যেভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এটিএম হেমায়েত উদ্দীন

প্রকাশিত: ৯:২২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৯

শহিদুল ইসলাম কবির : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মসজিদের নগরী ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজার জামে মসজিদের একনাগাড়ে ৪২ বছরের খতিব অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন সাহেব গতকাল ১১ অক্টোবর সকালে তাঁর বাসায় লাঠি হাতে আমার সাথে (শহিদুল ইসলাম কবির, জয়েন্ট সেক্রেটারী জেনারেল, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন) এর সাথে বসে কথা বলা অবস্থায় বসা থেকে হঠাৎ বিছানায় পরে যান। সময়টা সকাল ১০.৩০ এর পরে হবে।

সাথে সাথে আমি ও আমার সাথে থাকা ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতি ডাঃ মোহাম্মদ জাকির হোসেন ভাই আতঙ্কিত হয়ে পরি। প্রথমে হুজুরের শ্যালক মাওলানা সায়েম হোসেনের সাথে ফোনে কথা বলে হুজুরের এ পরিস্থিতির কথা জানালে তিনি বললেন এভাবে মাঝে মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর পরেই বাসায় হুজুরের নাতিদের ডেকে তাঁর একমাত্র ছেলে হাফেজ মাওলানা মোঃ জিয়া উদ্দীন বাসায় আছে কি না জানতে চাইলে তারা জানায়, জ্বী, তিনি বাসায় আছে।

সাথে সাথে জিয়া উদ্দীন সামনে এসে উপস্থিত হলো। বললাম হুজুরের এই পরিস্থিতিতে ডাক্তার আনতে। সে নিজে কিছু সময় হুজুরকে ডাকছিলো। বলছিলো পানি খাবেন কি না? কিন্তু তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন পানি খাবেন না। হুজুরের এ অবস্থা দেখে প্রথমে তাঁর একমাত্র মেয়ে বোরকা পড়ে সামনে এসে তাঁর প্রিয় বাবাকে ডাকতে শুরু করেন এবং পায়ের পাতা, হাত, মাথা ম্যাসেজ করতে শুরু করেন। অস্থির হয়ে প্রিয় পিতার জবাব শুনতে চেষ্টা করছিলেন তিনি।

পড়ুন : এটিএম হেমায়েত উদ্দীনের বর্ণাঢ্য জীবন

ততক্ষণে পর্দায় আবৃতা হয়ে হুজুরের সহধর্মিণী জিয়া উদ্দীন ভাইর এর সম্মানিতা আম্মা এসে নীচু স্বরে ডাকতে শুরু করলেন এবং মেয়ের মতো হাত, পা, মাথা ম্যাসেজ করছিণেন। বলতে থাকেন কি হলো মানুষটির! মানুষটি আমাকে বললেন লাঠিটি দাও আমি সামনে যাবো। এই বলে লাঠি নিয়ে সামনে এসে এভাবে হলো। এরই মধ্যে মাথা যখন ঘামাতে দেখলাম তখন হুজুরের সহধর্মিণী বললেন আপনারা একটু ধরেন ওনাকে ঘরের ভেতরে এসি রুমে নিয়ে যাবো। ইতিমধ্যে জিয়া উদ্দীন ডাঃ নিয়ে আসলেনন। ডাঃ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ইঙ্গিত দিলেন তিনি আমাদের মাঝে আর নেই। তাঁর আগে আমি হুজুরের ছোট ভাই মাওঃ আনিছুর রহমানকে ফোন করে বলেছিলাম একজন ডাক্তার নিয়ে হুজুরের বাসায় আসতে। এমন কথা শুনে মাওঃ আনিছুর রহমান ও দ্রুত বাসায় চলে আসেন।

আরও পড়ুন : এটিএম হেমায়েত উদ্দীন আর একটু বেশি পেতে পারতেন

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুহতারাম মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ সাহেব কে জানিয়েছি হুজুরের অবস্থা ভালো না বাসায় আসতে। একই সংবাদ জানিয়েছি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সেক্রেটারী ও জাতীয় শিক্ষক ফোরামের সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা এবিএম জাকারিয়া ভাইকে। সতর্কতা মূলক ফেসবুক পোস্ট ও দিয়েছিলাম। একটু পরে ডাঃ সাহেব আবার পরীক্ষা করে যখন অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন সাহেবের ইন্তেকালের সংবাদ চুড়ান্তভাবে ঘোষণা করেন তখন বাসায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কান্নার শব্দে সব কিছু ভারী হয়ে উঠে।

এসময় বাসায় অবস্থানরতদের মাতম করার সময় নেই। নিজ নিজ উদ্যোগে দায়িত্বপালন জরুরী হয়ে পরে। একমাত্র ছেলে জিয়া উদ্দীন যেভাবে পিতার মৃত্যুর পরিস্থিতিতে সব কিছু সামলিয়েছে তা বলে ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে না। ধৈর্যের পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হয়েছে। অথচ তার ফুফাতো ভাই এর কান্নার আওয়াজে আমরাও সুস্থ থাকতে পারিনি। অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন সাহেব যাকে সাথে নিয়ে ইন্ডিয়াতে গিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন হুজুরের সেই শ্যালক মাওঃ মোঃ সায়েম লোকজনের আগমন দেখে হুজুরের সহধর্মিণীকে বললেন বুবু তুমি ভেতরে যাও। কুরআন তেলাওয়াত করে দুআ করো লোকজন আসবে। এরপর হুজুরের সহধর্মিণী স্বামীর ও একমাত্র কন্যা বাবার মৃত্যু সংবাদ নিয়ে শোকসন্তপ্ত হয়ে নিজ গৃহে প্রবেশ করেন।

অপরদিকে কান্নার সাথে আমাদের বিভিন্ন দায়িত্বপালন চলতে থাকে। আমার চোখের সামনে হুজুরের চলে যাওয়ার বিষয়টি আমার বেদনা অনেক বৃদ্ধি করে দিয়েছে। কারো সাথে কথা বলার মন মানসিকতা হারিয়ে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলাম। হুজুরের দাফন সম্পন্ন করে হুজুরের একাধিক ভাই ও ছেলে জিয়া উদ্দীন এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসার কথা বলতে চেয়েছি যখনি তখনই অঝোর ধারায় কান্না বন্ধ করতে পারিনি। এমন কান্না আমার আব্বা ও পীর সাহেব চরমোনাই রহ. ইন্তেকালের পরে করেছি কি না আমার স্বরণে নেই।

আমার কষ্ট ও ব্যর্থতা হলো শোকাতুর হয়ে পরার কারণে হুজুরের ইন্তেকালের সংবাদ যথাযথ সময় যথাযথভাবে গনমাধ্যম কে দেয়া ও সমন্বয় করতে পারিনি। যে কারণে আমার কষ্টের পাশাপাশি গণমাধ্যমে কর্মরত হুজুরের শুভাকাঙ্ক্ষীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এজন্য আমি সকল গণমাধ্যম কর্তা ও কর্মীদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। দাফন শেষ করে যখন বাগেরহাট থেকে গাড়িতে একা যখন গাড়িতে ঢাকায় আসছিলাম তখন ও ফেসবুকে বিভিন্ন পোষ্ট ও কমেন্টস দেখে একা একা অনেক কান্না করেছি যা মনের অজান্তে চলে এসেছে। কারো ফোনে ভালো করে কথাও বলতে পারিনি।

ইন্তেকালের ৩০ ঘন্টা পরেও মনে হচ্ছে এটিএম হেমায়েত উদ্দিন সাহেব আমাদের মাঝে আছেন। তিনি ইন্তেকাল করেননি। আমি আর কিছু বলতে পারছি না শুধু কিংবদন্তি এই নেতার রুহের মাগফিরাত কামনায় সকলের নিকট দুআ কামনা করছি। ভবিষ্যতে আরো লিখবো অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন রহ. সম্পর্কে।

আশাকরি ওনার উপরে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ পাবে। নির্মিত হবে ডকুমেন্টারী। যা গতকাল ওনার ভাই ও সন্তানের সাথে মোড়েলগঞ্জ যাওয়ার পথে আলোচনা হয়েছে। যার কাছে যে স্বৃতি আছে তা লিখে ও চিত্র দিয়ে সহযোগিতা করবেন বলে আমি আশাবাদী।

লেখক : সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক নেতা।

মন্তব্য করুন