তাপসের মনোনয়ন সংগ্রহই কি সাঈদ খোকনের কান্নার কারণ?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

প্রকাশিত: ৬:৩১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯

ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের উত্তাপ সবেমাত্র শুরু হলো। এরইমধ্যে  উত্তাপ কমাতে ঠান্ডা চোখের জ্বল ছেড়ে দিলেন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে এসে অঝোরে কেঁদেছেন মেয়র।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে সাংবাদিকদের সামনে দোয়া প্রার্থনা করে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বর্তমান সময়টাকে জীবনের কঠিন সময় অভিহিত করে মেয়র বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবনে একটা কঠিন সময় যাচ্ছে। এই কঠিন সময়ে ঢাকাবাসীকে আমি আহ্বান জানাই, আমার জন্য একটু দোয়া করবেন। প্রিয় দেশবাসী, আমার জন্য দোয়া করবেন।’

সময়টাকে কঠিন সময় বললেও তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। কেন কী কারণে তার নিজের কাছে সময়টাকে জীবনের কঠিন সময় বলে মনে হচ্ছে এর কোনো উত্তর তিনি দেননি।

প্রশ্ন উঠেছে ‘সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগের সাংসদ শেখ পরিবারের সন্তান শেখ ফজলে নূর তাপসের মনোনয়ন সংগ্রহই কি মেয়ার সাঈদ খোকনের কান্নার কারণ?’।

অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দুইভাগ হওয়ার পরই মূলত মেয়র সাঈদ খোকনের রাজনৈতিক উত্থান হয়। এর আগে তিনি মূলত কখনো আলোচনায় ছিলেন না। সিটি ভাগ হওয়ার পর প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের সন্তান হিসেবে দক্ষিণে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া সাঈদ খোকনের জন্য সহজ হয়।

নির্বাচিত হয়ে মাত্র প্রথমবার চলতি দায়িত্বকালীন মেয়াদ শেষ করতে চলেছেন। এরইমধ্যে রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ের হিসাব খুঁজে বের করা খুব একটা কঠিন বলে মনে হয় না নগরের বাসিন্দাদের। ধারণা করা হচ্ছে দলীয় প্রধানের কিংবা হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত নিয়েই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস।

সচেতন ভোটার ও বিশ্লেষকদের ধারণা তাপসের বিপরীতে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়াটাই সাঈদ খোকনের জন্য কঠিন সময়। আর তাই দলীয় প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সাংবাদিকদের সামনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন মেয়ার সাঈদ খোকন।

কেননা মেয়র সাঈদের কথাতেও সেটা ফুটে উঠে। জীবনের কঠিন সময় পার করছেন জানিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই সাড়ে চার বছর ঢাকা শহরে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে সক্ষম হয়েছি। ঢাকাবাসী সুখে-দুঃখে, ঢাকাবাসীর আপদে-বিপদে পাশে ছিলাম। আল্লাহকে হাজির-নাজির করে বলি, আমি কখনো কর্তব্যে অবহেলা করিনি। এই শহরের মানুষের জন্য, এই কঠিন সময়ে ঢাকাবাসী, দেশবাসী যদি আমার পাশে দাঁড়ান, আমি আগামী পাঁচ বছর আপনাদের পাশে থাকব।

দেশবাসী ও নগরবাসীকে পাশে চেয়ে মেয়রের কান্নার অর্থ নিকট সময়ে তিনি নগরবাসীকে পাশে যে প্রকিয়ার সম্মুখিন হচ্ছেন তাতে তিনি প্রথম ধাপ পেরোনোর ব্যাপারেই শঙ্কিত। যার কারণে আবেগের সবটা ঢেলে ভালোবাসার দাবিতে নগরবাসীকে তিনি পাশে চাইছেন।

কিন্তু সময়ের বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা। সম্প্রতি গেলো কয়েক মাসে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সাঈদ খোকনের ব্যর্থতা ও অতিকথনের দরুণ ঢাকাবাসীর মনে একটা ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে বলেই অনেকে মনে করছেন। এছাড়া নগরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিধি ও গতি নিয়েও নগরবাসীর মনে রয়েছে অসন্তোষ। গত পাঁচ বছরে মেয়র সাঈদ খোকনের ‘অপ্রয়োজনীয়’ বিদেশ গমন ও সিটি করপোরেশন পরিচালনার দক্ষতা নিয়েও একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

স্বয়ং রাজনৈতিক সহকর্মীরাই সমালোচনা করছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বাসিন্দা ও সদ্য মনোনীত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইন সম্পাদক নজিবুল্লাহ হিরু বলেন, একজন নগরবাসী হিসেবে বলতে পারি যে, আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে সারা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন, ঢাকায় যেভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়নি। বর্তমান মেয়র এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি।

নিজের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার তীব্র আকুতি জানিয়ে মেয়র খোকন বলেন, ‘অনেক কাজ করেছি। কিছুটা কাজ বাকি আছে, সে কাজগুলো যেন শেষ করে যেতে পারি। ঢাকা শহরের মানুষের সুখে-দুঃখে আমি পাশে ছিলাম। আজকের এই কঠিন সময়ে প্রিয় ঢাকাবাসীর কাছে, আমার দেশবাসীর কাছে আমি দোয়া চাই। আমি যাতে কামিয়াব হই’।

দেখা যাক নির্বাচনী উত্তাপের প্রথম ধাপে দলীয় মনোনয়নের দৌঁড়ে কতদূর যেতে পারেন মেয়র খোকন। কিংবা মেয়র হওয়ার দৌঁড়ে প্রথম টিকেট সংগ্রহ করে সাংসদ তাপস সংসদ সদস্য থেকে পদোন্নতি হিসেবে পার্লামেন্ট ছেড়ে ভোটের ময়দানে নামেন কিনা।

উল্লেখ্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে রানিং মেয়ার আতিকুল ইসলামের মনোনয়ন মোটামুটি নিশ্চিত হলে দক্ষিণে রয়েছে আরো একাধিক প্রার্থী। হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিম ছাড়াও বঙ্গবন্ধু একাডেমির সভাপতি মো. নাজমুল হক, মু‌ক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক মহাস‌চিব এমএ র‌শি‌দও মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন।

নগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক নজিবুল্লাহ হিরুকেও কাউন্সিলের আগে সিটি মেয়র হিসেবে মনোনয়ন চেয়ে প্রচারণা করতে দেখা গেছে। এখন দেখা যাক তিনিও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন নাকি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়েই সন্তোষ্ট থাকবেন।

মন্তব্য করুন