গ্রেটেস্ট পিরামিড ও স্ফিংক্সের রহস্যরাজ্যে একদিন

ভ্রমন কাহিনী

প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০১৯

পিরামিড পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের একটি। পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ও আশ্চর্যময় স্থাপত্যের মধ্যে পিরামিড অন্যতম।বহুভূজের উপর অবস্থিত যে ঘনবস্তুর একটি শীর্ষবিন্দু থাকে এবং যার পার্শ্বতলগুলো প্রত্যেকটি ত্রিভুজাকার, তাকে পিরামিড বলে। রহস্যঘেরা এই পিরামিড ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখেছেন মিশরের জামেয়া আল আজহারের শিক্ষার্থী আশরাফ মাহদী। 

পিরামিড ও স্ফিংক্সের রহস্যরাজ্যে একদিন : এজ আই সেইড, উনার আজকে খুবই পিরামিড ক্রেভিংস হচ্ছে। লাঞ্চ মেনুতে আছে খুফু খাফ্রে আর মেনকুরে। তবে তিনি কোনটা দিয়ে শুরু করবেন তা এখনো নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। মিসর এসে প্রথম যে বার পিরামিড দেখতে যাই সেবার অল্পবিস্তর গবেষণাকর্ম চালিয়ে কিছু লেখেছিলাম। বছর দুয়েক পর আজ পিরামিডের ছায়ায় বসে সেই পুরোনো লেখা পড়ে ভুলে যাওয়া তথ্যগুলো ঝালাই করতে ভালই লাগছে। পিরামিড নিয়ে কৌতুহলীরা পড়ে দেখতে পারেন৷

মিসরের কথা বললে পিরামিড যেভাবে দৃশ্যপট দখল করে নেয় তাতে পিরামিড আর মিসরকে অনেকটা সমার্থকই বলা যায়। চার হাজার বছর পুরোনো সেই প্রাচীন স্থাপনায় কী এমন আছে যা মানুষকে দীর্ঘকাল ধরে আশ্চর্য করে রেখেছে! প্রত্নতাত্ত্বিকেরা তো এখনো বলে থাকেন, “পিরামিডের রহস্য উদঘাটন করে ফেলেছি বলে যেসব গবেষকরা তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন তাদের তথ্য উপাত্তেও ব্যাপক গড়মিল আছে। অধিকাংশই অসত্য ও ধারণাপ্রসূত গবেষণা। সত্য কথা হচ্ছে, চার হাজার বছর আগে যে প্রকৌশলবিদ্যা তারা রপ্ত করে তারা এই পিরামিড দাঁড় করিয়েছিল, সে সংক্রান্ত সকল তথ্য এখনো বড় বড় ইজিপ্টলজিস্টদের কাছেও অজানা রয়ে গেছে”।

অতএব হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো কৌতূহলের জন্ম দিয়ে আসা সেই পিরামিড দেখে আমি রহস্যের কোন কূল-কিনারাই যে করতে পারবো না সে ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম। এরপরও এক নজর দেখে তো রাখা দরকার৷ খালি চোখে ঠিক কতটুকু আশ্চর্য হতে হয় সে অভিজ্ঞতার অর্জনটা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ।

সেসব ভেবেই একদিন রওনা হয়ে গেলাম পিরামিডের উদ্দেশ্যে। বাসা থেকে মাত্র আধঘন্টার পথ। মেট্রোরেলে আরো কম সময় লাগে। এরপরও মিশরে এসে পিরামিড দর্শনের উদ্দেশ্যে গিজা শহর ভ্রমণের জন্য মাসখানেক অপেক্ষা করতে হল। বৃহত্তর কায়রোর ভেতরে হলেও মূল শহর থেকে গিজার দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার।

সকালের রোদ আজ অতটা প্রখর না। নীলনদ থেকে পশ্চিম দিকে আমাদের গাড়ি চলছে৷ পথে যেতে আইনুশ শামস কুয়াটি পড়ল। চারপাশে উচু প্রাচীরের বেষ্টনি দিয়ে দূর্গ বানানো হয়েছিল মুসলিম পূর্ব যুগে। ইবনে কাছির লিখেছেন, এই প্রাচীরের ভেতরই আমর ইবনে আসের সেনাপতি রোমান রাজাকে অবরুদ্ধ করে মুসলমানদের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। সে এক গৌরবময় ইতিহাস। তবে এসব তো কেবল সেদিনকার ঘটনা। ওমর রা.-এর খেলাফতকাল চলছিল তখন৷

আমাদের গাড়ি তো এখন গিজার পথে। আমরা তো এখন আরো হাজার হাজার বছর পেছনের ইতিহাস অভিমূখে চলছি। যাওয়ার আগে পিরামিড নিয়ে টুকটাক পড়াশোনা করে নিয়েছি। মজার ব্যাপার হল, এই যে উঁচু উঁচু ত্রিভুজাকৃতির স্থাপনাগুলো, যেগুলোকে আমরা পিরামিড বলে চিনে থাকি, সে নাম ফেরাউনদের রেখে যাওয়া নাম নয়। ফারাও সভ্যতা সমাপ্তিরও দুই হাজার বছর পর যখন গ্রিকরা মিশরে ঢুকতে শুরু করে তখন প্রকান্ড সব স্থাপত্যশৈলী দেখে তারা হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এসব নিয়ে তারা ব্যাপক গবেষণাও চালিয়েছিল। তখনই তারা এই স্থাপনাগুলোর নাম দিয়েছিল “পিরামিড”৷ তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, গ্রিক শব্দ “পিরামিড” ঠিক কী অর্থে ব্যবহার হয়েছিল সেটা ইতিহাসবিদরা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এইসব পিরামিড কারা নির্মাণ করেছিল এবং উদ্দেশ্য কী ছিল, এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর জানতে বেশ কিছু সূত্রের সাহায্য নিয়েছিলাম। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আইজ্যাক আসিমভ বলেছেন, “পিরামিড নির্মাণের সূচনাটা মূলত হয়েছিল ফেরাউনদের তৃতীয় রাজবংশ থেকে। রাজা জোসারের শাসনামল থেকে৷ তার নির্মাণ করে যাওয়া পিরামিডগুলোর অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে। জোসারের পিরামিডের শহরটির নাম সাক্কারা। সেটা ২৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের কথা। তারও একশ বছর পর পিরামিডের স্থাপনা শিল্পকে বিকশিত করে চতুর্থ রাজবংশের স্নেফেরু”।

তবে আমরা আজ সেখানে যাচ্ছি না। আমরা যাচ্ছি গিজার পিরামিডে। ফেরাউনরা পিরামিড ঠিক যে উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিল মোটাদাগে সেটা হল, প্রভূর সন্তুষ্টি অর্জন। এমনিতেও মিশরীয় রাজাদের উত্তরসূরিরা পূর্বসূরীদের মতো সমাধি নির্মাণ করতে উদগ্রীব হয়ে থাকতো। এই ইচ্ছার কারণেও সেকালে স্থাপত্যশৈলীর ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছিল। তবে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজার মৃতদেহ ও তাদের সম্পদ সংরক্ষণ করা। কারণ তারা ফেরাউনদেরকে শুধু রাজাই ভাবতো না, নিজেদের প্রভু বলেও স্বীকার করত। ইহলোক ত্যাগ করার পর প্রভূ যাতে পরলোকেও সুখে থাকেন এবং তাদের উপর রাজি খুশি থাকেন সেই নিমিত্তেই তারা এই পিরামিডের সুব্যবস্থা করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, এর মাধ্যমেই জনগণের সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।

তবে প্রাচীন মিশরের এই অধ্যায় নিয়ে লেখা অনেক তথ্যই ইতিহাসবিদরা পর্যন্ত কল্পকাহিনি বলে স্বীকার করে নিয়েছে৷ এমনকি যেসব তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করা হয় সেগুলোও বেশ মতবিরোধপূর্ণ। যেমন, চতুর্দশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ তাকি আল মাকরিজি দাবি করেছেন, “পিরামিড ফেরাউনদের নির্মাণ নয়। এসব নির্মিত হয়েছিল রাজা সাউরিদের শাসনামলে। যিনি নুহ আ.-এর যুগের সেই ভয়াবহ বন্যারও আগে এই অঞ্চলের রাজা ছিলেন। ইহুদিরা যাকে “ইনোক” নামে চিনে থাকে।

যাই হোক, এই সবই হচ্ছে ইতিহাসবিদদের মারপ্যাঁচযুক্ত আলাপ। এসব রেখে এখন পিরামিডে ঢোকা যাক। রাস্তায় তেমন একটা যানজট ছিল না আজকে। নীলের পাড় ঘেঁষে আসতে আসতে অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের গাড়ি পিরামিডের কাছাকাছি চলে আসে। আমি আগেই জানতে পেরেছিলাম, পিরামিডের এরিয়াতে ঢুকলেই কিছু লোকজন আগ বাড়িয়ে এসে গাড়ি থামাবে। এরা গেটে গিয়ে টিকিট না কিনে আগেই টিকিটসহ ভেতরে উট ও ঘোড়ার গাড়িতে ঘুরানোর বেশ “লোভনীয়” সব অফার নিয়ে হাজির হবে। আসলে এরা সবই ধান্ধাবাজ৷ তাই কোনো ইশারায় গাড়ি না থামিয়ে সোজা গাড়ি নিয়ে গেটের সামনে থামাতে হবে। এক বড়ভাই এই মূল্যবান সতর্কবানী না দিলে হয়তো ওদের খপ্পরে পড়েই যেতাম। আজ গিজায় আমরা যে পিরামিড দেখতে আসলাম সেটাকে বলা হয় “দ্য গ্রেট পিরামিড অফ খুফু”। বিশ্বের সপ্তমাশ্চর্যের মধ্যে দীর্ঘদিন যে পিরামিড স্থান দখল করে রেখেছিল। আর এটাই মিসরের সবচেয়ে বড় পিরামিড। এর নির্মাণকাল ২৫৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।

তেরো একর জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে থাকা খুফুর পিরামিডের উচ্চতা ৫৮১ ফিট। আর এতে ব্যবহৃত হওয়া পাথরের সংখ্যা ২৩ লক্ষ। যার প্রত্যেকটির ওজন ২.৫ টন। এত বিশাল পাথর ব্যবহারের কারণ ছিল তখন পাথরের আকার যত বড় হত যথাস্থানে বসাতে তত কম সময় লাগতো। প্রায় ছয় শ মাইল দূরের গ্রাম আসওয়ান থেকে জাহাজে করে নীলনদের স্রোতে ভাসিয়ে আনা হত এইসব পাথর। এই কারণে বন্যার সময়কেই পিরামিড নির্মাণ কাজের জন্য নির্বাচন করা হত।

গিজার সেই গ্রেট পিরামিডের পাশেই আরো দুইটি পিরামিড রয়েছে। একটি খুফুর ছোট পুত্র খাফ্রের। পিতার মৃত্যুর পর সে অপেক্ষাকৃত ছোট পিরামিডটি নির্মাণ করেছিল। আর তিনটি পিরামিডের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটি নির্মাণ করেছিল খাফ্রের পুত্র মেনকুরে। এই তিন পিরামিডকেই ফারাও সভ্যতার মহত্বের নিদর্শন মনে করা হত।

তবে এগুলোকে ঘিরে পরবর্তী রাজারাও ছোট ছোট আরো পিরামিড নির্মাণ করেছিল। যেগুলোর কোনো কোনোটার ধ্বংসাবশেষ এখনো দেখা যায়। এসবের মাঝ দিয়ে চলে গেছে পাহাড়ি আঁকাবাকা পথ৷ ঘোড়ার গাড়ি দৌড়ে ওঠার সময় এবং মরুভূমিতে উটের পিঠে চড়ে বেড়ানোর অনুভূতিটা সত্যিই অবর্ণনীয় ছিল। বড়

পিরামিডগুলো থেকে মাত্র ১২০০ ফিট দুরেই বসে আছে স্ফিংক্স। আরবিতে যাকে বলে আবুল হাউল। এই স্ফিংক্স নামটিও গ্রিকদের দেওয়া। অর্থ হচ্ছে, স্বাসরোধকারী। বলা হয়ে থাকে একটা গল্পের বেশ প্রচলন ঘটার ফলেই এই নামকরণ হয়েছিল। গল্পটা হচ্ছে, পথচারীদের দেখলেই নাকি স্ফিংক্স একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করতো। আর স্ফিংক্সের সে ধাঁধার উত্তর যে দিতে না পারতো তাকে সে গলা টিপে হত্যা করে ফেলত।

চতুর্থ রাজবংশের শাসনকালে নির্মিত এই মুর্তিটি রাজা খাফ্রের ক্ষমতা আর গৌরবের রূপায়ন হিসেবে স্বীকৃত হলেও পরবর্তীতে এর উপর অনেক ঝড় ঝাপটা গিয়েছে৷ কখনো মরুভূমির বালুর ভেতর দীর্ঘকাল কাটাতে হয়েছে। এক সময় নাকি কোনো এক রাজপুত্রের মনে হয়েছে এই স্ফিংক্স খুব বেশি দাম্ভিক এবং সেটা নাকি তার উঁচু নাক দেখলেই বোঝা যায়। তাই দাম্ভিকতাকে চুরমার করে দিতে তার নাকটাই ভেঙে দিয়েছিল সেই রাজপুত্র। সেই থেকে আজও স্ফিংক্স ভংগুর নাক নিয়েই বসে আছে। আর নেপোলিয়ান তো তার আমলে এই স্ফিংক্সকে ব্যবহার করেছিল তার কামানের ধার পরিক্ষা করার জন্য৷

পিরামিডের ভেতর সন্ধ্যার পর একটা শো হয়। পিরামিডের ইতিহাস বলা হয় সেখানে। সে ইতিহাস শুনতে চাইলে সন্ধ্যার পর আলাদা টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। এটা অনেকটা আমাদের ঢাকার লালবাগ কেল্লার “লাইট এন্ড সাউন্ড শো”-এর মতই। তবে এখানে গল্পটা বলে শোনায় স্ফিংক্স। তাকে ও তার চতুর্পাশ ঘিরে থাকা পিরামিড দেখতে আসা পর্যটকদের নিয়ে এ গল্পের আসর জমে। দিনের আলো পুরোপুরি নিভে গেলে সে প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে। তার ভরাট কন্ঠে ইতিহাসের বর্ণনা শুনতে শুনতে পর্যটকরা ঘুরে বেড়ায় যায় হাজার বছর আগের কল্পনায়।

লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া।

মন্তব্য করুন