ভারতের পানিতে বাংলাদেশে মানবতা ভেসে যায়!

প্রকাশিত: ১০:৩৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৯

সম্প্রতি ভারতের সাথে করা ফেনী নদীর পানি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের পানিতে ভারতের মানবতা হাসলেও ভারতের পানিতে বাংলাদেশের মানবতা ভেসে যায় অনিশ্চিত গন্তব্যে। প্রায় প্রতিবছরেই বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়ার ফলে অযাচিত বন্যায় থেমে যায় পদ্মা পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা। নদী ভাঙনে ঘর ছাড়া হয় হাজার হাজার মানুষ। ভিটে মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে ভবিষ্যত অনিশ্চত হয়ে পড়া মানুষের জীবন হয়ে যায় চরম অমানবিক।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার রাজ্যের মানুষসহ পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরাও ফারাক্কা বাঁধকে ক্ষতির কারণ বলে তুলে নেওয়ার দাবি করে আসছেন এখনো। পশ্চিমবঙ্গসহ বিহার রাজ্যে বন্যার কারণে এ বাঁধ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে খোদ ভারতেই।

সম্প্রতি রাজবাড়ীতে নদী ভাঙনের ফলে নিঃস্ব হওয়া এক পরিবারের ৩ বছরে শিশুর একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে যা ফারাক্কা বাঁধের ফলে সৃষ্ট এপারের করুণ দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা নদীর চলমান ভয়াবহ ভাঙনে সহস্রাধিক পরিবার ইতোমধ্যে গৃহহারা হয়েছে। হঠাৎ উত্তাল আগ্রাসী হওয়া পদ্মার আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ভয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়। সাজানো গোছানো বাড়ি ঘর নিজেদের হাতে ভেঙে নিয়ে যেতে হচ্ছে।

এমনই একটি ভাঙা ঘরের বেড়ার নিচে শুয়ে আছে ৩ বছর বয়সী শিশু সুলেমান। ভাঙনের ফলে প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। ব্যস্ত সময়ে সুলেমানের দিকে নজর দেয়ার সময় ছিলো না কারোর। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও বিধ্বস্ত শিশুটি এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে রান্না ঘরের পাটখড়ির একটি বেড়ার/চালা নিচে।  যেন সাগর পড়ে থাকা পৃথিবী ব্যাপী আলোড়িত শিশু আইলানের মূর্ত প্রতিচ্ছবি। ছবিটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে।

গত ৫ অক্টোবর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থেকে নিজের মোবাইল ফোনে ছবিটি তুলেছেন গোয়ালন্দ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের আলম চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা সুলতান হোসেন। নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে শেয়ার করে ছবিটির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘ছবি যেন ছবি নয়, এ যেন জীবনযুদ্ধ’। ছবিটি পোস্ট করার পর ওই দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেই ছবিটিই শেয়ার করেছে হাজারেরও বেশি মানুষ।

ছবিটি নিয়ে সুলতান হোসেন লিখন জানান, গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের ভয়াবহ নদীভাঙন দেখতে আমি ওইদিন দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ১নং ব্যাপারীপাড়া গ্রামে যাই। সেখানে দেখতে পাই বহু পরিবার তাদের ঘর-বাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত।

তিনি বলেন, ওই অবস্থার মধ্যে সুলেমানকে দেখতে পাই। তাকে দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। শিশুটিকে দেখে আমার ৩ বছর বয়সী সিরিয়ার শিশু আয়লানের কথা মনে পড়ে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে পালিয়ে বাঁচতে সে পরিবারের সঙ্গে নৌকাযোগে পাড়ি দিতে চেয়েছিল ভূমধ্যসাগর। গন্তব্য ছিল ইউরোপের দেশ গ্রিস। কিন্তু তাদের শেষরক্ষা হয়নি। নৌকাডুবে আয়লানের নিথর দেহ ভেসে গিয়ে থেমেছিল তুরস্কের উপকূলে। এ নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক তোলপার সৃষ্টি হয়েছিল।

লিখন বলেন, সুলেমানের ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করার পর এতটা সারা পড়বে আমি ভাবিনি। সুলেমানের বাবা দরিদ্র গেদন শেখ। মা রোকেয়া বেগম। তাদের আরেকটি ছেলে সন্তান রয়েছে। তারা বর্তমানে রাজবাড়ীর সদর উপজেলার খানখানাপুর ইউনিয়নের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

সুলেমানদের মতো এ রকম সহস্রাধিক পরিবার নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে রাস্তার ধার, রেল লাইন ও মহাসড়কের পাশে এবং বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।

ছবিটির পোস্টে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে মন্তব্য করেছেন।

একজন লিখেছেন- ‘সুলেমানরা যদি এ দেশের মানুষ না হয়ে যদি রোহিঙ্গা হতো তাহলে সরকার এদেরকে যথাযথভাবে হেফাজতে রাখত’।

অনেকে আবার একযোগে ফারাক্কা বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দেয়ায় ভারতের তুলোধুনা করেন। নদীভাঙন থেকে দৌলতদিয়া ঘাট এবং দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নকে রক্ষা করতে আরও আগে থেকে উদ্যোগ না নেয়ায় সরকারেরও তীব্র সমালোচনা করেন কেউ কেউ।

স্থানীয়রাও ফারাক্কা বাঁধকে দায়ি করছেন অনেকে। তাদের দাবি বর্ষা মৌসুুমে ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়ায় অতিরিক্ত পানির চাপে পদ্ম নদী ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। উত্তাল ঢেউ প্রতিবছর কেড়ে নেয় হাজার হাজার পরিবারের ভিটেমাটি। অথচ শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বন্ধ থাকায় পানির অভাবে শুকিয়ে যায় পদ্মার অনেকটা অংশ। ফলে যোগাযোগম কৃষি, শিল্প-বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয় বাংলাদেশ।

/এসএস

মন্তব্য করুন