একের পর এক বেরিয়ে আসছে বুয়েটে ছাত্রলীগের নির্যাতনের ঘটনা

প্রকাশিত: ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৯
আবরারের হত্যাকাণ্ডে ফুঁসে উঠেছে বুয়েট

আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার পর ফিরে আসছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অতীতের বিভিন্ন নির্যাতনের কথা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, র‌্যাগিংয়ের নামে বুয়েটে নির্যাতন আর অপমানের ঘটনা ঘটে হরহামেশাই। ভিন্ন মতের অনেককে শিবির নাম দিয়ে নির্যাতনের ঘটনাও আছে অনেক।

২০১৭ সালের ৩১ মার্চ খোলা একটি ওয়েবপেইজে গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত র‌্যাগিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৬৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের এমন ঘটনা ঘটে এলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘জেনেও’ উদ্যোগী হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নির্যাতন বন্ধে অহায়ত্বই ফুটে উঠেছে বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানের কথায়। বুয়েটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখে তার দপ্তর।

আবরার হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল বুয়েটে বুধবার নির্যাতন নিয়ে শিক্ষার্থীদের বহু প্রশ্নের মুখে অধ্যাপক মিজান বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি, কিন্তু পেরে উঠি না। অনেক সময় তথ্যও আমার কাছে আসে না।’ ব্যর্থতার দায় নিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু আমরা যদি এভাবে চলে যাই, তাহলে এই অবস্থায় কোনো শিক্ষক দায়িত্ব নেবে না।’

দেশের একটি বড় নিউজ পোর্টালকে ৬ জন শিক্ষার্থী তাদের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, তবে তাদের কেউ নাম প্রকাশে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তার আগের দুই রাতে অর্থাৎ বুধবার এবং বৃহস্পতিবার র‌্যাগিংয়ের দিন ঠিক থাকে। নির্ধারিত কিছু কক্ষ ছাড়াও হলের ছাদগুলোতে চলে নির্যাতন। নির্যাতনের জন্য ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প ব্যবহার হয় বেশি।

বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলের ২০১৬ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথম বর্ষে পড়ার সময় একদিন আমাকে ছাত্রলীগের কয়েকজন ছাদে নিয়ে ডেকে পাঠায়।  হাফপ্যান্ট পরে হলে ঘুরলাম কেন, এটা নাকি আমার অপরাধ। সেদিন আমাকে মারধর ও চড়থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেয়। ‘এর পরের দিন আবার ডাকা হয়। সেদিন আমার অপরাধ ’চুল বড় কেন’, অথচ আমার চুল ছোটই ছিল। আমাকে ওইদিন স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়েছিল তারা।’

শেরে বাংলা হলের ২০১৮ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাকেও ডেকে নেওয়া হয়েছিল, আবরারকে যে রুমে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সেই ২০১১ নম্বর কক্ষে। সেদিন ১০-১২ জনকে একসঙ্গে নিয়ে চড়-থাপ্পড় দিয়েছিল ছাত্রলীগের নেতারা।’  আবরার হত্যাকাণ্ডের আসামি অনিক সরকার সেদিনের নির্যাতনে নেতৃত্ব দিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে যখন চড়-থাপ্পড় দেওয়া হয়, এমনভাবে কথা বলছিল, যেন আমাকে আদর করছে। এক নাগাড়ে ২০-২৫টি থাপ্পড় দিয়েছিল।’

র‌্যাগিংয়ের নামে এমন নির্যাতন স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে দাঁড়িয়েছে মন্তব্য করে এই শিক্ষার্থী জানান, ‘আবরারকে যখন ডাকা হয়, তখনও সবাই ভেবেছিল, র‌্যাগ দেওয়ার জন্য নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা এই পর্যায়ে পৌঁছবে কেউ ভাবেনি।’ তবে আবরারের ঘটনাকে ভিন্ন রকম হিসাবে বর্ণনা করে ২০১৭ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সাধারণত সিনিয়র ব্যাচের নেতারা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের র‌্যাগ দেয়। কিন্তু নানা রকম স্ট্যাটাসের জন্য আবরারকে শিবির ব্লেইম দিয়ে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। যখন কাউকে শিবির ব্লেইম দিয়ে নেওয়া হয়, তখন সে সিনিয়র হলেও জুনিয়র-সিনিয়র সবাই মারে।’

ব্রিটিশ ভিত্তিক গণমাধ্যম বিবিসির এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, এটা যে নতুন ঘটছে তা নয়। বুয়েটে এটা অনেক পুরনো। বেশ আগে থেকেই চলে আসছে। আজ যেভাবে জানতে পেরেছি এর আগে এভাবে জানতে পারিনি। তবে আমরা সবকিছুই জানতাম। আর একারণে আবরার হত্যায় আমরা মোটেও অবাক হচ্ছি না।

অরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, শুধু বুয়েট নয়, দেশেল বড় সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই সমস্যা আছে। যেখানে ছাত্রলীগরা হরহামেশাই শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করে। তিনি বলেন, তারা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে একজনকে টার্গেট করে। এরপর তাকে ভিবিন্নভাবে নির্যাতন চালায়।

ইসমাঈল আযহার/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন