আমার পিঠে ঝুলাই দিছে ১০ কেজি ওজন…!

প্রকাশিত: ৮:৪৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

খেলার জন্য, খাবারের জন্য, কারো কাঁধে চড়ার জন্য কিংবা সুন্দর একটি বইয়ের জন্য চিৎকার চেঁচামেচি করবে, সমবয়সীর সাথে মারামরি করবে, কান্না করবে এরাই তো শিশু। হাসি-আনন্দ, এ ঘর থেকে ও ঘরে ছুটোছুটি আর দূরন্তপণায় সারা ঘর মাতিয়ে রাখাই শিশুর বৈশিষ্ট।

শিশুরা খেলবে, হাসবে-কাঁদবে, পড়বে, গল্প করবে; এভাবেই মুক্ত স্বাধীন মনে স্বাধীন পরিবেশে বেড় উঠবে। তবেই শিশুদের মন-মগজে মননশীলতা আসবে। মানসিকতা প্রসারিত হবে। চিন্তার গভীরতা সৃষ্টি হবে।

মোট কথা একটা শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য চাই চাপহীন মুক্ত পরিবেশ। কিন্তু বর্তমান সমাজে সেই পরিবেশটা দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। শিশুরা এখন আর আগের মতো বেড়ে উঠছে না। বিশেষ করে শহরের শিশুরা তো রীতিমতো রোবটিক হয়ে উঠছে।

একে তো শহরে নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, খোলা হাওয়া কিংবা মুক্ত প্রকৃতি। চার দেয়ালের মধ্যেই বেড়ে উঠছে শহুরে শিশুর শৈশব। তার মধ্যে আধুনিক সভ্যতার প্রতিযোগীতার বাজারে একটি শিশু যেন বাবা-মা’র কাছে ভাগ্য পরিবর্তনের লটারির টিকেট। কিংবা টাকায় কেনা পুতুল।

যাকে যেমন খুশি তেমন সাজাতে পারলেই স্বার্থকতা। এই স্বার্থকতা হাসিলের জন্য এখনকার শহুরে কিংবা গ্রামের মা-বাবারা শিশুদের বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলতেছেন সেটা তারা ঘুণাক্ষরেও টের পান না।

পড়াশুনা করে জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক শিশুর মৌলিক অধিকার। বড়রা যেমন পড়ে, শিশুরা তেমন পড়বে। পড়তে পড়তে বড় হয়ে শিশুরা আরো বেশি বেশি পড়বে। কিন্তু এখন আর এমনটা দেখা যায় না। শিশুরা এখন কথা বলতে শিখলেই একগাদা বই তুলে দেওয়া হয় শিক্ষিত-উজ্জ্বল ভবিষ্য গড়ার লক্ষ্যে।

শিশুদের মন কোমল। তারা হেসে-খেলে বেড়ে উঠতে চায়। পড়াশুনাকেও তারা আনন্দের বাহন হিসেবেই নিতে চায়। কিন্তু আজকালকার মা-বাবারা শিশুদের আর সেভাবে বড় হতে দিচ্ছেন কই? ছোট্ট আদরের সোনামণির সাধ্যের বাইরে অতিরিক্ত বই আর পড়া। ফলে অতিরিক্ত পড়ার চাপে অতি সন্তর্পনে শিশু মনে তৈরি হয় পড়ার প্রতি অনীহা। আস্তে আস্তে শিশুটি যখন বড় হয় পড়াশুনাকে সে বোঝা মনে করতে থাকে। এভাবেই শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়ে আগামীর ভবিষ্যত।

প্রথমিক বিদ্যালয়ের ৭/৮ বছর বয়সী বাচ্চার কাঁধে ১০/১২টি বই ভর্তি ব্যাগ। প্রতিদিন বইয়ের বোঝা বহন করতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শিশুদের ভবিষ্যত। দেশের উচ্চ আদালতের একটি রায়ে শিশু শিক্ষার্থীদের বইয়ের ব্যাপারে একটি দিকনির্দেশনা রয়েছে।

বলা হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীর শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী ব্যাগ বহন করা যাবে না। কিন্তু মা-বাবা, স্বেচ্ছারি সিলেবাসে চলা বেসরকারি স্কুল-কিন্ডার গার্টেন এবং অসাধু বই বাণ্যিজ্যের হোতারা কি আর সে সুযোগ দিচ্ছেন? দিচ্ছেন না। বাধ্য হয়েই শিশুদের কাঁধে অতিরিক্ত বই নিয়ে প্রতিনিয়ত শিক্ষালয়ে যেতে হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অতিরিক্ত বই চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে একটি ছোট্ট শিশুর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ড়ত কয়েকদিন ধরেই ভিডিওটি দেখছি। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রাথমিকের ওই শিশু শিক্ষার্থী অতিরিক্ত বই চাপানোর প্রতিবাদে সুরে সুরে গান গেয়ে নিজের কষ্টের আর অসহায়ত্বের কথা বলছে। ফেসবুকে ইতোমধ্যে গানটি ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে।

লক্ষ লক্ষ মানুষ ইতোমধ্যে শিশুটির অভিনব প্রতিবাদ শুনেছে, দেখেছে।  তবে শিশুটির নাম পরিচয়, বা কিংবা গানটির লেখক কে তা জানা যায়নি। তবে সে যাই হোক, এই ছোট্ট শিশুটির গানই যেন বর্তমান সময়ের শিশু শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা তুলে ধরছে। গানে গানে এভাইবেই প্রতিবাদ জানায় শিশুটি………

শোনে শোনেন দেশবাসী
শোনেন ভাই ও বোন
ব্যাগের ভিতর বই ঢুকায়া
আমার পিঠে ঝুলাই দিছে ১০ কেজি ওজন
নাইরে উপায় নাইরে উপায় করবো কী এখন
আমার পিঠে ঝুলাই দিছে ১০ কেজি ওজন

সকাল বেলা কান্ধে লইয়া
কোমর বাঁকাই হাঁটি
সবাই ভাবে ছাত্র বুঝি
এককেবারে খাঁটি
ছোটবেলার এই বাঁকাটা আর কী হবে সোজা
বড় হলে কমবে কীগো আমার পিঠের বোঝা
তাকাইতে তাকাইতে শেষে কম দেখে নয়ন

ব্যাগের ভিতর দশটা বই আর
দশটা থাকে খাতা
পড়ার ওপর পড়া চাপায়
কুলায় না আর মাথা
স্কুলে চাপ স্যার ম্যাডামের বাসতে টিউটর
ব্যাগের দিকে দৃষ্টি দিলে চোখে আসে জল
চাপ কমালে তবেই তো ভাই পড়তে চাইবে মন

বিকেলবেলা খেলার সময়
খেলার জায়গা কই
টিভির দেখার জন্য যখন
বাসায় বসে রই
সন্ধে হলে সিরিয়ালে বসেন পরিবার
আমার সাথে কার্টুন দেখা হয় না তাইতো আর
ঝাড়ি দিয়া সবাই বলে পড়তে বস এখন

সবাই বলে ডাক্তার হবি
পাইলট ইঞ্জিনিয়ার
সরকারি বা বেসরকারি
টাই পড়া অফিসার
শিল্পী কবি গায়ক হওয়া মোটেই ভালো নয়
আজব নিয়ম তাদের লেখা ক্লাসে পড়তে হয়
কেউ বলে বা মানুষ হবি মানুষের মতন

এই একটি গান সমস্ত শিশু শিক্ষার্থীর অব্যক্ত কথা। যে কথা তারা পরিবারকে বোঝাতে পারে না। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। না পারার যাতনা নিয়ে এক সময় তাদের কোমল মনে পড়াশুনার প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে। মানসিক ডিপ্রেশনেও ভোগে।

ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে পড়াশুনার অবিষ্যত। সুতরাং শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য চাপমুক্ত শিক্ষা পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিলেই শিশুর ভবিষ্যত সুন্দর হওয়ার আশা করা যায়।

মন্তব্য করুন