ইসলামের প্রতি তরুণদের ভালবাসা ও দায়িত্বশীলদের খেয়ালিপনা

প্রকাশিত: ৫:১৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৭, ২০২০

নূরুল করীম আকরাম ।।

দিনদিন ইসলাম নিয়ে তরুণদের আগ্রহ যতই বাড়ছে, ততই ইসলাম কে অনাগ্রহ, উপহাস, সস্তা ও ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত করার আয়োজন চলছে। ইসলাম নিয়ে তারুণ্যের এই উচ্ছাস টা এশিয়ার চেয়ে পাশ্চাত্যে তুলনামূলক আরও বেশি। এশিয়ার মধ্যেও মুসলিম প্রধান দেশগুলোর চেয়ে ভারতে কিংবা মিয়ানমারেও আগ্রহের কমতি নেই। এর পুরো ক্রেডিটটাই পশ্চিমের ইসলামোফোবিয়া’র।

এটা ফোবিয়ার জন্মদাতাদের জন্য হীতে বিপরীত হয়েছে। যদিও তাৎক্ষণিক (প্রায় এক দশক) মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসেবে ইসলামই উপকৃত হয়েছে বেশি। মুসলমানদের কে অযৌক্তিক হয়রানি, মুসলিম দেশগুলোতে নির্বিচার আক্রমণ, ইসলাম কে সন্ত্রাসবাদের আখ্যাদানসহ হীন সব কর্মই তারা করেছে এই ফোবিয়া থেকে।

ফলশ্রুতিতে পাবলিক সিম্প্যাথি টা ইসলামের পক্ষেই এসেছে। তরুণপ্রজন্ম অনুসন্ধিৎসু হয়েছে। যদ্দরুন বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে ইয়োরোপ-আমেরিকায় ইসলাম কে নতুন করে জানা, গবেষণা করা এবং আরোপিত অভিযোগগুলোর অসত্যতা বুঝতে পারার পর ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার মাত্রা টা দিনদিন বেড়েছে। সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টার এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে, আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ আমেরিকায় মুসলমানের সংখ্যা দ্বিগুণে পরিণত হবে।

বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের পর যখন টেরোরিজমের মিথ্যে দোহাই দিয়ে ইরাক আফগান চেসনিয়া সোমালিয়া লেবাননসহ মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে জঙ্গি ঘাটি আছে বলে আক্রমন ও দখলদারিত্ব চালানো হলো, নির্বিচারে মুসলিম নারী-শিশুদেরও হত্যা করা হলো, তখন ইসলামের ব্যাপারে সাধারণ মুসলমানরা তো সিরিয়াস হলোই; সাথে সাথে গোটা ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে অমুসলিম থেকে মুসলিম হওয়ার হারও বেড়ে গেল বহুগুনে। সহস্রাধিক মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হলো। যা ছিল পশ্চিমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য চরম চপেটাঘাত।

সামগ্রিকভাবেই যখন দমন-পীড়ন দিয়ে ইসলামের ক্ষতির চেয়ে লাভের পাল্লাটাই ভারী হতে লাগলো, তখন নীতিনির্ধারকরা তাদের কৌশলে মৌলিকভাবে পরিবর্তন নিয়ে আসলো। যার ফলে মুসলিম ভার্সেস অমুসলিম যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা টা নিয়মতান্ত্রিকতার আবর্তে চলে আসলো আর মুসলিমরা পারষ্পরিক কলহ-বিবাদে জড়িয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করতে থাকলো। অতি সাম্প্রতিক মার্কিন প্রশাসন পরিচালিত হামলায় সময়ের শ্রেষ্ঠ সমরবিদ ইরানের কাসেম সোলাইমানীর মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী মুসলিমদের পারষ্পরিক কলহ’ই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

অদূর অতীতে মিয়ানমারে মুসলিমনিধন ও দেশান্তর এবং তৎপরবর্তী তাদের ‘ঠিকানা সংগ্রাম, সন্তান জন্মদানের হার, চালচলন ও মানসিকতা’ কে কেন্দ্র করে মুসলিম দেশসমগ্র ছিল দ্বিধাবিভক্ত।

বাংলাদেশেও ইসলাম নিয়ে নতুন প্রজন্ম সিরিয়াস হয়ে উঠেছে তখনই, যখন ইসলাম আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে অযাচিত আরোপ, অনাকাঙ্ক্ষিত নিষেধাজ্ঞা, যখন তখন দমন-পীড়নসহ ইত্যকার অন্যায় আচরণের ফলে ধর্মবিমুখরা ধার্মিক আর অচেতনরা সচেতন হতে থাকে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা ইসলাম নিয়ে কিউরিয়াস হয়, জানতে শুরু করে মানতে শুরু করে। “৯৬ শতাংশ মুসলমানদের মধ্যে পরিচালিত প্রথম আলোর তারুণ্য জরিপ ২০১৯-এ ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশই বলেছেন, তাঁরা ধর্মচর্চা করেন।” ফলাফল টা এখানেও ‘হীতে বিপরীত’ হয়।

পাঠক খেয়াল করে থাকবেন, বাংলাদেশেও একটা সময় পর্যন্ত ইসলাম অনেক বেশি অযৌক্তিক স্নায়ু ও শারীরিক আক্রমণের শিকার হতো। এখন যে কমে গেছে তা না। গুণিতকহারে বেড়েছেও হয়তো। কিন্তু এখন নীতিনির্ধারকরা কৌশলী ভূমিকায় সচেতন আচরণ করছে। লাঠি না ভেঙে সাপ মারার পন্থায় অগ্রসর হচ্ছে রাষ্ট্রশক্তি ও মদদদাতারা। যার কারণে এখন ইসলামের ওপর আপতিত কোন সংকট, প্রশ্ন বা সমস্যা নিয়ে মুসলমানরা নতুন সমস্যায় নিপতিত হচ্ছে। শত্রুর আক্রমন ইস্যুতেও নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে নতুন উত্তাপ তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি ঘোলাটে থেকে আরও ঘোলাটেতর হচ্ছে।

কয়েকটি উদাহরণ

১. ঐতিহ্যগতভাবেই সামাজিক যে কোন অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রথম আওয়াজ কওমি মাদরাসা থেকেই উঠতো এবং অঘোষিতভাবেই মাদরাসাগুলো কে কেন্দ্র করে সামাজিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল। ইসলামবিরোধী শক্তির জন্য যা ছিল চরম আতংকের। এই আতংক থেকেই ইতোপূর্বে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আর গুটি কতক অবিশ্বাসবাদী যখন কওমী মাদরাসা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলো, জঙ্গি আস্তানা বললো, অনুৎপাদনশীল খাত বললো, তখন ঠিকই আমজনতা পাশে এসে দাঁড়ালো। হলো হীতে বিপরীত। সর্বমহল সিম্প্যাথি দেখিয়ে এগিয়ে আসলো।

রাষ্ট্রশক্তি সেটাকে ভিন্নভাবে মোকাবেলা করলো। পুরনো ‘সরকারী সনদ ও চাকরির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসলো। এতে আমরা কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে গেলাম, শক্তি খর্ব হতে থাকলো। মানুষের আস্থার জায়গা হারালাম এবং এর পরপরই কওমী মাদরাসার ভেতরগত অনুচ্চারণযোগ্য সমস্যাগুলোও (সত্য-মিথ্যা) বেশি বেশি গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে শুরু করলো আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলাম কিন্তু করার কিছু থাকলো না। এখন সিম্প্যাথির পরিবর্তে ছি ছি বরাদ্দ হলো।

২. আওয়ামী সরকার প্রথম যখন সরকারি মাদরাসায় মহিলা শিক্ষিকা, সরকারি অফিসে প্রধানমন্ত্রীর ছবিসহ ইত্যাদি (বেপর্দা) বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করলো, তখন ঠিকই ধর্মভীরু মানুষ আঁৎকে উঠেছিলো, সেটা নিয়ে প্রচণ্ড হৈচৈ হলো, শোরগোল উঠলো হুজুরদের পক্ষ থেকে।

রাষ্ট্রশক্তি এটাকেও ভিন্নভাবে মোকাবেলা করলো। কালক্রমে উম্মাহর জরুরি (!) ইস্যুতে নারীর সঙ্গে উন্মুক্ত বৈঠকের আয়োজন হলো এবং এটিকে কেন্দ্র করে আমরা নানান মতে পথে বিভক্ত হয়ে গেলাম। তারপর ধীরে ধীরে এখানেও আমরা প্রচণ্ড মাত্রায় হোচট খেলাম। বিরোধী পক্ষ বিজয়ী হলো আমরা হেরে গেলাম। এখন অন্ধ বোবা বধিরের ভূমিকায় চলাটাই উপযুক্ত পদক্ষেপ।

৩. তাবলীগ জামাত কে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর সর্ব বৃহত্তর এক আত্মিক ঐক্য ছিল। প্রতিনিয়ত তাতে তারুণ্যের অংশ বৃদ্ধি ও কার্যক্রমের প্রবৃদ্ধি ছিল শত্রুপক্ষের জন্য হতাশা ও আতঙ্কের। ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ মদদে তি কিভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল (বিশেষ করে বাংলাদেশে) তা কারোই অজানা নয়।

৪. এই সরকারের প্রথম মেয়াদেও বেশ কয়েকবার ওয়াজ-মাহফিল বন্ধ করা নিয়ে আলোচনা উঠেছিল। সংসদেও যুক্তি-পাল্টা যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছিল। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছে সাধারণ মানুষ। বন্ধ করা তো গেলই না; বরং হীতে বিপরীত হলো। ফলশ্রুতিতে সরকার আর সেদিকে অগ্রসর হতে পারেনি।

কিন্তু এর পরপরই দেখা গেল বাজারে বেশ কিছু ভাঁড় টাইপের বক্তার আগমন হলো, ইতোপূর্বে যাদের কখনো দেখা যায়নি। তারা যাচ্ছেতাই বলতে শুরু করলো মাহফিলের স্টেজে। ওহাবী-সুন্নী, কওমী-জামায়াত ও সালাফী-মাযহাবীসহ ইসলামের ভেতরগত দ্বন্দ্বপূর্ণ বিষয়াবলী নিয়ে প্রকাশ্যে উসকানিমূলক আওয়াজ ছড়াতে লাগলো তারা। পরিস্থিতি পর্যায়ক্রমে ঘোলাটে হতে থাকলো।

(এখানে বলে রাখা ভাল যে, মূলধারার হকপন্থী মুরুব্বিগণ সর্বদাই উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থ ও ঐক্যের জন্য ঐকান্তিক চেষ্টা সবসময়ই করেছেন এবং দ্বান্দ্বিক বিষয়ে সমাধান দেয়ার চেষ্টা করছেন।)

এরপর নিজেদের ভুলে বা শত্রুর কৌশলে যেভাবেই হোক বর্তমানে আমরা ওয়াজ-মাহফিল কে ঠিক এমন একটা জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছি; যেসব সাধারণ মানুষ তখন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, তারাই এখন চরম বিরক্তি প্রকাশ করছে।

লেখক: ইসলামী  শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের সেক্রেটারি জেনারেল 

আই.এ/

মন্তব্য করুন