ঠাকুরাগাঁওয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে করোনার লাশ নিতে বাধা (ভিডিও)

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি

প্রকাশিত: ৮:২৬ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২০
প্রতিরোধের মুখে কষ্ট-ক্লেশে লাশ দাফনে শেষে ক্লান্ত হয়ে পড়ে দাফন টিম

করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তরুণি। স্থানীয় প্রশাসনের ডাকে সাড়া দিয়ে কাফন-দাফনে যায় ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশন ঠাকুরগাঁও জেলা শাখা টিম। কিন্তু লাশ দাফনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এলাকাবাসী। এমনকি তার স্বামী স্বজনারাও ছিলো না পাশে।

লাশ বহনের জন্য মসজিদের খাটিয়া ব্যবহার থেকে ‍শুরু স্থানীয় ঈদগাহে জানাযা পড়াতেও বাধা দেয়া এলকার লোকেরা। এমনকি লাশ নিয়ে কবরস্থানেও যেতে দেয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে লাশ নিয়ে গিয়ে ভিন্না গ্রামে তরুনির পিতার ফসলি জমিতে লাশ দাফন করা হয়।

এমন নির্দয় ও নির্বোধ কাণ্ডটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁওয়ে। চতুর্মুখী বাধার শিকার হয়ে প্রখর রোদে কবর খনন ও অনেক পথ ঘুরে কাঁধে লাশ বহন করে দাফন কার্য শেষে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন দাফন কাজের টিম সদস্যরা।

জানা যায়, গতকাল শুক্রবার (২৯ মে) ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে মোছাঃ রানী আক্তার (২৩)। স্বামীর বাড়ি ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের আউলিয়াপুরে গ্রামে লাশ দাফনে বাধা দেন স্বয়ং স্বামী মোঃ আকবর ও স্থানীয়রা।

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ -আল- মামুন এর নিদের্শনায় লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ৩নং আকচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামে। সেখানেও বাধাপ্রাপ্ত হয় লাশ দাফনের টিম। এলাকায় দুটি কবরস্থানে দাফনের চেষ্টা করা হলে বাধা দেয় এলাকাবাসী।

রাস্তায় পথরোধ করে লাশ নিয়ে যেতে বাধা দেয় স্থানীয়রা। মসজিদের লাশ বহনের খাটিয়া পর্যন্ত ব্যবহার করতে বাধা প্রদান করা হয়। এমনকি স্থানীয় ঈদগাহে জানাযা পড়াতেও দেয়নি তারা। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাবা মোঃ শইদুল ইসলাম রাজার পৈত্রিক জমি বৈকুন্ঠপুর মৌজায় ফসলি জমিতে দাফন করা হয় রানী আক্তারের লাশ।

পরে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং সদর থানা পুলিশের সহযোগিতায় বিকেল ৪টায় লাশ দাফনের কাজ সম্পূর্ণ করে ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশন এর সদস্যরা।

জানাযার ইমামতি করেন টিম প্রধান মাও: আব্দুল মুকিত। আরো উপস্থিত ছিলেন, সহকারী টিম প্রধান মাও: আনাস, হাফেজ আবরারুল হক, হাফেজ মোতাহার হোসাইন, হাফেজ রফিকুল ইসলাম, হাফেজ হাবিবুর রহমান ও মোঃ মোতাব্বিরুল ইসলাম। এসময় নিহতের ৪ ভাই দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ কাছে আসেননি।

এদিকে এর আগে মোমেনশাহী, নোয়াখালী ও জামালপুরেও একইধরণের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ্য করে প্রশাসনকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছন ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় কমিটি।

সংগঠনের আহ্বায়ক মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহ বলেন, মসজিদের খাটিয়া ব্যবহারে বাধা, ঈদগাহে জানাযায় বাধা, কী হচ্ছে এসব? এ ব্যাপারে সরকারের নজর দেওয়া উচিত। আমি প্রশাসনকে অনুরোধ করবো এ ব্যাপারে যেন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এসময় নরসিংদী ও কুড়িগ্রামেও স্ব স্ব জেলা টিম লাশ দাফন করেছে উল্লেখ্য করে তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহ।

সহকারী টিম প্রধান হাফেজ আবরারুল হক বলেন, লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে পথরোধ করে এলাকাবাসী। মসজিদে গেলাম লাশের খাটিয়া আনতে কিন্তু দিবে না। ঈদগাহে জানাযা পড়তে দিবে না। একের পর এক বাধার শিকার হয়েছিলাম। পরে বহু দূর থেকে অন্য এক মসজিদের খাটিয়া নিয়ে আসতে হয়েছিলো। এরপরও রাস্তা দিয়ে লাশ নিয়ে যেতে পারিনি। ধানক্ষেতের সরু আইল দিয়ে লাশ নিয়ে যেতে হয়েছে।

আবরারুল হক বলেন, মৃতের নিজেস্ব মাটিতে দাফন করতে হয়েছে। প্রখর রোদের মধ্যে কবর খনন ও বিভিন্ন এলাকা ঘুরে লাশ নিয়ে আসায় আমাদের টিম সদস্যরা প্রচুর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মানুষ কতোটা অমানবিক হতে পারে তা প্রত্যক্ষ করেছিলাম এই লাশ দাফনে গিয়ে। আসলে কেয়ামতের ময়দান কতোটা ভয়াবহ হবে এটা তারই জ্বলন্ত নমুনা

আকচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত কুমার বর্মন বলেন, ‘আসলে মানুষের সচেতনতার অভাব। এই এলাকায় এর আগে কেউ করোনায় মারা যায়নি। মানুষ আসলে অসেচতনার কারণে এরকম বাধা দিয়েছে। সামনে থেকে আশা করি এরকম আর হবে না’।

/এসএস

মন্তব্য করুন