মুহাররম ও আশুরার ফজিলত

প্রকাশিত: ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৯

মুফতি হামেদ বিন ফরিদ

ইসলামী শরীয়তে মুহররম মাসের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যা অন্য মাসের মধ্যে নেই। আর ওলামায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন, মূলত চার কারণে মুহাররম মাসের এই শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত।

১. বিভিন্ন হাদীসে এ মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচিত হয়েছে। আলী (রা.) তিনি বলেছেন, এক ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করল, রামাযান মাসের পর কোন মাসের রোযা রাখতে আপনি আমাকে আদেশ করেন? তিনি তাকে বললেন, এই বিষয়ে আমি কাউকে রাসূল (সা.) এর নিকট প্রশ্ন করতে শুনিনি। তবে হ্যাঁ এক সময় আমি রাসূল (সা.) -এর নিকটে বসা ছিলাম। এই সময় এক ব্যক্তি এসে তাকে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! রামাযান মাসের পর আর কোন মাসের রোযা পালনে আপনি আমাকে আদেশ করেন? রাসূল (সা.) বলেন, রামাযান মাসের পর তুমি যদি আরও রোযা রাখতে ইচ্ছুক হও, তবে মুহাররামের রোযা রাখ। এই মাসে এমন একটি দিবস আছে যেদিন আল্লাহ এক গোত্রের তাওবা ক্ববুল করেছিলেন এবং তিনি আরও অনেক গোত্রের তাওবাও এই দিনে কুবুল করবেন। (তিরমিজি, হাদিস নং ৭৪১)

আবু হুরাইরাহ রা. বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, রমজানের পর আল্লাহর প্রিয় মুহাররম মাসের সওম। এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হল রাতের নামাজ।  (মুসলিম শরীফ)

অন্য হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘রাসুল সা. বলেছেন, ‘রমজানের পরে সর্বোত্তম রোজা হল আল্লাহ তায়ালার মাস মহররমের রোজা (মুসলিম ও তিরিমজি)

২. উল্লিখিত হাদীস দ্বারা মুহররম মাসের শ্রেষ্ঠত্বের দ্বিতীয় কারণটি স্পষ্ট হয়ে যায়। হাদীসে মাসটিকে আল্লাহর বলে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ এ মাস আল্লাহ বিশেষ রহমত, দয়া ও অনুগ্রহের মাস। আল্লাহর সাথে এটিকে সম্পর্কযুক্ত করার ফলে এর মহত্ব ও বড়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে।

৩. এ মাসটি চারটি পবিত্র চার মাসের অন্যতম। মাসগুলো হলো, ১. জিলক্বদ, ২. জিলহজ্জ, ৩. মুহররম, ৪. রজব। নবী সা. থেকে আবূ বাকরা (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহ যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেন সেদিন যেভাবে যামানা ছিল তা আজও তেমনি আছে। বারমাসে এক বছর, তার মধ্যে চার মাস পবিত্র। যার তিন মাস ধারাবাহিক যথা যিলকাদ, যিলহাজ্জ ও মুর্হারম আর মুযার গোত্রের রাজব যা জামাদিউস সানী ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৪৬৬২)

প্রখ্যাত মুফাসসির হাফেজ ইবনে কাসীর রহ. বলেন, এ মাসগুলোর মর্যাদা এখনো রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত  থাকবে। আসলাফের অভিমত এটিই। সুতরাং, এ মাসগুলোর গুরত্ব আমাদের মনেপ্রাণে মেনে নেওয়া উচিত।(তাফসীরে ইবনে কাসীর- খন্ড-২, পৃ-৪)

৪. ইসলামি বর্ষপঞ্জির সূচনা হয় এই মাসের মাধ্যমেই। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহ. লিখেন, মুহররম মাসের রোজা পালনের ফজিলতের কারণে হল, এ মাসের মাধ্যমে নতুন বর্ষ শুরু হয়। অতএব এ মাসকে ইবাদত-বন্দেগি দিয়ে পরিপূর্ণ করা চায়। যাতে এই এক মাসের বরকত সারা বছরকে বরকতময় করে তোলে। (ইহয়ায়ে উলুমিদ্দিন উর্দু, ১/৬০১)

আশুরার দিনের ফজিলত

জাহেলি যুগেও মক্কার কুরাইশদের কাছে মুহররম এর দশ তারিখ (আশুরার দিন) অত্যন্ত সম্মানিত একটি দিন ছিল। এদিনে তারা কাবার গেলাফ পরিবর্তন করতো। রোজা রাখতো। হযরত ইব্রাহিম আ. এর কিছু বিধিবিধান কুরাইশরা জাহেলিয়াতের যুগেও পালন করতো। আর নবীজি সা. এর নীতি ছিল তিনি কুরাইশদের মাঝে প্রচলিত ইব্রাহিম আঃ এর এসব বিধান নিজে পালন করতেন। তবে অন্যকে এ ব্যাপারে আদেশ দিতেন না। যেমন রাসূল সা. কুরাইশদের সাথে হজ্জ পালন করতেন। আশুরার দিন রোজা রাখতেন। যখন নবীজি মদিনায় হিজরত করেন রাসুল সা. যখন মদিনায় আগমন করেন তখন দেখেন, ইয়াহুদিরা আশুরার রোজা পালন করে। তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা এ দিনে কেন রোজা রাখ? তারা বলন, এটা এক মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা ও তাঁর জাতিকে নাজাত দেন এবং ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়ে ধ্বংস করেন। তাই মুসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর জাতি এদিনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে রোজা রাখেন; এ জন্যে আমরাও রাখি।  রসুল বলেন, ‘আমরা (তোমাদের অপেক্ষা) মুসা আলাইহিস সালামের অনুসরণ করার বেশি হকদার।’ এরপর তিনি আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবাগণকেও রোজা রাখার জন্য নির্দেশ দেন। (বুখারি ও মুসলিম)

অন্য কিছু হাদিসে পাওয়া যায় রাসূল সা. এদিনে রোজা রাখার প্রতি খুব বেশি তাগিদ দিতেন। হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.) কে যেভাবে আশুরা ও রমজানের রোজার গুরুত্ব সহকারে অনুসন্ধান করতে দেখেছি অন্য কোনো রোজার ব্যাপারে তা দেখিনি।’ (বুখারি ও মুসলিম)

হযরত রুবাইয়্যেই’ বিনতে মুআ’ওয়েয রা. বলেন, রাসুল সা. আশুরার দিন সকালে আনসারি সাহাবাদের গ্রামগুলোতে দূত পাঠিয়ে ঘোষণা দিতে বলেন, ‘যে ব্যক্তি সকালে কিছু খেয়ে ফেলেছে সে যেন বাকি দিন না খেয়ে পূর্ণ করে। আর যে ব্যক্তি না খেয়ে আছে সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে। রুবাইয়্যেই বলেন, ‘এরপর আমরা নিজেরা রোজা রাখতাম এবং আমাদের বাচ্চাদেরকেও রোজা রাখাতাম। আর তাদেরকে তুলা দ্বারা বানানো খেলনা দিতাম। যখন তাদের কেউ খানার জন্য কাঁদত তখন ইফতারি পর্যন্ত ঐ খেলনা দিয়ে রাখতাম। (বুখারি ও মুসলিম)

রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে আশুরার রোজা

হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘জাহেলিয়াতের যুগে কুরাইশরা আশুরার রোজা রাখত এবং রাসুল (সা.)ও রাখতেন। এরপর যখন তিনি মদিনায় আগমন করলেন তখন তিনি আশুরার রোজা রাখেন এবং রাখার জন্য নির্দেশ দেন। যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো তখন তিনি আশুরার রোজা (ফরজ হিসাবে) রাখেননি। এরপর যে চাইত রাখত এবং যে চাইত বিরত থাকত।’ (বুখারি ও মুসলিম)

আশুরার দিনে রোজার ফজিলত

হযরত আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত রাসুল. (সা.)কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট আশা করছি যে, তিনি বিগত এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দিবেন।’ (মুসলিম)

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, যখন রাসুল সা. আশুরার রোজা রাখলেন এবং অন্যদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! এটিতো এমন দিন, যাকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বড় জ্ঞান করে, সম্মান জানায়। তখন রাসুল সা. বললেন, আগামী বছর এদিন আসলে, আমরা নবম দিনও রোজা রাখব ইনশাল্লাহ। বর্ণনাকারী বলছেন, আগামী বছর আসার পূর্বেই রাসুল সা. ইন্তেকাল করেন।

শেষ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, মহররমের শুধু দশ তারিখ রোজা অনুত্তম। মহানবী সা. ইহুদিদের বরখেলাফ করতে গিয়ে নয় তারিখও রোজা রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। তাই, অভিজ্ঞ আলেমদের অভিমত, ৯ ও ১০ তারিখ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোজা রাখা উত্তম।

কিভাবে পালন করবেন আশুরার রোজা

আশুরার সওম পালন সম্পর্কিত হাদীসসমূহ একত্র করলে আশুরার সওম পালনের পদ্ধতি সম্পর্কে কয়েকটি সিদ্ধান্তে আসা যায়।

ক. মুহাররম মাসের নবম ও দশম তারিখে সওম পালন করা। এ পদ্ধতি অতি উত্তম। কারণ রসূল সা. এভাবেই আশুরার সওম পালনের সংকল্প করেছিলেন। যেমন ইতোপূর্বে আলোচিত ইবনে আব্বাস রা. এর হাদীস এর প্রমাণ বহন করে।

খ. মুহাররম মাসের দশম ও একাদশ দিবসে সওম পালন করা। এ পদ্ধতিও হাদিস দ্বারা সমর্থিত।

গ. শুধু মুহাররম মাসের দশম তারিখে সওম পালন করা। এ পদ্ধতি মাকরূহ। কারণ এটা ইহুদীদের আমলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।  (রদ্দুল মুহতার, ইবনে আবেদীন)

হযরত মাওলানা মনজুর নোমানী রহ. মায়ারিফুল হাদিস নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বর্তমান সময়ের ইহুদিরা যেহেতু আশুরার দিনে রোজা পালন করে না, কিংবা তাদের কোন কাজই এখন চন্দ্রমাসের সাথে মিল রাখেনা; ফলে মুহররম শুধু দশম তারিখের রোজা রাখতেও অসুবিধা নেই।  এতে করে ইহুদিদের সাথে সামঞ্জস্যতা পাওয়া যায় না।  (মায়ারিফুল হাদীস- ৩৮৭)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেন, শুধুমাত্র আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের পাপ মোচনকারী হতে পারে। এবং শুধু আশুর দিন একটি রোজা রাখা মকরূহ হবেনা।( ফাতাওয়া কুবরা, খন্ড-৫)

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সোম ও মঙ্গলবার ১০ আশুরা।  আল্লাহ সবাইকে রোজা রাখার তাওফিক দান করুন।

লেখক,  শিক্ষক ইমাম মুসলিম রহ. ইসলামিক সেন্টার, কক্সবাজার

মন্তব্য করুন