ইসলামে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা

প্রকাশিত: ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯

মুফতী এইচ এম আবু বকর সিদ্দীক

স্বাধীনতা। একটি প্রাউড ফুল ওয়ার্ড। শৌর্যবীর্য ও সক্ষমতায় বুক ফুলে ওঠার মত অর্জন। মানুষের সহজাত স্বভাবই হচ্ছে স্বাধীনতা। জন্ম থেকেই মানুষ স্বাধীনতাপ্রিয়। একজন মানুষ নিজেকে বিকাশের জন্য লজিক্যালি স্বাধীনতা কামনা করে। অনুরূপ ইসলামও স্বাধীনতাকে অসামান্য গুরুত্ব দিয়েছে। সম্ভবত ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা দাসমুক্তির অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।

ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বানী তো এ সম্পর্কে বিখ্যাত। তিনি কিছু লোককে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ তোমাকে স্বাধীন হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তোমাকে গোলাম বানানোর অধিকার কারো নেই”। ইসলাম আগমনের পরে দাসমুক্তির যে তাৎপর্য উপলদ্ধ হয়েছিল, রীতিমতো সাহাবাদের মধ্যে এই সওয়াবের কাজে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইসলামের প্রধান খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. একাই এতো পরিমান দাস মুক্তির অভিযানে নেমেছিলেন যে, তার বাবা যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি– এটাকে সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার আখ্যা দিয়ে তাকে ধমক দিতে থাকলেন। কিন্তু তিনি মস্ত বড় এই সওয়াবের কাজ থেকে কিছুতেই নিবৃত হননি।

ব্যক্তিস্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাও অনুরূপ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা ভূমির শ্রেষ্ঠ সন্তান হয়েও মক্কার ভূখন্ড তার জন্য স্বাধীন ছিলো না। তিনি এবং তাঁর সহচরেরা সেখানে সবরকমের স্বাধীনতা বঞ্চিত ছিলেন। নিজভূমে তাকে পরিবার ও অনুসারীসমেত তিন বছর বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছিল। একপর্যায়ে সেখান থেকে তিনি হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মক্কা ত্যাগের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশ্রুসজল চোখে প্রিয় মাতৃভূমির দিকে ফিরে ফিরে আবৃত্তি করছিলেন, “পবিত্র সত্তার শপথ! আল্লাহর কাছে তুমি সবচেয়ে প্রিয় স্থান এবং তুমি আমারও প্রিয় মাতৃভূমি। তোমার অধিবাসীরা যদি আমাকে বের করে না দিতো তাহলে কিছুতেই আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না”। (মুসনাদে আহমদ)

দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় যারা ত্যাগ স্বীকার করেন ইসলাম তাদেরকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা। বিশ্বনবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যারা দেশ রক্ষায় উদ্দেশ্যে সীমান্ত পাহারায় বিনিদ্র রজনী যাপন করে তাদের জন্য জান্নাত”। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু থেকে আরও একটি সমার্থক হাদিস বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “দুই প্রকার চক্ষুকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। প্রথমত যে চোখ আল্লাহর জন্য কাঁদে দ্বিতীয়ত যে চোখ দেশের সীমানা রক্ষায় বিনিদ্র রজনী যাপন করে”। (তিরমিজি)

একটি বিজয়ী জাতির জন্য কী করা উচিত, কুরআন চমৎকার নির্দেশনা দিয়েছে। মক্কা বিজয়ের পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আল্লাহর প্রত্যাদেশ নিয়ে সূরা নাসর নাযিল হয়। যাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, “যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে দেখবেন। তখন আপন রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণায় নিয়োজিত হোন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন; নিঃসন্দেহে তিনি তওবা গ্রহণকারী”। (সূরা নাসর) এই সূরা যুদ্ধকালীন যাবতীয় জানা অজানা ভুলের জন্য ক্ষমার প্রতি নির্দেশনা পরিস্কার হয়ে ওঠেছে।

স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যবহ। বৈষয়িক সুবিধাপ্রাপ্তি শুধু নয়, মুমিনরা যেন নির্বিঘ্নে তাদের রবের ইবাদত করতে পারে এটা স্বাধীনতার পরম লক্ষ্য। এই মর্মে মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেন, “আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, সৎকাজে আদেশ করবে অসৎকাজে বাঁধা দেবে। সমস্ত কাজের প্রতিদান আল্লাহর এখতিয়ার”। (সূরা হজ, আয়াত ৪১)

১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের মধ্যদিয়ে এদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণ দেশকে মুক্ত করেছিলেন গোলামির জিঞ্জির থেকে। বীর বাঙ্গালির সেই ত্যাগ ৫৬ হাজার বর্গমাইলের স্মারক জুড়ে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার মহৎ উদ্দেশ্যকে অর্থবহ করে তুলতে কুরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। অন্যথায় আমাদের পূর্বসূরিদের রক্ত ও জীবনের বিরাট ত্যাগ কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করতে ব্যর্থ হবে। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখুন। আমীন।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক পাবলিক ভয়েস

আই.এ/

মন্তব্য করুন