ইসলামী দলগুলোর জাতীয় ঐক্যে ইসলামী আন্দোলনের ভূমিকা ও বাস্তবতা

প্রকাশিত: ১:৩৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০১৯
ইসলামী আন্দোলনের ঐক্যের ভূমিকি

মতামত : বাংলাদেশে বিভিন্ন ইসলামী দলগুলোর রাজনীতি নিয়ে সেক্যুলারদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় তেমনি ভাবে ইসলামপন্থীদের মধ্যেও ইসলামী রাজনীতিতে কোন ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম না থাকা নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বর্তমানে বৃহত ইসলামী দল হিসেবে পরিচিত ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ এর ব্যাপারে ঐক্য নিয়ে অনেকেই কথা বলেন। এ সংগঠনের ঐক্যচিন্তা কেমন এবং কিভাবে তারা ঐক্য চায় এ বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহকারী প্রচার সম্পাদক মুফতী দেলোয়ার হোসাইন সাকী। পাঠকদের সুবিধার্থে আলোচনাটি পাবলিক ভয়েসে প্রকাশ করা হলো।

‘বিশদলীয় জোট’ – ইসলামী মূল্যবোধ সুরক্ষায় গঠিত ঐতিহ্যবাহী প্ল্যাটফর্ম। ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ – ইসলামবিরোধী নাস্তিক্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ঈমানজাগানিয়া আন্দোলন। কে বলেছে ঐক্য নাই? দেশের শীর্ষ ওলামা হযরত ঐতিহ্যবাহী এই দু’টি ব্যানারে সংঘবদ্ধ। একটি রাজনৈতিক এবং অন্যটি অরাজনৈতিক সার্বজনীন ব্যানার। আমরা বুঝি এবং জানি। আপনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কথা বলবেন!

হ্যাঁ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নীতি আদর্শ ও শরিয়াকে সামনে রেখে প্রথম ব্যানারে অংশগ্রহণ করেনি। এই ক্ষেত্রে আপনার যুক্তি ভিন্ন হতে পারে- সেটা আপনার অভিমত। দ্বিতীয় ব্যানারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সদা সক্রিয় ছিল। ব্যানারের দায়িত্বে বা নেতৃত্বে ছিল না। থাকতে দেয়া হয়নি।

মানুষ টাকায় বিক্রি হয় না, গরু ছাগল টাকায় বিক্রি হয়! ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গত ত্রিশ বছরের আমলনামা জাতির কাছে পরিস্কার। নিছক এমপি-মন্ত্রী হওয়া, ব্যক্তি স্বার্থ বা দুনিয়াবী কিছু সম্মানের জন্য কিংবা অর্থের লোভে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নীতি আদর্শ বিসর্জন দিতে রাজি নয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুহতারাম আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই দৃঢ়চিত্তে বারবার জোট বা সমঝোতার নানা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদের প্রতিবাদে দলীয় অবস্থান পরিস্কার করেছেন। তিনি অনেকবার বলেছেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ক্ষমতামুখী। বাস্তবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দুনিয়ার স্বার্থের জন্য তারা রাজনীতি করেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চায়, দুনিয়ায় শান্তি আর আখিরাতে মুক্তি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মৌলিখ শ্লোগান-‘নো আওয়ামী লীগ, নো বিএনপি, ইসলাম ইজ দ্যা বেস্ট।’ এজন্য আমরা জোট-মহাজোটে নেই। কেননা জোট-মহাজোটে ইসলাম নেই। যেখানে ইসলাম নেই, সেখানে আমরাও নেই।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কোনো নির্বাচনী জোটে যোগ দিতেও আগ্রহী নয়। নিছক এমপি-মন্ত্রী হওয়া, ব্যক্তিস্বার্থ বা দুনিয়াবী কিছু সম্মানের জন্য কিংবা অর্থের লোভে আমরা কোনো জোটে যেতে পারি না। আমরা যাদের সঙ্গে ঐক্য করবো, তারা কি ইসলাম চায়? এই প্রশ্নে যদি তারা একমত হয়, তাহলে সংসদের একটা সিট (আসন) না দিলেও আমরা খাদেম হয়ে কাজ করবো। আর এই প্রশ্নে যদি এক না হয়, তাহলে ৩০০ আসন দিলেও আমরা ওই ঐক্যে নাই। আমরা আসনের রাজনীতি করি না, আমরা রাজনীতি করি ইসলামের, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য। আমরা ইসলাম, দেশ এবং মানবতার রাজনীতি করি। আমাদের রাজনীতি ইবাদত। এর প্রতিদান আমরা একমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই পাব, ইনশাআল্লাহ।

ঐক্যের মূলনীতি কী? : আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন , হক ও বাতিলের মাঝে ঐক্যের একটা কুফল আছে । হক সর্বদাই কিছুটা কঠিন হয়ে থাকে এবং তা নফসের মনপুত না হওয়ার কারণে ঐক্যের খাতিরে হকপন্থীগণ তাদের রীতি নীতি কিছুটা পরিত্যাগ ও কিছুটা শিথিল করতে প্রলুব্ধ হয় , অথচ মিথ্যা সহজ ও নফসের অনুকূল হওয়ায় তা সহজেই গ্রহণ করে ফেলে। অপর পক্ষে বাতিলপন্থীরা কোন অবস্থাতেই মিথ্যাকে পারিহার করে সত্যকে গ্রহণ করে না । ইতিহাস প্রমাণিত সত্য মিথ্যা, হক বাতিল, ইসলাম ও গণতন্ত্রের ঐক্যের পরিণতি কখনো শুভ হতে পারে না । থানবী রহ. এর কথাটা আজ শতভাগ প্রমাণিত যে বিএনপির সাথে ইসলামী দলের ঐক্যে ফল শেষ পর্যন্ত ইসলামী দলগুলো শিথিল হতে হতে একেবারে বাতিলের সাথে একাকার হয়ে গেল ।

কিসের ঐক্য?, কার সাথে ঐক্য?, ঐক্যের ভিত্তি কী হবে? : আজকের নিপীড়িত জনগণ তাদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং কল্যাণ ও উন্নয়নের স্বার্থে গ্রহণযোগ্যতা আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক ওলামায়ে কেরামের একটি শক্তিশালী প্লাটফর্ম সময়ের বড় দাবি। ওলামা হযরত কখনো দুর্নীতিপরায়ন, ইসলামবিদ্বেষী, জালেম, শোষকদের হাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে শুধু সীমিত ধর্মীয় দায়িত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা কাঙ্ক্ষিত নয়। সমাজ আজ আদর্শিক ও জাগতিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে দিন দিন মন্দের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই চরম সংকটে ওলামা সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে গোটা সমাজকে সত্যের দিকে, কল্যাণের দিকে, সুবিচারের দিকে ফেরাতে এগিয়ে আসা।

সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব হাতে না নিলে সমাজে সত্য, নয়, সুবিচার, কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। মসজিদ-মাদ্রাসা খানকার পাশাপাশি সামাজিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করতে হবে। এই দায়িত্ব কি সব আলেমের? না। ওলামা হযরতের মধ্য থেকে যারা এই কাজের জন্য উপযোগী ও যোগ্যতার অধিকারী তারাই এই কাজে এগিয়ে আসবেন। বাকিরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাধ্যানুযায়ী এ সহযোগিতা করবেন। আমাদের বিশ্বাস, ওলামা কেরাম যদি সমষ্ঠিগতভাবে জেগে উঠে তাহলে জনগণকে সংগঠিত এবং সঞ্চালিত করা সম্ভব। এই সম্ভাবনা যারা বুঝেন, তারাই আজ ঐক্যের কথা বলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কার সাথে ঐক্য? কিসের ভিত্তিতে ঐক্য? ইতিপূর্বে আমরা সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ, হাফেজ্জি হুজুর রহ. এর খেলাফতে আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি, হেফাজতে ইসলামসহ অনেক ব্যানার দেখেছি। দেখেছি মন্দের ভালো স্লোগান দিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির সাথে গোপন আঁতাত ও প্রকাশ্য আঁতাতের। দেখেছি শক্তিশালী একটি ব্যানার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মাটির সাথে মিশে যেতে।

হ্যাঁ, ঐক্য। আমরা জানি ঐক্য ছাড়া সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। ঐক্যবদ্ধ হওয়া ফরজ। “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো বিচ্ছিন্ন হয়ো না”- মহান আল্লাহর এই নির্দেশনা সুস্পষ্ট। হাসিনা বা খালেদা অথবা এরশাদের রজ্জুকে নয়, শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরতে হবে আল্লাহর রজ্জুকে। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে থাকতে হবে অবিচল, আপোষহীন। যখন এই নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটেছে তখনই ঘটেছে রাজনৈতিক জীবনে সৃষ্টি হয়েছে কালো অধ্যায়ের। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটাই ছিল মহান আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরে সকল দল মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ একটি সংগ্রামের বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে। দেশের শীর্ষ ওলামা হযরতের তত্ত্বাবধানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। এখনো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্যে ব্যাপারে শতভাগ পজিটিভ। ইসলামের স্বার্থ, নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিছক ক্ষমতার মোহে কোন বস্তুবাদী শক্তির সাথে হতে পারে না। এমপি মন্ত্রী ক্ষমতার স্বাদ ও গন্ধ আমাদের কাছে মুখ্য নয়। মুখ্য ইসলাম।

আজ বাংলাদেশের নিবন্ধিত অনিবন্ধিত অনেক ইসলামী দল আছে। যেহেতু ইসলামী দল -সেহেতু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মৌলিক নীতি আদর্শের সাথে তাদেরও মিল থাকার কথা। তারাও নীতি এবং আদর্শের ক্ষেত্রে আপোষহীন এটা আমরা কামনা করি। কার সাথে ঐক্য, কিসের ভিত্তিতে ঐক্য, ঐক্যের শর্ত কী- গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে রেখে ইসলামী দলগুলো ভূমিকা রাখলে দুনিয়াতে কোন সফলতা আসুক বা না আসুক, পরকালে অন্তত নাজাত পাওয়া যাবে। ইসলামী দল সমূহের কার্যকর ঐক্য বরাবর সময়ের দাবী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে । সে হিসেবে ৭টি ইসলামী দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ইসলামী ঐক্যজোট এর ব্যানারে জামায়াত ব্যাতিত সকল ইসলামী দল মিলে একটি প্রতিকে এক আসনে নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছিলো।

ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন তথা বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ইসলামী দল সমূহের মধ্যে ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে যে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে আসছে, তার কিছু নমুনা নিচে তুলে ধরার চেষ্টা করবো এখানে।

১. ইসলামী ঐক্যজোটের ঐক্যকে মজবুত করতে তৎকালীন সময়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আমীর মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান পদে নিজে না থেকে শায়খুল হাদীস আজিজুল হক রহ.কে ছেড়ে দিয়ে নিজে ভাইস চেয়ারম্যান‌ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. ও শায়খুল হাদীস আজিজুল হক রহ. নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে আমিনী সাহেব ইসলামী ঐক্যজোটের বাইরে থাকায় সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. নিজ উদ্যোগে আমিনী সাহেবকে ইসলামী ঐক্যজোটে অন্তর্ভুক্ত করে মজবুত ইসলামী ঐক্য করতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখেন। যাতে প্রমান করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্যকামী একটি দল।

২. পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী রহ. ও আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ.সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ পবিত্র মক্কা নগরীতে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের ইসলামী দল সমূহকে ঐক্যবদ্ধ করতে তারা একটি উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। সে অনুযায়ী তারা ‘সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ’ নামে একটি ফোরাম গঠন করেন। এই সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ দেশের সকল ইসলামী দল বিলুপ্ত করে একটি ইসলামী দলের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হতে সকলকে আহবান জানিয়ে ঢাকা, খুলনাসহ কয়েকটি এলাকাতে আলেম ওলামাদের আলোচনায় বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ আলোচনা করতে থাকেন।

সর্বশেষে ঢাকার মুহাম্মদপুরের জামেয়া রহমানিয়া মাদরাসাতে সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের চুড়ান্ত এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার অগ্রগতি সম্পর্কে সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের অন্যতম নীতিনির্ধারক ও প্রতিষ্ঠাতা চট্টগ্রামের দারুল মা’আরিফ এর মহাপরিচালক আল্লামা সুলতান যওক নদভী বলেন, ঐ দিনের সভায় একমাত্র মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই বলেছেন, আপনারা যদি সকলে একমত হন যে সব দল ভেঙ্গে একটি ইসলামী দল হবে তবে, আমরা ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে বিলুপ্ত করে আপনাদের সিদ্ধান্ত মেনে নতুন ইসলামী দলের একজন কর্মী হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত আছি।

আল্লামা সুলতান যওক নদভী বলেন, নিজের দল ভেঙ্গে কর্মী হয়ে কাজ করার সাহসী উচ্চারন আর কোনো দল বা ব্যাক্তি করতে পারে নি। সকলেই বলেছেন, সকলে আমাদের দলে আসেন। কিন্ত কেউ নিজেদের দল বিলুপ্ত করবেন একথা বলতে সাহস পান নি। যা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. পেরেছেন। এখানেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্যের পক্ষে তাদের অবস্থান প্রমান করেছে।

৩. আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতৃত্বে ৪ দলীয় জোট গঠনের সময়ে ইসলামী ঐক্যজোটের সভার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো, বিএনপি ইসলামী ঐক্যজোটের ৮ শর্ত মানলে ৪ দলীয় জোটে ইসলামী ঐক্যজোট যোগ দিবে, অন্যথায় নয়। জোটের এমন সিদ্ধান্তকে লঙ্গন করে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন কে না জানিয়ে রাতের আঁধারে ইসলামী ঐক্যজোটের ঐক্য নষ্ট করে ইসলামী ঐক্যজোট ৪ দলীয় জোটে অংশ নেয়। এ কারনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এর মজবুত ঐক্যের উদ্যোগ হোচট খায় । ইসলামের নামে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহনের রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈধতা পায়।

ফলে ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে ইসলামী ঐক্যজোট আজ ৬ খন্ডে বিভক্ত হয়েছে । শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত খেলাফত মজলিস ৪/৫ ভাগে বিভক্ত হয়। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিও ৪ ভাগে বিভক্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ২ ভাগে বিভক্ত হয়। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ২ ভাগে বিভক্ত হয়। ক্ষমতার স্বাদ গ্রহনের রাজনীতির কারনে ইসলামী ঐক্যজোট ভেঙ্গে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন কে দূরে ঠেলে দেয়ার কারনে তাদের দলগুলোও‌ ভেঙ্গে খান খান হয়ে তাদের অনেকে ক্ষমতাসীন সেক্যুলার রাজনীতির ধারক বাহক আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্য চায় বলেই প্রথমে নিজেদের নীতি আদর্শকে মজবুত করে দলের ঐক্য ও সংহতি ধরে রেখেছে। এখানেও প্রমান করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্য প্রয়াসী একটি ইসলামী দল।

৪. হাইকোর্ট কতৃক সকল ধরনের ফতোয়াকে নিষিদ্ধ করে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে অরাজনৈতিকভাবে গড়ে ওঠা ঈমানী আন্দোলন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটিতে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন থাকায় ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে ইসলামী ঐক্যজোটের পরে ইসলামী আইন বাস্থবায়ন কমিটিকে ৪ দলীয় জোটে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা শুরু হলে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এ ঈমানী আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম থেকে দূরে সরে আসতে বাধ্য হয়।

ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন (বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) কারো দুনিয়ার সার্থ সিদ্ধির জন্য নয় ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে। ঐক্যের পক্ষে থাকলেও দলের নীতি আদর্শকে জলাঞ্জলী দিয়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কারো সাথে কোনো জোটবদ্ধ হবে না। যে কারনে এখানেও ঐক্যের নামে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন কে ঐক্য করতে গিয়ে হোচট খেতে হয়।

৫. হেফাজতে ইসলাম এর আন্দোলন শুরুর সময়ে হাটহাজারীতে অনুষ্ঠিত ওলামা সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আমীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই বলেছিলেন, কোনো দলের লেজুড়ভিত্তি না করে আসুন আমরা ইসলাম পন্থীরা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলি। তখন বিএনপি জোট সঙ্গী একটি ইসলামী ভাঙ্গা দলের প্রধান পীর সাহেব চরমোনাই কে ইশারা ইঙ্গিতে আক্রমন করতে শুরু করে বৃহত্তর ঐক্য বিনষ্ট করে। হেফাজতে ইসলাম এর মতো সংগঠনকে জামায়াত বিএনপির সহযোগি হিসেবে তৈরী করা হয়। এখানেও ইসলামপন্থীদের বৃহত্তর ঐক্য হওয়ার আহবানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয় ক্ষমতার স্বাদ গ্রহনের লোভ কারীরা । ফলে ইসলামী ঐক্যের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়।

সকল ইসলামী দলের ঐক্য দাবি ও বাস্তবতা! : অনেকেই আজ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কাছে সকল ইসলামী দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির প্রস্তাবনা পেশ করছেন। আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। ঈমান আকিদার হেফাজত, ইসলামবিরোধী আগ্রাসী শক্তির চক্রান্তের মোকাবেলায় একটি অর্থবহ ঐক্য সময়ের অন্যতম দাবি। পারস্পরিক মতভেদ ও মতানৈক্যের দেয়াল ভেঙ্গে আমরা ঐক্যবদ্ধ হলে – আমরাই হবো প্রথম শক্তি এবং বিজয়ী শক্তি। এই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখেই ১৯৮৭ সালে ১৩ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। প্রতিষ্ঠালগ্নের সেই চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আজকের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরাবরই লালন করছে। ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি থেকে শুরু করে হাটহাজারী মাদরাসার ঐতিহাসিক ওলামা সম্মেলন ও হেফাজত আন্দোলনের সূচনাপর্বে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি বৃহৎ ইসলামী ঐক্যের প্রস্তাবনা পেশ করেছিল।

ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি ছিল হেফাজতের মতো একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। সেই প্লাটফর্মে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সর্বশক্তি নিয়োগ করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ইতিহাস বড়ই করুণ। ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই ব্যানারগুলো বরাবরই বিতর্কিত হয়েছে। আজ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ছাড়া অন্যান্য ইসলামী দলগুলো ‘মন্দের ভালো মন্ত্রে’ বিশ্বাসী। তাই হয়তো আওয়ামী লীগ নয়তো বিএনপি’র ছত্রছায়ায় ক্ষমতার অংশীদার হতে তারা বেশি আগ্রহী। তারা অন্য একটি ইসলামী দলের সাথে ঐক্য দূরে থাক, নিজেদের পারস্পরিক ঐক্যও অটুট রাখতে সক্ষম নন। নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভাঙ্গা গড়ার হাজারো নোংরা ইতিহাস জাতি জানে। তারা মৌসুমে মৌসুমে সাপের মত চামড়া বদলায়। ইসলাম, নীতি ও আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে গোপনে বাতিলের সাথে আঁতাত করে। তারা আজ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে নমিনেশন নেয়ার জন্য পাগলপারা। তারা কেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর সাথে ঐক্যে করবেন? তারা খুবই চালাক, চতুর ও বিচক্ষণ। জানেন ও বুঝেন। কল্পনা করেন, আওয়ামীলীগ অথবা বিএনপির টিকিট পেলেন নিশ্চিত এমপি বা মন্ত্রী। লোভনীয় এই অফার কে না গ্রহণ করতে চাই!

তাই ঐক্যের প্রস্তাব অবান্তর। বন্ধুরা, আগে তাদেরকে লাইনে আনুন। তাদের পারস্পরিক ঐক্যটাকে সুদৃঢ় করুন। নিছক ক্ষমতা নয়, ইসলামী শক্তির বিকাশ সাধনের জন্য ঐক্য হওয়ার সবক দিন। একক ইসলামী শক্তির সম্ভবনার কথা বলুন। রাতের আধারের নাটক বন্ধ করতে বলুন। আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে নয়, ইসলামকে ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সর্বোচ্চ কুরবানি করতে প্রস্তুত। তাদের ম্যানেজ করুন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অপেক্ষায় আছে…!

লিখেছেন : মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসাইন সাকী, কেন্দ্রীয় সহকারী প্রচার সম্পাদক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন