বই মেলার ১২ দিন : ১২ টি ধর্মীয় বইও প্রকাশ হয়নি

প্রকাশিত: ৬:০৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৯

মহাসমারোহে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলছে বইমেলা। প্রতিদিন বইমেলায় আসছেন লাখো বই প্রেমিক। কিনে নিচ্ছেন তাদের পছন্দের বই। লেখক-পাঠকদের এক অপরূপ মিলনমেলা বলা হয় বইমেলাকে। প্রতিদিনই প্রকাশ হচ্ছে নতুন নতুন বই। ছোট্ট করে যদি একটি হিসাব দেয়া হয় তবে দেখা যাবে বই মেলায় ১২ তারিখ পর্যন্ত সর্বমোট বই প্রকাশ হয়েছে ১৬৮০ টি। বিস্তারিত লিখছি শেষের দিকে।

কোন বিষয়ের কতটি বই প্রকাশ হলো তার বিস্তারিত বিবরণ আমি গতকাল বইমেলা থেকে নিয়ে এসেছি। বিবরণ পড়তে গিয়ে আমার মধ্যে প্রচন্ড রকমের চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে কারণ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সবই কোন না কোন ধর্মের সাথে সম্পর্কিত কিন্তু কোন এক অজানা কারণে বই মেলায় নেই ধর্মীয় বই। ধর্মীয় বই প্রকাশের সংখ্যা খুবই হতাশাজনক।

বইমেলায় ধর্মীয় বইয়ের স্টল নেই এ নিয়ে হতাশা, আলোচনা, সমালোচনা বেশ হয়েছে কিন্তু এই বিষয়টি কখনো খেয়ালই করিনি এখানে কেবল ধর্মীয় বইয়ের স্টলই নয় বরং ধর্মীয় বইই বের হয় না বা বের হলেও বাংলা একাডেমির লিস্টে থাকে না! অথচ দেশের প্রায় সব মানুষই ধর্মের সাথে সম্পর্কিত। যদি সর্বমোট জনসংখ্যার সর্বশেষ ধর্মীয় জরিপ দেই তবে দেখা যাবে উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে বাংলাদেশে বর্তমানে ৯০.৪% মুসলমান ৮.৫% হিন্দু ০.৬% বৌদ্ধ ০.৪% খ্রিস্টান .১০% আদিবাসী। এখানে বেশিরভাগ জরিপেই ধর্মহীন মানুষের কোন হারই নেই।

আমার কাছে বইমেলার ১২ তারিখ পর্যন্ত সর্বমোট প্রকাশিত বইয়ের একটা লিস্ট আছে। বাংলা একাডেমি দিয়েছে এ লিস্ট। এই লিস্ট হিসাব করলে দেখা যাবে এই ১২ দিনে ধর্মীয় বই বের হয়েছে মাত্র ৮ টি অর্থাৎ হিসেব করলে দৈনিক একটিও নয় কিন্তু এই ১২ দিনে গল্পের বই রয়েছে ২৪১ টি, উপন্যাস ২৪৫ টি, প্রবন্ধ ৯০ টি, কবিতার বই ৪৪৫, গবেষণাধর্মী বই ২৬ টি, ছড়া ৪৭ টি, শিশুতোষ বই ৪৮ টি, জীবনী গ্রন্থ ৩৭ টি, রচনাবলী ৫ টি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই ৪০ টি, নাটক ১৪ টি, বিজ্ঞান ভিত্তিক বই ৩০ টি, ভ্রমণ বিষয়ক বই ৩৩ টি, ইতিহাস ৩০ টি, রাজনীতি ১৩ টি, স্বাস্থ্য বিষয়ক বই ১২ টি, কম্পিউটার ভিত্তিক বই ৩টি, রম্য ধাধার বই ১৪টি, অনুবাদ গ্রন্থ পাঁচটি, অভিধান ১ টি, গোয়েন্দা ফিকশন ২৩ টি, অন্যান্য ১১৭টি, সর্বমোট ১২ তারিখ পর্যন্ত বই প্রকাশিত হয়েছে ১৬৮০ টি। এই হিসেব মিলিয়েই আমি অবাক হয়েছি। এই ১৬৮০ টি বইয়ের মধ্যে মাত্র 8 টি বই ধর্মীয় অথচ দেশের প্রায় জনগোষ্ঠী ধর্ম মেনে চলে।

তর্কের খাতিরে মেনে নিতে পারি বাংলাদেশে প্রাক্টিসিং মুসলমান বা ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করা মানুষের সংখ্যা কম। কম বলতে ৯০ শতাংশ মানুষের মধ্যে প্রাক্টিসিং মুসলমানের সংখ্যা তুলনামূলক কম কিন্তু সেই কম সংখ্যাটি কোনভাবেই ৬০ শতাংশের নিচে নয় অথচ ১৬৮০ টি বইয়ের মধ্যে মাত্র ৮ টি বই সেই পার্সেন্ট এর তুলনায় খুবই কম। শুধু যদি কেবলমাত্র বইমেলার দিকে তাকানো হয় তবে দেখা যাবে আসর মাগরিব এবং এশার নামাজ বইমেলার যে মসজিদে হয় সেখানে উপচে পড়া ভিড় থাকে কেবল ভিড়ই নয় সেখানে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের কমপক্ষে পাঁচটি জামাত হয় তার মানে বিশাল একটি বইপ্রেমী গোষ্ঠী রয়েছে; যারা ধর্ম মেনে চলে। এই তাদের হাতে একটি ধর্মীয় বই খুবই শোভা পেত যদি তেমন কোন ধর্মীয় বই বের করার বা প্রকাশ করার অবাধ অনুমতি এবং সুযোগ বইমেলায় থাকতো।

এ বিষয় নিয়ে গতকাল বাংলা একাডেমিতে অনেকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম তাদের কথার সার নির্যাস আমি বুঝেছি তবে সেটা এখন বিশ্লেষনে আনছি না।

কিন্তু তাদের কথায় যেটুকু বোঝা যায়, ছোট্ট করে বললে তা হলো ; কিছু ধর্মীয় কুসংস্কারের ভয় আছে। অবাধ ধর্মীয় বই বের করতে দিলে ইসলামের বিধানে নেই এমন কিছু বই পর্যন্ত ইসলামের নামে বইমেলায় চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে অনেকে তবে এজন্য ধর্মীয় লোকজন দ্বারা একটি সেন্সর বোর্ড গঠন করে দিলেই হয়ে যায়। বাংলা সাহিত্যে বা লেখালেখির জগতে নিরেট ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যেও এমন কিছু মানুষ আছে যাদের কাছে বর্তমানে সাহিত্য অঙ্গন দাপিয়ে বেড়ানো লোকজন বারবার মাত খেতে হবে। শুধু দুটো নাম লিখে দেই ; মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ। সাহিত্য অঙ্গনে এই দুজনের সমকক্ষ হতে পারবে এমন লেখক বইমেলায় আছে কি না তা নিয়ে আমি সত্যিই সন্দিহান।

তাই ; এদেশে অনেক হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ইসলামপন্থীদের এসব লেভেলে কোনঠাসা করতে এমন কিছু নাই যা করা হয়নি কিন্তু এখন এই ট্রেইন বদলে দেয়া উচিত। বইমেলায় ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কিত বই এবং ইসলামপন্থীদের অবাধ অংশগ্রহণ করার সব পথ উম্মুক্ত করে দেয়াই এখন বাংলা একাডেমির মূল কাজ হওয়া উচিত। এ কাজে যারাই বাধা হবে তাদের চিহ্নিত করে জনগণের সামনে ছেড়ে দিয়ে তাদের বিষয়ে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নেয়ারই সুজোগ করে দেয়া হোক জনগণকেই। এই ‘অতি- প্রতিক্রিয়াশীল এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্টি’ বা স্পষ্ট করে বললে নাস্তিক বামেরা তাদের কুপমন্ডুকতা ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠির সাথে অযথা লড়াইয়ে লিপ্ত থাকার এই প্রবণতা এখন বন্ধ করে ফেললেই ভালো হয়। সবাই সবার স্থান থেকে দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে কাজ করতে পারুক। সে বাম হোক বা দাড়ি-টুপিওয়ালা হোক।

লেখক : বিশ্লেষক, ক্রিটিক।

মন্তব্য করুন