দুই যুগে প্রতিবেশি বন্ধুরা হত্যা করেছে ১২২৫ বাংলাদেশিকে

প্রকাশিত: ৮:২৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২০

পাবলিক ভয়েস: ২০১১ সালে বিএসএফ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পাচারকারী ও অবৈধপথে সীমান্ত পার হওয়া নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার চুক্তি করে। ভারত সরকারের উচ্চ পর্যায়ে থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হয় সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা হবে। তারপর থামছিলো না সীমান্ত হত্যা।

১১’ সালের চুক্তির সূত্র ধরে ২০১৮ সালের ২৩ থেকে ২৬ এপ্রিল ঢাকার পিলখানা সদর দফতরে বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে তিন দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলন শেষে বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের (লিথ্যাল উইপন) ব্যবহার হবে না, আমরা উভয় দেশ আলোচনার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। এ কারণে সীমান্ত হত্যা অনেকাংশে কমে এসেছে। সীমান্তে কোনো প্রাণনাশ গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে বিএসএফ প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র (নন-লিথ্যাল উইপন) ব্যবহার করছে’।

ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) মহাপরিচালক (ডিজি) কে কে শর্মাও সেদিন একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেছিলেন, ‘সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি। হত্যাকাণ্ড বন্ধে আমাদের রক্ষীরা ‘নন-লিথ্যাল উইপন’ ব্যবহার করছে। যদিও অপরাধীরা আমাদের ওপর আক্রমণ করছে, তবু আমরা ‘নন-লিথ্যাল উইপন’ ব্যবহার করছি। সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘন হোক, এটা আমরা চাই না’।

এই ঘোষণার পর সীমান্ত উত্তেজনা কিছুট প্রশমিত হয় বলেই মনে হয়েছিলো। বছর শেষে সরকারি হিসাব মতে ওই বছর ৩জন বাংলাদেশি নাগরিক বিএসএফ এর হাতে নিহত হয়। যদিও বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যাটা ছিলো কয়েক গুণ। আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক) বলছে, ওই বছরেও ১৪জন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ।

যাই হোক সরকারি হিসাব ধর্তব্য হিসেবে কিছুটা স্বস্তির কথা চিন্তা করা গেলেও বছর ঘুরতেই ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠে বিএসএফ। ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসেই তারা ১৮জন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করে। বছর শেষে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৩৫-এ। আসকের হিসেবে এই সংখ্যাটাও ৪৩।

২০১৯ সালের ১১ জুলাই জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দশ বছরে সীমান্ত হত্যার একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। ম্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্যমতে, ২০০৯ সালে ৬৬জন, ২০১০ সালে ৫৫জন, ২০১১ সালে ২৪জন, ২০১২ সালে ২৪জন, ২০১৩ সালে ১৮জন, ২০১৪ সালে ২৪জন, ২০১৫ সালে ৩৮জন, ২০১৬ সালে ২৫জন, ২০১৭ সালে ১৭জন ও ২০১৮ সালে ৩জন বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিক ভারতের সীমান্ত রক্ষি বাহিনী বিএসএফ এর হাতে নিহত হয়েছেন।

সরকারি এই হিসাবে ১০ বছরে ২৯৪জন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। যদিও বেসরকারি হিসেবের সাথে এই পরিসংখ্যানের ব্যাপক গড়মিল রয়েছে।

খোদ বিজিবির হিসাবের সাথেই এই পরিসংখ্যানের গড়মিল পাওয়া যায়। বিজিবির হিসেবে এই পরিসংখ্যানটা হলো: ২০০৯ সালে ৬৭ জন, ২০১০ সালে ৬০ জন, ২০১১ সালে ৩৯ জন, ২০১২ সালে ৩৪ জন, ২০১৩ সালে ২৮ জন, ২০১৪ সালে ৪০ জন, ২০১৫ সালে ৪৫ জন, ২০১৬ সালে ৩১ জন এবং ২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২১ জন নিহত হয়েছেন (বাংলা ট্রিবিউন ৮ জানুয়ারি ১৮’)

২০১৮ সালে সরকারি হিসাবে ৩জন বলা হলেও, আসক এর হিসাবে ১৪ জন এবং ২০১৯ সালে সরকারি হিসাবে ৩৫ ও আসক এর হিসাবে ৪৩জনের প্রানহানি হয়েছে। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম ২৩ দিনেই নিহত হয়েছেন ১০জন। তবে বিগত বিএনপি সরকারের তুলনায় সামগ্রিকভাবে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাটা কমেছে বলতেই হবে।

১৯৯৬ সাল থেকে চলতি বছরে এ পর্যন্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:

১৯৯৬ সালে ১৩ জন (উইকিপিডিয়া)।।
১৯৯৭ সালে ১১ জন ‘’।
১৯৯৮ সালে ২৩ জন ’’।
১৯৯৯ সালে ৩৩ জন ‘’।
২০০০ সালে ৩৯ জন ‘’।
২০০১ সালে ৯৪ জন ‘’।
২০০২ সালে ১০৫ জন ‘’।
২০০৩ সালে ৪৩ জন ‘’।
২০০৫ সালে ১০৪ জন ‘’।
২০০৬ সালে ১৪৬ জন ‘’।
২০০৭ সালে ১২০ জন ‘’।
২০০৮ সালে ৬২ জন (উইকিপিডিয়া)।
২০০৯ সালে ৬৭ জন (বিজিব)।
২০১০ সালে ৬০ জন ’’।
২০১১ সালে ৩৯ জন ‘’।
২০১২ সালে ৩৪ জন ‘’।
২০১৩ সালে ২৮ জন ‘’।
২০১৪ সালে ৪০ জন ‘’।
২০১৫ সালে ৪৫ জন ‘’।
২০১৬ সালে ৩১জন ‘’।
২০১৭ সালে ২১জন (বিজিবি)।
২০১৮ সালে ১৪জন (আসক)
২০১৯ সালে ৪৩জন (আসক)
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১০জন

সব মিলিয়ে গত দুই যুগে ১২২৫ নিরিহ নিরস্ত্র বাংলাদেশি মানুষ হত্যা করেছে বিএসএফ। বিএসএফ কর্তৃক এসব হত্যাকণ্ড ছাড়াও স্বতন্ত্রভাবে ভারতের নাগরিকদের কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশি নিহতের কথা উল্লেখ্য করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। সেসব উল্লেখ্য করলে সংখ্যাটা নেহায়াতই কম হবে না।

২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি ‘দ্য গার্ডিয়ানে’ ‘ইন্ডিয়াস শুট-টু-কিল পলিসি অন দ্য বাংলাদেশ বর্ডার’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে ব্রাড এডামস লিখেছেন, সীমান্তে গত ১০ বছরে ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীরা প্রায় ১০০০ মানুষ হত্যা করেছে। এর বেশির ভাগই বাংলাদেশী। কিন্তু এসব হত্যায় যারা জড়িত তাদের কারো কোন বিচার হয়নি।

আইন ও সালিস কেন্দ্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক, মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ‘ভারত সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখেনি। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম বিভিন্নভাবে সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে। দ্বিপাক্ষিক সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেটি রাখেনি।’

তিনি বলেন, ‘তারা (ভারত) বলেছিল, সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার করবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম, সেটি মুখের বুলি হলো। এখনও প্রতিনিয়ত সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহতের ঘটনা ঘটছে।’ (বাংলা ট্রিবিউন)

বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না উল্লেখ করে নূর খান আরো বলেন, ‘ফালানী হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরেও বিএসএফ দায়মুক্তির সুযোগ পেয়েছে। বিচার এমনভাবে হয়েছে যে, দায়মুক্তি প্রতিষ্ঠিত করেছে। একদিকে ফালানীর মামলা নষ্ট হয়েছে, আরেকদিকে রিটটিও সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে। এধরনের হত্যা বন্ধের জন্য যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হচ্ছে না।’

ভারতের সঙ্গে নেপাল, চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। ওইসব সীমান্তে মাসের পর মাস, দিনের পর দিন এধরনের হত্যার ঘটনা ঘটে না উল্লেখ করে নূর খান বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বোঝাপড়ায় কোথাও কোনও দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। আমি মনে করি, এটা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে অর্থাৎ জাতিসংঘের দ্বারস্থ হতে হবে। আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে যদি প্রতিবেশির সঙ্গে সমস্যা সমাধান না করা যায়, তাহলে আমাদের জাতিসংঘে যেতে হবে। এর বিকল্প কিছু দেখা যাচ্ছে না।’

/এসএস

মন্তব্য করুন