমাজসেবক খোদাভীরু প্রার্থীকে সমর্থন করতে হবে। অন্যথায় অসৎ, অযোগ্য, প্রতারক, আল্লাহবিমুখ প্রার্থী ক্ষমতার মসনদে সমাসীন হলে শুধু সে নয়- গোটা সমাজ, দেশ ও জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যার কুফল আমাদের নাগরিক জীবনে, ধর্মীয় জীবনে ও পরকালীন জীবনে ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার তাওফিক দিন। আমীন।

আই.এ/

মন্তব্য করুন