মতামত : ভারত ইস্যূতে আই.এ.বি নিয়ে জামায়াতের রাজনীতি নতুন নয়

প্রকাশিত: ৬:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯
ভারত ইস্যূতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি এই প্রথম নয়! জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের নায়েবে আমীর, ভাইস-প্রেসিডেন্ট আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব (হাফিজাহুল্লাহু তায়ালা) এই ইস্যূতে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমীর মরহুম সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. কে নিয়ে অনেকবার কথা বলেছেন। তখনকার টার্মস ছিলো ইসলামী আন্দোলনকে ভারতের দালাল বা ভারত তোষণ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করার প্রচেষ্টা। চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে তিনি হাজার জনতার সামনেও এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং এই সংগঠনকে ভারত তোষণ করে বলে অভিযুক্ত করে জনগণের বাহবা নিয়েছেন।
 
এ কথা অস্বীকার করার কোন সুজোগ নেই যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকটাই অন্যায়ভাবে জামায়াতের প্রভাব এবং ক্ষমতা বিনষ্ট করার আপ্রান চেষ্টা ভারতের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার ছিলো। এবং তারা এ যাত্রায় বিজয়ী হয়ে জামায়াতের রাজনৈতিক মেরুদন্ড অনেকটাই ভেঙ্গে দিতে পেরেছে। (এদেশের রাজনীতি বা কোন কিছুতে ভারত সরকার প্রভাব বিস্তার না করুক পয়েন্টে এটাকেও অবশ্যই সমর্থন করি না) তবে এখন যেহেতু বাংলাদেশের রাজনীতির বাগডোর অনেকাংশেই ভারতের হাতেঅ এবং এদেশে কুটনৈতিকভাবে ভারত প্রভাবশালী তাই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকেও জামায়াতের সাথে তুলনায় এনে কট্টরভাবে ভারত বিরোধীতার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা জামায়াতের কর্মীরা চালাতে চাচ্ছে। যাতে এ সংগঠনটিও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সেই লক্ষ্য সাধনেই মূলত জামায়াতের একজন পেইড কর্মী একটি কল্পিত ভিডিও বাজারে ছেড়ে দিয়েছেন।
 
এক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ভিডিও শেয়ার নির্ভর ফেসবুক কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে যে কতটা অপরিপক্ক তা অন্তত আজকে কিছুটা হলেও পরিস্কার হয়েছে! প্রচুর পরিমান ওয়াজের ভিডিও শেয়ারের প্রবণতাই মূলত এর জন্য দায়ী। এসব বিষয় শেয়ার করে অনেকেই তাদের ঈমান ঠিক রাখেন সম্ভবত!!
 
বর্তমান এই সিমানা বেসিক পুথিবীতে যে কোন দেশের একটি রাজনৈতিক দল পার্শ্ববর্তী প্রভাবশালী দেশের একক বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া কোনভাবেই রাজনৈতিক পরিপক্কতার প্রমান বহন করে না। এবং এর বৃহত ক্ষতির দিকও রয়েছে তাই বাংলাদেশে রাজনীতি করা ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’কে প্রশিক্ষিত এবং পেইড কোন জামায়াত কর্মীর পক্ষ থেকে ভারত বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা একটি সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা। এটা অনেকটাই ‘তুমি আগে যে চুরি করতা, এখনও কী করো’? টাইপের একটি শয়তানী প্রশ্ন ধরণের কাজ। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই শয়তানী প্রশ্নের জবাবে যে চুপ থাকতে হয় বা প্রশ্নকারীকে পাল্টা প্রশ্ন করতে হয় যে, ‘আমি আগে চুরি করতাম এই কথা তুমি কই পাইছো’? সেই বুদ্ধিটা অনেকেরই হয়নি।
 
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা কী ভারতের বিরোধিতা করা? বা তাদের রাজনৈতিক কোন ইশতেহারে কী এমন কথা আছে? আমার জানামতে নেই! বরং তারা এদেশে ইসলাম ও মুসলমানকে অনুসঙ্গ বানিয়ে কুরআন-হাদিসের রীতি অনুসারে দ্বীন কায়েমের রাজনীতি করে সেই সাথে সাথে সারা বিশ্বের মুসলমানদের পক্ষে তাদের নিঃশ্বর্ত অবস্থান থাকে। সে হিসেবে ভারতের মুসলমানদের পক্ষেও তাদের অবস্থান থাকে। যেহেতু কাশ্মীরে এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে উগ্রবাদী হিন্দুত্ববাদীদের হাতে মুসলমানরা নির্যাতিত নিস্পেষিত হচ্ছে তাই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ভারতের মুসলমানদের পক্ষে একটি কঠোর অবস্থানে হয়ত আছে। এটা কোনভাবেই ভারত রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয় বরং ভারতে মুসলিম নির্যাতনের বিরোধিতা। এই সহজ সরল অংকটাকে পুঁজি করেই একটি বিশ্রি রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে জামায়াতের লোকজন মাঠে নেমেছে। এ যাত্রায় তাতের নীতি অনেকটাই এমন যে, ‘আমরা যেহেতু দাড়াতে পারছি না, তোদেরও দাড়াতে দেবো না’। তাই এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই।
 
তবে এ বিষয়ে সুন্দর একটি বক্তব্য পাওয়া গেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহঃ প্রচার সম্পাদক মুফতী দেলোয়ার হোসেন সাকীর একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে। তিনি এ বিষয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনার মধ্যেই লিখেছেন, ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ভারতবিরোধী নয়’ বরং ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন, হয়রানি, জয় শ্রীরাম ইস্যুকে কেন্দ্র করে মুসলিম হত্যাসহ কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অধিকার হরণের প্রতিবাদে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঈমানী দায়িত্ব আদায়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিজেপি সরকারের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেছে। প্রতিবাদ জানিয়েছে। স্বয়ং ভারতেরও মানবতাবাদী সচেতন ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক সংগঠন ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা নরেন্দ্র মোদির চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। ভারত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ও কথিত বন্ধু রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের জুলুমবাজ শাসকের বিরোধিতা রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয়। তাই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ভারতবিরোধী নয়, জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে। উগ্রবাদের বিরুদ্ধে মানবতার পক্ষে।
 
সর্বপরী যে কোন সংগঠন, দল বা যে কোন দেশের ব্যাপারে সংগঠনকে কট্টর বিরোধী বা কট্টর সমর্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা করার আগে এ বিষয়ে অবশ্যই সংগঠনের অবস্থান জেনে নিয়ে কথা বলাই একজন পরিপক্ক কর্মীর কাজ হওয়া উচিত আর জানার সক্ষমতা না থাকলে সম্পূর্ণ রুপে চুপ করে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
 
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন