এটিএম হেমায়েত উদ্দিন রহ. এর মৃত্যু ও তার দলের প্রতি কিছু খোলা প্রশ্ন

প্রকাশিত: ৭:৫৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

পলাশ রহমান : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলার নেই। যারা দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন, হেমায়েত উদ্দিন কতো বড় মাপের একজন নেতা ছিলেন। কতো উদার এবং জনদরদী নেতা ছিলেন। বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতিতে তিনি ছিলেন উজ্জল নক্ষত্র। গত ১১ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে হাফেজ মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সত্যিই একটি নক্ষত্রের পতন হয়েছে। দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি হারিয়েছে একজন বিচক্ষণ দেশপ্রেমিক জননেতা।

দলীয় পরিচয়ে এটিএম হেমায়েত উদ্দিন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা হলেও তার উদারতা, বিশালতা এবং গণমুখী চিন্তা চেতনাকে কোনোভাবেই নির্দিষ্ট গন্ডিতে বেধে রাখা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের জননেতা। দেশের স্বার্থ, জনগণের স্বার্থই ছিল তার আরাধনা। তার মৃত্যুতে দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতিতে যে শুণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পুরণ হতে আরো অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে। এটিএম হেমায়েত উদ্দিন ঢাকার আলিয়া মাদরাসা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। দুটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। দুটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। একটি মসজিদে দীর্ঘ ৪২ বছর ইমামতি করেছেন। ঢাকার রাজাবাজার বাসীর কাছে তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে ছোট বড় সবাই তাকে অভিভাবক মনে করতেন। সবাই তাকে ‘বড় হুজুর’ বলে ডাকতেন।

আরও পড়ুন : এটিএম হেমায়েত উদ্দিন রহ. এর বর্ণাঢ্য জীবন

দরাজ কন্ঠের অধিকারী হেমায়েত উদ্দিনের অনলবর্ষী বক্তৃতায় দেশের ইসলামপন্থীরা উজ্জীবিত হতেন, দিকনির্দেশনা পেতেন। তার বক্তৃতায় বার বার দেশের মেহেনতী মানুষের কথা, শ্রমিক কৃষক মজুরের কথা উঠে আসতো। তিনি সাম্যাজ্যবাদ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একজন সোচ্চার পুরুষ ছিলেন। তিনি ছোট বড়, শিক্ষিত অশিক্ষিত, আলেম অ-আলেম সবাইকে আপন করে নিতেন। সবার সুবিধা অসুবিধায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন।

এটিএম হেমায়েত উদ্দিন মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতেন না। সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায়ে রাখতেন। তিনি নিজেকে ইসলামপন্থী রাজনীতির গন্ডিতে বেধে রাখতেন না। দেশের সর্বস্তরের, সব দলের রাজনীতিকদের সাথে তার ওঠাবসা ছিল। তাদের কথা শুনতেন, নিজের আদর্শের কথা বলতেন। তার মৃত্যুর পর দেশের সিনিয়র সাংবাদিকরা মন্তব্য করেছেন, হেমায়েত সাহেবের মতো বিচক্ষণ মিডিয়াবান্ধব ইসলামপন্থী নেতা বাংলাদেশে দ্বিতীয়জন নেই। তিনি অসহায় গরীব দুস্থদের পাশে দাঁড়াতেন। কোথাও কোনো অসহায় মানুষের সন্ধান পেলে গোপনে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। মানবিক দরদ নিয়ে তাদের মাথায় হাত রাখতেন। এমনকী তিনি অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও নিজ দলের নেতাকর্মীদের সুবিধা অসুবিধার খোঁজ রেখেছেন। আর্থিক সহায়তা করেছেন। তার পারিবার থেকে জানা যায়- মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া সম্পদের একটা অংশ গরীব দুস্থদের সাহায্যে ব্যায় করার জন্য স্বজনদের প্রতি তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন। এসব থেকেই বোঝা যায় তার হৃদয়ের বিশালতা কতো বিস্তর ছিল।

তার দলের প্রতি কিছু খোলা প্রশ্ন : এটিএম হেমায়েত উদ্দিনের মৃত্যুর পর কিছু প্রশ্ন তার দলের দিকে নজর করে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, এমন একজন জনদরদী এবং ত্যাগী নেতার জন্য ইসলামী আন্দোলন কী করেছে? তার অসুস্থতার সময় ইসলামী আন্দোলন কতোটা তার পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশে বিদেশে তার চিকিৎসার কতোটা খোঁজখবর করেছে? কতোটা তদারকি করেছে? হেমায়েত উদ্দিনের জানাযায় কেনো দলীয় আমীর উপস্থিত ছিলেন না? ১১ অক্টোবর তারিখে তিনি কোথায় ছিলেন? দেশের যে প্রান্তেই থাকেন না কেনো ততক্ষণাৎ ঢাকায় আসা, হেমায়েত সাহেবের জানাজায় অংশ নেয়া, তার শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো কি খুব বেশি কঠিন ছিল? নাকী হেমায়েত সাহেবের পরিবার, তার শুভাকাঙ্খিরা এতটুকুও ডিজার্ভ করে না?

এটিএম হেমায়েত উদ্দিনের জানাজার ইমাম দলের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করিম কেনো জানাযার আগে পরে কোনো কথা বলেননি? সেখানে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন অথচ দলের শীর্ষ নেতা হিসাবে তিনি একটি কথাও বললেন না কেন? হেমায়েত সাহেবকে উপস্থাপন করলেন না, নিজের দল বা আদর্শের কথা বললেন না, কেন?

হেমায়েত উদ্দিনের লাশ বায়তুল মোকাররমে আনা হলো না কেন? এলাকাবাসীর দাবী অনুযায়ী তাদের বড় হুজুরের প্রথম জানাজা রাজাবাজারে হতে পারতো, কিন্তু দ্বিতীয় জানাজা জাতীয়ভাবে বায়তুল মোকাররমে হওয়া উচিত ছিল। সেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব রাজনীতিক, সংবাদ কর্মীসহ সব শ্রেণীর মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি, কেন? এর দায় কার?

অনেকেই মনে করেন ইসলামী আন্দোলন কাম্যমানের ভূমিকা রাখেনি। দায়িত্ব নিয়ে কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করেনি অথবা চেষ্টাও করেনি। এই না করার পেছনের কারন কী? হেমায়েত সাহেবের জনপ্রিয়তায় কী কেউ ঈর্ষাকাতর? নাকী দায়িত্ব নেয়ার ভয় বা অর্থ খরচের ভয়? নাকি সত্যিকারার্থে হেমায়েত সাহেবকে ধারণই করতে পারেনি তার দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ?

আরও পড়ুন : এটিএম হেমায়েত উদ্দীন : তিনি আর একটু বেশি পেতে পারতেন!

হেমায়েত সাহেবের মৃত্যুর আগে জেনেছি তিনি একজন অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর জানতে পারলাম তিনি অধ্যাপক নন ‘সহকারী অধ্যাপক’ ছিলেন। ইসলামী আন্দোলনে এমন অনেক অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, এডভোকেটরা আছেন যারা প্রকৃত অর্থে এগুলো লিখতে পারেন না, কিন্তু অনায়াসেই এই পদবীগুলো ব্যাবহার করেন। আমি মনে করি কোনো হকপন্থী দলের জন্য এটা লজ্জাকর। এটা এক ধরণের প্রতারণা। এর দ্বারা দেশের চিন্তাশীল মানুষের কাছে ভুল বার্তা যায়। মানুষ আস্থাহীন হয়ে পড়ে। কারন আপনারা হয়তো মনে করছেন মানুষ এগুলো বুঝতে পারে না বা চিন্তা করে না, আসলে বেপারটা একদম তা নয়।

এর আগেও ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীর মৃত্যুতে দলের শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা রাখতে, পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। বরগুনার পীর আবদুর রশিদ সাহেবের মৃত্যুর পরও দলের আমীর বা নায়েবে আমির কাউকে সেখানে যেতে দেখা যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ক্ষেত্রে যদি এই আচরণ করেন শীর্ষ নেতারা; তবে সাধারণ কর্মী সমর্থকদের ক্ষেত্রে কী ঘটে বা ঘটবে? নিজ দলের নেতাকর্মীর খোঁজখবর না রাখা, প্রয়োজনে তাদের পাশে না দাঁড়ানো নেতারা কীভাবে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াবেন? কী উপায়ে দেশের জনগণ তাদের উপর ভরসা করবে?

ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে এসব প্রবণতা সব সময় দেখা যায়- তারা নেতাকর্মীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলতে, এয়ানত সংগ্রহ করতে যতোটা উৎসাহী নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে ততটা উৎসাহি নয়। মনে রাখা দরকার এভাবে হয়তো অনেক কিছু হতে পারে, রাজনীতি হয় না। রাজনীতি করার জন্য উদারতা লাগে, বিশালতা লাগে। গণমূখি চিন্তাচেতনা লাগে, যার জ্বলন্ত উদাহরণ এটিএম হেমায়েত উদ্দিন।

[লেখাটি বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলের গঠনমূলক সমালোচক হিসেবে পরিচিত ইতালী প্রবাসী সাংবাদিক পলাশ রহমানের নিজস্ব চিন্তা-চেতনার উপর ভিত্তি করে লেখা। পাবলিক ভয়েস এই লেখার ব্যাপারে চিন্তা-চেতনাগত কোন দায় গ্রহণ করে না]

মন্তব্য করুন