চারদল থেকে ঐক্যফ্রন্ট ; সিদ্ধান্তহীনতায় জমিয়ত

প্রকাশিত: ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৪, ২০১৮

২০০১ এর চারদলীয় জোটের প্রথমদিকে জমিয়ত জোটে ছিল না। মুফতী ওয়াক্কাস জোটের হয়ে নির্বাচন করায় তৎকালিন জমিয়ত সভাপতি আব্দুল করীম শায়খে কোড়িয়া রহ. মুফতী ওয়াক্কাস ও মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরীকে দল থেকে বহিস্কার করেন। মুফতী ফজলুল হক আমীনী রহ. এর ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির সঙ্গে লিয়াজো করে নির্বাচন করেন এবং এমপি নির্বাচিত হন। শায়খে কোড়িয়ার ইন্তেকালের পর জমিয়ত তাদেরকে পূণরায় স্বপদে দলে টেনে নেয়। পরবর্তীতে জমিয়তও চারদলীয় জোটে অংশগ্রহণ করে।

২০০১ এর নির্বাচনে জোটের মনোনয়নে যশোর মনিরামপুর থেকে এমপি নির্বাচিত হন তৎকালীন জমিয়তের মহাসচিব মুফতী ওয়াক্কাস এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে এমপি নির্বাচিত ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান মুফতী ফজলুল হক আমীনী রহ.। জামায়াতে ইসলাম থেকে নির্বাচিত হন ১৭ জন এমপি। জোট থেকে জামায়াতের দু’জন মন্ত্রিত্বও পেয়েছিলেন; একজন দলের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শিল্পমন্ত্রী ও সেক্রেটারী আলী আহসান মুজাহিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হয়েছিলেন। এর মধ্যে আলী আহসান মুজাহিদ এমপি ছিলেন না। ২০০১ থেকে ২০১৮; ১৭ বছরের লম্বা সময়ে ইতিহাসের পাতায় রাজনীতির হিসেবনিকেষে ওলটপালট হয়েছে অনেক। মালিবাগ মসজিদ দখলে চারজন শহীদ, জজ মিয়া নাটক, জাতীয় সংসদে মদের আইন পাশ, দশট্রাক অস্ত্র, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ৬৪ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা, লগিবৈঠার তাণ্ডব, এক এগারোর কালো অধ্যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, মাইনাস টু ফর্মুলা, দুই নেত্রী আটক, বাংলাভাই ও শায়খ রহমানের ফাঁসি, নতুন সরকার গঠন, পিলখানা ট্রাজেডি, রানা প্লাজায় ধ্বস, ইলিয়াস আলীর গুম, সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত্যা, নারায়ণগঞ্জের সাতখুন, হলিআর্টিজেন হামলা, ৫মে শাপলা চত্বরের কালো রাত ইত্যাদি। ১৭ বছরের শীর্ষ ঘটনা-দুর্ঘটনা উল্লেখ করতে গেলে কয়েক ভলিউমের পুস্তক হয়ে যাবে।


এরই মাঝে আরেকটি জোট গঠন হলো। এটি আলাদা কোনো জোট নয়। চারদলীয় জোটের সম্প্রসারণ মাত্র। জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতৃত্বে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল ১৮ দল এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ২টি দলের সমন্বয়ে বিশ দলীয় জোট গঠিত হয়। জোটটি ডানপন্থি ও মধ্য ডানপন্থি দলসমূহের সরকার বিরোধী একটি জোট হিসেবে পরিচিতি ছিল।


চারদলীয় জোটের ন্যায় বিশদলীয় জোটেরও অংশীদার ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্য্যজোট, খেলাফত মজলিস ও জামায়াতে ইসলামী। ত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিশদলীয় জোট। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে হিসেব কষতে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলো।

বিশদলীয় জোট বর্তমানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে রুপান্তিত হয়েছে। ডানপন্থি ও মধ্য ডানপন্থি দলসমূহের সে জোটটির বর্তমান নেতৃত্ব স্বঘোষিত বামপন্থীর হাতে ন্যাস্ত। একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে আওয়ামীলীগের সঙ্গে ইসলামী দলের সংখ্যা বেশি। জমিয়ত ও খেলাফত মজলিস ব্যতিত বিএনপি জোটে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো ইসলামী দল নেই। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বিশদলীয় জোট থেকে বের হয়ে আওয়ামী ঘনিষ্ট ও আ.লীগের গৃহপালিত বিরোধীদল খ্যাত জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট গঠন করে।

ইসলামী ঐক্যজোট সরাসরি আওয়ামীলীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির কথা জানিয়েছিল। তবে আওয়ামীলীগ তাদের কোনো আসনে ছাড় না দেওয়ায় তারা এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। মুফতী ফজলুল হক আমীনী রহ. এর ব্রহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে চারদলীয় জোটের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার ছেলে মাওলানা আবুল হাসানাত আমীনী বাবার আসনে এবার নৌকার কাণ্ডারী হওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়ে তিনি নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতী ফয়জুল্লাহও নৌকা প্রতিকে নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু নৌকার মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনিও মনোনয়ন কিনেননি। এ ছাড়া জোটের বাইরে এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে আলোচিত হয়েছে চরমোনাইর পীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

চারদলীয় জোটে ইসলামী মূল্যবোধের দাবিতেই শরীক হয়েছিল ইসলামী দলগুলো। কিন্তু বর্তমান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ইসলামী মূল্যবোধের দাবি করা যুক্তিযুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম হয়ত রাজনৈতিক জোট হিসেবেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে নির্বাচন করতে চাচ্ছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কাছে ১৫টি আসন দাবি করেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। কয়েকটি আসন বিশেষ টার্গেটে রয়েছে তাদের। মুফতী ওয়াক্কাস নেতৃত্বাধীন জমিয়তের একাংশ তিনটি মনোনয়ন পেলেও মূল জমিয়তে সুনামগঞ্জ- ৩ থেকে মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী ব্যতিত আর কেউ মনোনয়ন পাননি। জমিয়তের সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব জানান, তারা জোটের কাছে ১৪ টি আসন দাবী করেছেন। ঐক্যফ্রন্ট থেকে আসনবন্টনের সুরাহা না হওয়ায় তারা ১৫টি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তাদের ১৪টি মনোনয়ন বৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। চট্টগ্রাম-৫ আসনের প্রার্থী মাওলানা নাসির উদ্দীন মুনির হাটহাজারী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়।

মাওলানা জুনায়েদ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ৩ থেকে তিনি নিজেই দলের পক্ষে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন এবং দুটি আসনেই তার মনোনয়নপত্র বৈধ। দুটি আসন থেকেই তিনি জোটের সমর্থন চান। তার দাবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সমস্ত ওলামায়ে কেরাম তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং তার পক্ষে কাজ করবেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জোট থেকে মনোনয়ন পেলে দুটি আসন থেকেই তিনি বিজয় লাভ করবেন। জোট থেকে মনোনয়ন না দিলে আপনারা খেজুরগাছ প্রতিকে আলাদা প্রতিদ্বন্দিতা করবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনও জমিয়ত সে সিদ্ধান্তে পৌছোয়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমার মধ্যে জোট থেকে কাঙ্ক্ষিত দাবি পূরণ না হলে জমিয়তের কার্যনির্বাহী বৈঠকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য: নিবন্ধন হারিয়েও জামায়াতে ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে ২৫টি আসন পেয়েছে। তবে তারা বিএনপির দলীয় প্রতিক ধানের শীষে নির্বাচন করবেন।

মন্তব্য করুন