একজন সিদ্দীকির উসীলায় হাজার মানুষ দীনের পথে এসেছে : হাবিবুর রহমান মিছবাহ

প্রকাশিত: ২:০৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৯

বাংলাদেশের আলোচিত ও জনপ্রিয় ইসলামী আলোচক মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিকীর ব্যাপারে এক ফেসবুক পোস্টে আর এক জনপ্রিয় ইসলামী আলোচক মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহ মন্তব্য করে বলেছেন,

‘একজন হাফিজুর রহমানের উসীলায় হাজার হাজার বেদায়াতি দীনের লাইনে এসেছে। একজন হাফিজুর রহমানের নাম শোনলে বেদয়াতী মসনদ কেঁপে ওঠে’

সম্প্রতি হাফিজুর রহমান সিদ্দিকের একটি বক্তৃতা নিয়ে ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। তার বয়ানের ভিডিওঅংশতে দেখা যায়, ‘তিনি কোরআনের সুরা তাহরীমের ৮ নং আয়াতে উল্লেখ করা ‘তাওবাতান নাসূহা” সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন “তোমরা নাসূহা নামক ব্যাক্তির মতো তওবা করো”

এ ব্যাখ্যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামপন্থীরা পরস্পর জড়িয়ে পড়ছে বাদানুবাদে। হাফিজুর রহমানের পক্ষে-বিপক্ষে চলছে বিভিন্ন লেখালেখি। অনেকেরই দাবি এখানে নাসূহা নামক ব্যাক্তিকে টেনে আনা কুরআনের অপব্যাখ্যা। তাওবাতান নাসূহা মানে এখানে কোনো ব্যাক্তি উদ্দেশ্য নয়। আবার অনেকেই কুরআনের আয়াতের সাথে নাসূহা নামক ব্যাক্তির সম্পর্ক না থাকলেও এমন একটি প্রাসঙ্গিকতা আছে বলে উল্লেখ করেছেন।

এসব নিয়ে পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে হাফিজুর রহমানের বক্তব্য নিতে চাইলেও ঢাকায় না থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। মুঠোফোনে কল করা হলেও তা ব্যাস্ত পাওয়া গেছে। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে রাখা হলেও তিনি যোগাযোগ করেননি। মাওলানা হাফিজুর রহমান ইতিপূর্বেও বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনার জবাব কেবল মাহফিলকেন্দ্রীক সিমাবদ্ধ রেখে সবাইকে একটি দ্বিধা-ধন্ধের মধ্যে ফেলে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে নিজ আইডিতে মতামত তুলে ধরেছেন পাবলিক ভয়েসের সম্পাদক ও মাওলানা হাফিজুর রহমানের ভাই মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহ।

তিনি ফেসবুকে এই ভুল ধরার চর্চা নিয়ে বলেন, কেউ ভুল করলে নিন্দা বা প্রতিহিংসা নয়, তাকে নসিহত করুন। যেভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে আপনারা সুযোগের সন্ধানে ছিলেন। সমস্যা হলো, নসিহতের নামেও আগুনে ঘি ঢেলেছেন বেশ ক’জন ইয়া বড় ইলমওয়ালা আল্লামা! তাদেরকে ছিঃ ছাড়া কিছুই বলতে পারছি না। জাতির অধপতন তো এমনে এমনে আসে না।

ইসলামী আলোচক বা বক্তাদের নিয়ে বিরূপ শব্দচয়নের ব্যাপারে তিনি বলেন, …বাজারি বক্তা এটা কেমন শব্দ? তাওহীদ আর তাকবীরের ধ্বনী এই বাজারী বক্তাদের দ্বারাই টিকে আছে জনাব! আপনার মতো মার্কেটি আল্লামার মাধ্যমে প্রতিহিংসার আওয়াজ টিকে আছে শুধু। আর যদি কাউকে বাজারি বক্তা বলতে চান, তাহলে তার ব্যাখ্যা বলুন। মনগড়া নয়, সঠিকভাবে। আপনাদের কথায় ছোট থেকে বড় সব বক্তারাই বাজারি। আপনি বাজারি শিক্ষক, বাজারি লেখক, বাজারি উপস্থাপক, বাজারি আল্লামা। ওকে?

তিনি হাফিজুর রহমানের কাছে গিয়ে সরাসরি নসিহত করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, …আর দীনি দরদ থেকেই যদি নসিহত করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে হাফিজুর রহমানের কাছে যান, গিয়ে নসিহত করুন। ফেসবুকে করলেও শালীনভাবে করুন এবং নসিহতটা শুধু হাফিজুর রহমানের জন্য বরাদ্দ কইরেন না, সবার জন্যই করুন।

ফেসবুকে ইতিপূর্বে বিভিন্ন বক্তাদের নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়ে তিনি বলেন, …ওলীপুরী (আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপূরী) সাহেবের মানসূর হাল্লাজ ইস্যু, হাটহাজারী হুজুরের (আল্লামা আহমাদ শফী) আল্লাহ মিথ্যা বলতে পারেন ইস্যু, মেয়েদের স্কুলে পাঠাবেন না ইস্যু, আইয়ূবী (মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী) ভাইর হাসান বসরী জান্নাতের টিকিট দিতেন সংক্রান্ত বক্তব্য, মামুন (মাওলানা মামুনুল হক) ভাইর এদেশে প্রশাসন থাকবে না, থাকতে দেওয়া হবে না ইস্যু নিয়ে নসিহত করুন। এরকম অসংখ্য বক্তব্য আছে অনেকের। আসলে আপনারা কী পারবেন তা জানা আছে। আপনাদের টার্গেট ভিন্ন দিকে আর কিছু নয়।

মুফতী হাবি্ুর রহমান মিছবাহ লেখেন, আমি উপরোক্ত হযরতদের কোনো বক্তব্যেরই সমালোচক নই, আপনাদের সমালোচনার কারণে কথাগুলে সামনে এনেছি। জানি এটা নিয়েও আমার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন আপনারা। তাতে আমার কিছু এসে যায় না। অনেক দুঃখে কথাগুলো বলতে বাধ্য হয়েছি। এভাবে আর বেয়দব পোলাপানগুলোকে উষ্কে দেবেন না প্লিজ! আমি হাফিজুর রহমানের বক্তব্য সমর্থন করছি না, শুধু আপনাদের সমালোচনার ধরণ নিয়ে বলছি। আপনারা এভাবে আক্রমণ না করলেও পারতেন।

সর্বশেষ তিনি মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিকের ব্যাপারে বলেন, একজন বাজারি বক্তা হাফিজুর রহমানের উসীলায় হাজার হাজার বেদায়াতি দীনের লাইনে এসেছে। একজন হেলিকপ্টার হুজুর হাফিজুর রহমানের নাম শোনলে বেদয়াতী মসনদ কেঁপে ওঠে।

প্রসঙ্গত : মাওলানা হাফিজুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে ফেসবুকে বিতর্কমূলক লেখালেখির শুরুটা পাওয়া গেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাবেক কৃষি বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা ওয়ালি উল্লাহ আরমানের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে। তিনি একটি ভিডিওর খন্ডিতাংশ তার পোস্টে সংযুক্ত করে লিখেছেন, “তাওবাতান নাসুহা’ এর এমন তাফসীর কিংবা তাবিল অতীতে কখনো শুনিনি। আপনি শুনেছেন কিনা জানি না’’ সেখানে অনেকেই বিভিন্ন আপত্তিকর শব্দে কমেন্ট করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন বলেই মতামত অনেকের।

পবিত্র কুরআনের সুরা তাহরিমের ৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তূবূ ইলাল্লাহি তাওবাতান নাসূহা’। এখানে উল্লেখ করা “তাওবাতান নাসুহা” নিয়ে এর আগেও মাওলানা হাফিজুর রহমানের মত করে অনেকে উল্লেখ করেছেন। এমনকি একটি জাতীয় পত্রিকাতেও এ বিষয়ে একটি আর্টিকেল পাওয়া যায়। দৈনিক ইত্তেফাকের ১ এপ্রিল ২০১৬ শুক্রবারের সংখ্যায় “তাওবাতুন নাসূহা ও বনি ইসরাঈলের এক ব্যক্তির দৃষ্টান্ত” শিরোনামে একটি লেখা পাওয়া যায় যেখানে তাওবাতান নাসূহার সাথে নাসূহা নামক ব্যাক্তির ঘটনা বর্ননা করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ঢাকার স্বনামধন্য এক মাদরাসার এক শায়খুল হাদিসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “তাওবাতান নাসূহা” বিশুদ্ধ বা খাটি তওবা কি ? এ ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, তবে সবগুলোর মতের সার নির্যাস একই। হযরত নুমান ইবনে বাশির রা. হতে বর্ণিত তিনি ওমর রা. কে বলতে শুনেছেন, হে ইমানদার বান্দাগন তোমরা আল্লাহর নিকট এমন ভাবে তওবা কর, যার দ্বারা আর পাপ কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। অন্য বর্ণনায় আছে ঐ পাপ কাজের আর ইচ্ছাও করবেনা। পূর্ববর্তী আলেমগন বলেন, গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর তওবা করা, লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া, পরবর্তীতে আর এই পাপ কাজ করবেনা বলে দৃঢ় সংকল্প করাই হল খাটি বা বিশুদ্ধ তওবা।

তাহলে নাসূহা নামক ব্যাক্তির প্রাসঙ্গিকতা কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থে বনি ইসরাইলের মধ্যে নাসূহা নামক এক ব্যাক্তির জীবনে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার কথা উল্লেখ রয়েছে।  তবে তা তাফসিরের পরিভাষায় “ইসরারাইলি রেওয়ায়েত” নামে পরিচিত। এবং এসব বর্ণনা জনসম্মুখে না দেওয়াই উচিত বলে মনে করেন তিনি।

মন্তব্য করুন