ঢাবির বুক চিড়ে যাওয়া মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের দাবি শিক্ষার্থীদের

প্রকাশিত: ১২:৪৯ অপরাহ্ণ, মে ২৭, ২০২০

রাজধানীর মেগা প্রজেক্ট হিসেবে খ্যাত উত্তরা টু মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্প নিয়ে ফের উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ঢাবির বুক চিড়ে যাওয়া মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের দাবিতে এক ফ্রেমে এসেছে ঢাবির বিপরিতমূখী ছাত্র রাজনৈতিক দলগুলোও।

কেবল ছাত্রলীগ ছাড়া ঢাবির সক্রিয় রাজনীতি করা প্রতিটি দলই অংশ নিয়েছে এই প্রতিবাদে। তাদের সকলের দাবি শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ রক্ষায়‌ ঢাবি মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তন করতে হবে।

এ দাবি নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে গতকাল মঙ্গলবার (২৭ মে) মিছিল মানববন্ধন করেছেন ঢাবির একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। হুমকি দিয়েছেন বৃহত্তর কর্মসূচির।

এর আগে গত ২৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের দাবিতে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে প্রতিবাদী মানববন্ধন ও মেট্রোরেলের নির্মাণাধীন অবকাঠামোতে কালো পতাকা উত্তোলন করেছে ঢাবি শিক্ষার্থীরা।

মেট্রোরেল প্রকল্পে গত ২৩ মে কালো পতাকা তুলে দেয় শিক্ষার্থীরা। ছবি : সংগৃহিত।

গতকালের মিছিল ও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ও স্বতন্ত্র জোটসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। করোনা পরিস্থিতির কারণে সামাজিক দূরত্ব মেনেই কর্মসূচিতে অংশ নেন শিক্ষার্থীরা।

সমাবেশে নেতাকর্মীরা জোর গলায় বলেন – মেট্রোরেলের কারণে ক্যাম্পাসে মানুষের আনাগোনা বাড়বে। এতে ক্যাম্পাসের গবেষণা ও শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। হলের আবাসন সমস্যা ছাড়াও আরও নানা কারণে শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে রয়েছেন। এর মধ্যে মেট্রোরেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে প্রশ্ন রেখে তারা বলেন, তিনি কীভাবে এই প্রকল্পের অনুমতি দিয়েছেন? তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে এভাবে অনুমতি দিতে পারেন না। এ সময় তারা অবিলম্বে ক্যাম্পাস থেকে মেট্রোরেল সরিয়ে দেয়ার দাবি জানান।

এর আগে লকডাউনে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে মেট্রোরেলের স্টেশন করার জন্য নির্বিচারে গাছ কেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে ঢাবি ছাত্র ইউনিয়ন।

গত ১৮ মে (সোমবার) সকালে বাংলা একাডেমির সামনে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন তারা। মানববন্ধনে কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে গাছ কাটার প্রতিবাদ করে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা।

মানববন্ধনে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক রাগীব নাঈম বলেন, আমরা যখন বলি, বিশ্ববিদ্যালয় গাবতলী নয়, যে এখানে বাস ট্রাক থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় পল্টন নয়, যে এখানে যুবলীগের জন্মদিন করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো মাছের বাজার নয়, যে বাজার উচ্ছেদ করে মেট্রো রেলের পিলার বসাতে হবে, তখন আমাদেরকে জায়গা সংকট দেখানো হয়। বলা হয়, ঢাকা শহরে স্পেস নেই কোনো।

তিনি বলেন, সরকার চাইলেই পারত মেট্রো রেলের রাস্তা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে। কিন্তু তারা তা করে নাই। কারণ আমাদের স্বার্থ তারা দেখে না। সাধারণ মানুষের ক্ষতি হলে তাদের কীই-বা আসে যায়। এই যে মেট্রোরেল, এই মেট্রোরেল শেরাটন হোটেলের ওপর দিয়ে যেতে পারে নাই। কারণ ওইখানে যায় বড়লোকেরা। মেট্রোরেল যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গলার উপর দিয়ে, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে চিন্তা করে গরিবেরা। এই মেট্রোরেলের রাস্তা থেকে দুইশ মিটার দূরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। সেইখানে এখন করোনা রোগের টেস্টিং চলছে। ভাবুন! উচ্চতর গবেষণা কেন্দ্রের মাত্র দুইশো মিটার দূরে ধুলা বালু মাখা এক কন্সট্রাকশন।

এছাড়াও তখন তারা প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ওই রোডে ফের গাছ লাগিয়ে দেন।

প্রসঙ্গত : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুক চিড়ে মেট্রোরেলের রুট যাওয়ার ব্যাপারে এর আগেও ২০১৬ সালে একবার কঠোর প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেছিলো ঢাবি শিক্ষার্থীরা। তার আগে ২০১১ সালেও এ বিষয়ে একবার আলোচনা উঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রুট বাতিল করে শাহবাগ থেকে রোকেয়া হল, শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বুয়েট হয়ে মেট্রোরেল যাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তিতে তা বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়েই ফের রুট নেওয়া হয়। কিন্তু তখনও মেট্রোরেলের খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়নি।

২০১৬ সালে ঢাবির মধ্য দিয়ে মেট্রোরেল নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন। ছবি : সংগৃহিত।

পরবর্তিতে ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে মেট্রোরেলের কাজ দৃশ্যমান হওয়ার পর ফের রুট পরিবর্তনে আন্দোলনে নেমেছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ পরবর্তিতে ২৭ জানুয়ারি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়েই মেট্রোরেল যাবে বলে নিশ্চিত করেন। এর পরদিন ২৮ জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তন করতে তখন আবারো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেন। কিন্তু সে দাবি মানা হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে মেট্রোরেল গেলে যে সব ক্ষতি দেখিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা :

  • পরমাণু শক্তি কমিশন ও বাংলা একাডেমির মধ্যে মেট্রোরেলের ১৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের স্টেশন হলে যাত্রীদের আসা-যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হবে কৃত্রিম যানজট। এমনকি এই এলাকায় দোকান-পাট বসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
  • এই স্টেশনের কারণে ঢাবি ক্যাম্পাসের অন্যতম গর্ব ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিকল্প রুট থাকা সত্ত্বেও ঢাবির ভেতর দিয়ে নেওয়া হচ্ছে রুট।
  • মেট্রোরেলের কারণে ক্যাম্পাসের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেখানে অবস্থিত ঐতিহাসিক স্থাপনা জাতীয় জাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি, চারুকলা অনুষদ, সন্ত্রাস বিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য, টিএসসি প্রাঙ্গণে অবস্থিত বাংলাদেশে টিকে থাকা একমাত্র গ্রিক স্থাপনা, বাংলা একাডেমি, তিন নেতার মাজার, ঢাকা গেট, দোয়েল চত্বর, কার্জন হল এবং শিশু একাডেমিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ আইনের লঙ্ঘন হবে।

জানা যায় – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে ২০১১ সালে ৪ জুলাই তার অফিস সংলগ্ন সভাকক্ষে এ সম্পর্কিত মতবিনিময় সভায় মেট্রোরেলের রুট চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু সেখানে ছাত্রদের কোনো প্রতিনিধি ছিল না।

তবে মেট্রারেলের প্রকল্প-এর পক্ষ থেকে রুট পরিবর্তনের বাধা সর্ম্পকে বলা হয়েছে, ট্রেনে টার্নিং নেয়ার জন্য একটা বড় জায়গা দরকার, সেটা মৎস্য ভবন এলাকায় নেই। এ ধরনের দ্রুতগতির যানবাহনের দিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০০ মিটার রেডিয়াস দরকার। ওখানে ৯০ ডিগ্রির কম রেডিয়াস রয়েছে।

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন